Togel Online

Situs Bandar

Situs Togel Terpercaya

Togel Online Hadiah 4D 10 Juta

Bandar Togel

তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ করেই চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মোকাবিলা করতে হবে

হীরেন পন্ডিত: বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী আগামী দুই দশকের মধ্যে মানবজাতির ৪৭ ভাগ কাজ স্বয়ংক্রিয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন যন্ত্রের মাধ্যমে হতে পারে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ফলে শ্রমনির্ভর এবং অপেক্ষাকৃত কম দক্ষতা নির্ভর চাকরি বিলুপ্ত হলেও উচ্চ দক্ষতানির্ভর যে নতুন কর্মবাজার সৃষ্টি হবে সে বিষয়ে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে তার জন্য প্রস্তুত করে তোলার এখনই সেরা সময়। দক্ষ জনশক্তি প্রস্তুত করা সম্ভব হলে জনমিতিক লভ্যাংশকে কাজে লাগিয়ে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সুফল ভোগ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অন্য অনেক দেশ থেকে অনেক বেশি উপযুক্ত। 

এক্ষেত্রে আমাদের জন্য সবচেয়ে ভাল উদাহরণ হতে পারে জাপান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে আজকের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জাপান পৃথিবীকে দেখিয়ে দিয়েছে শুধু মানবসম্পদকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক এবং সার্বিক জীবনমানের উত্তরণ ঘটানো যায়। জাপানের প্রাকৃতিক সম্পদ অত্যন্ত নগণ্য এবং আবাদযোগ্য কৃষি জমির পরিমাণ মাত্র ১৫%। 

জাপান সব প্রাকৃতিক প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করেছে তার জনসংখ্যাকে সুদক্ষ জনশক্তিকে রূপান্তর করার মাধ্যমে। জাপানের এই উদাহরণ আমাদের জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী। বাংলাদেশের সুবিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে পারলে আমাদের পক্ষেও উন্নত অর্থনীতির একটি দেশে পরিণত হওয়া অসম্ভব নয়।

শিল্প-কারখানায় কী ধরনের জ্ঞান ও দক্ষতা লাগবে সে বিষয়ে আমাদের শিক্ষাক্রমের তেমন সমন্বয় নেই। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব মোকাবেলায় শিক্ষা ব্যবস্থাকেও ঢেলে সাজাতে হবে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, আইওটি, ব্লকচেইন এসব প্রযুক্তিতে বাংলাদেশ এখনও অনেক পিছিয়ে। এসব প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, পণ্য সরবরাহ, চিকিৎসা, শিল্প-কারখানা, ব্যাংকিং, কৃষি, শিক্ষাসহ নানা ক্ষেত্রে কাজ করার পরিধি এখনও তাই ব্যাপকভাবে উন্মুক্ত।

কর্মক্ষেত্রে আমাদের শ্রমিকদের অদক্ষতাই তাদের আয়ের ক্ষেত্রে এই বিরাট ব্যবধানের কারণ। সঙ্গত কারণেই আমাদের উচিত কারিগরি দক্ষতার ওপর আরও জোর দেয়া। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনাটাও একান্ত জরুরি। শিল্প প্রতিষ্ঠান ও একাডেমিয়া একত্রে কোলাবারেশনের মাধ্যমে হাতে-কলমে শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে। 

আমাদের উচিত হবে সকল বিভাগ ও সেক্টর তাদের নিজস্ব কাজকে আরও বেগবান করার লক্ষ্যে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রযুক্তি ভাবনাকে সামনে রেখে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা। অতঃপর সকল সেক্টরের কর্মপরিকল্পনাকে সুসমন্বিত করে একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে সকলে মিলে কাজ করতে হবে।

আশার কথা, শিল্প বিপ্লবের ভিত্তি হিসেবে তিনটি বিষয়ে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। এগুলো হলো- অত্যাধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে শিল্পের বিকাশ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মী বাহিনী তৈরি করা এবং পরিবেশ সংরক্ষণ। প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন ব্যাপকহারে সরকারী বেসরকারী যৌথ উদ্যোগ। তাই সবাই মিলে আমাদের এখন থেকেই একটি সুপরিকল্পনার মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হবে। তবেই আমরা আমাদের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব, গড়তে পারব বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা।

কেবল পরিকল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি আমাদের মানবসম্পদকেও যথাযথভাবে প্রস্তুত করতে হবে এ পরিবর্তনের জন্য। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, আইওটি, ব্লকচেইন এসব প্রযুক্তিতে বাংলাদেশ এখনো তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে। এসব প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, পণ্য সরবরাহ, চিকিৎসা, শিল্প-কারখানা, ব্যাংকিং, কৃষি, শিক্ষাসহ নানা ক্ষেত্রে কাজ করার পরিধি এখনো তাই ব্যাপকভাবে উন্মুক্ত। সত্যিকার অর্থে যেহেতু তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের সুফলই আমরা সবার কাছে পৌঁছতে পারিনি, চতুর্থ বিপ্লব মোকাবেলার জন্য আমাদের প্রস্তুতি কতটকু তা আরো গভীরভাবে ভাবতে হবে। ব্যাপক সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো স্থাপনের মাধ্যমে তা করা সম্ভব। 

শুধু দেশেই নয়, যারা বিদেশে কাজ করছেন তাদেরকেও যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশে পাঠাতে হবে। বিদেশে আমাদের এক কোটি ২০ লাখ ১৩ হাজার ৯১৫ জন শ্রমিক আয় করেন ১৫ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে ভারতের ১ কোটি ৩০ লাখ শ্রমিক আয় করেন ৬৮ বিলিয়ন ডলার। কর্মক্ষেত্রে আমাদের শ্রমিকদের অদক্ষতাই তাদের আয়ের ক্ষেত্রে এ বিরাট ব্যবধানের কারণ। সংগত কারণেই আমাদের উচিত কারিগরি দক্ষতার ওপর আরো জোর দেয়া।

সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনাটাও একান্ত জরুরি। আগামী দিনের সৃজনশীল, সুচিন্তার অধিকারী, সমস্যা সমাধানে পটু জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার উপায় হলো শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজানো, যাতে এ দক্ষতাগুলো শিক্ষার্থীর মধ্যে সঞ্চারিত হয় এবং কাজটি করতে হবে প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য টিচিং অ্যান্ড লার্নিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। 

আমাদের কারিগরি শিক্ষা ও বিশ্ব প্রস্তুতিতে দেখা যায়, জার্মানিতে ১৯৬৯ সালে, সিঙ্গাপুরে ১৯৬০ সালে ও বাংলাদেশে ১৯৬৭ সালে শুরু হয়েছে। অন্যান্য দেশগুলি দ্রুত উন্নতি করলেও আমরা বিভিন্ন পরিসংখ্যানে কারিগরি শিক্ষার হার ও গুণগত মানের দিক দিয়ে অন্যদের থেকে অনেক পিছিয়ে আছি। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সূত্র অনুযায়ী আমাদেও দেশে বর্তমানে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৮ হাজার ৬৭৫ টি। বর্তমানে প্রায় ১২ লক্ষ শিক্ষার্থী কারিগরি শিক্ষায় পড়াশোনা করছে।

কারিগরি শিক্ষার হারে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে। আমাদের মাত্র ১৪% শিক্ষার্থী কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করছে যেখানে বর্তমানে কারিগরি শিক্ষার হার জার্মানিতে ৭৩ শতাংশ, জাপান ৬৬ শতাংশ, সিঙ্গাপুর ৬৫ শতাংশ, অষ্ট্রেলিয়া ৬০ শতাংশ, চীন ৫৫ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়া ৫০ শতাংশ, মালয়েশিয়া ৪৬ শতাংশ। অবশ্য আমাদের বর্তমান সরকার কারিগরি শিক্ষার উন্নয়নে একটি দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে যা ২০২০ সালে ২০% , ২০৩০ সালে ৩০% এবং ২০৫০ সাল নাগাদ কারিগরি শিক্ষার হার ৫০% এ উন্নীত করার এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করছে।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব মোকাবেলায় জনগোষ্ঠীকে যেসব দক্ষতা অর্জন করা প্রয়োজন, তার প্রায় পুরোটাই নির্ভর করবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর। শিক্ষাক্রম হলো নিজস্ব আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক; একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক চাহিদার আলোকে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন এবং শিক্ষার লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য সুনির্দিষ্ট, সুপরিকল্পিত ও পূর্ণাঙ্গ একটি পথনির্দেশ। আগামী দিনের সৃজনশীল ও পরিস্থিতি অনুযায়ী সমস্যা সমাধানে দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার দিকনির্দেশনাও থাকে শিক্ষাক্রমে। 

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব উপযোগী প্রত্যাশিত শিক্ষাক্রম কেমন হওয়া উচিত, তা অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। এক্ষেত্রে পাঠ্যবইকেন্দ্রিক শিক্ষাক্রম চিন্তা থেকে বের হয়ে কর্মনির্ভর ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। মুখস্থ করার পরিবর্তে আত্মস্থ, বিশ্লেষণ ও সূত্রের প্রায়োগিক দিককে শিক্ষাক্রম প্রণয়নে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

গুরুত্ব দিতে হবে জ্ঞান-বিজ্ঞানের নতুন ও মৌলিক অর্জনের ওপর। রিস্কিলিং, আপস্কিলিং ও ডিস্কিলিং পদ্ধতির বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। বিদ্যমান শিখন কার্যক্রমের সঙ্গে ডিজিটালনির্ভর অন্যান্য ব্যবস্থা, যেমন ই-লার্নিং ও অনলাইন শিক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে। অর্থাৎ প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার উপযোগী শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করতে হবে।

বাংলাদেশ জনশক্তি রফতানিতে এখনো যেমন অদক্ষ ক্যাটাগরিতে রয়েছে, তেমনি দেশে দক্ষ জনবলের অভাবে বিদেশ থেকে লোক আনতে হচ্ছে। এজন্য জার্মানি, জাপান, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের কারিগরি শিক্ষার মডেল আমাদের অনুসরণ করতে হবে। জার্মানিতে কারিগরি শিক্ষার হার ৭৩ শতাংশ। দেশে দক্ষতা বিষয়ক শিক্ষার হার অন্তত ৬০ শতাংশে উন্নীত করার মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন ও উত্তর কোরিয়ার মতো দেশের উন্নতির মূলে রয়েছে কারিগরি শিক্ষা। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রস্তুতি হিসেবে বাংলাদেশ সরকার স্কুলের পাঠ্যসূচিতে কোডিং শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করতে যাচ্ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রকল্পের আওতায় স্কুলে কম্পিউটার এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বেড়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে গ্রামীণ বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো আমাদের শিশু ও তরুণদের তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের উপযোগীই করতে পারেনি। শিক্ষার অংশগ্রহণ ও প্রযুক্তি ব্যবহারের হার বেড়েছে কিন্তু মানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। এ রকম একটি ভঙ্গুর সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে একচ্ছত্র প্রযুক্তিসংক্রান্ত বিনিয়োগ টেকসই হওয়া কঠিন। এতে সামাজিক অসমতা আরো বাড়বে। করোনা মোকাবেলায় স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাণিজ্য সব খাতে সর্বজনীন প্রযুক্তি সংক্রান্ত বিনিয়োগ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দিকে আরো ধাবিত করছে। করোনাকালীন প্রযুক্তিগত সংস্কার অতি অল্প সময়ের মধ্যে শিক্ষা ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে মালয়েশিয়া। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দ্রুত ও সময়োচিত পদক্ষেপ এবং নীতিমালা প্রণয়নের মধ্য দিয়ে সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ডিজিটাল প্রযুক্তির সর্বজনীন অবকাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল গভর্ন্যান্সের মাধ্যমে পুরোদমে সব কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দ্রুত সময়ে কর্মী ট্রেসিং অ্যাপ উন্নয়ন করেছে, যার মাধ্যমে শিক্ষক ও কর্মচারীরাই দৈনন্দিন কার্যক্রম তদারক করছেন। বাংলাদেশও মালয়েশিয়ার উচ্চশিক্ষার মডেল অনুসরণ করতে পারে।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি শত সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে। এ সময় দক্ষ নেতৃত্ব ও গুণগত শিক্ষার ওপর জোর দেয়া আবশ্যক। আমাদের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো জরুরি। শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে আমাদের। শিক্ষার বহুমাত্রিকতা আগামীর নেতৃত্ব গঠনে ভূমিকা রাখবে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আমাদের শিক্ষার্থীরা নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গবেষণা, সরকার ও শিল্প খাতের মধ্যে সমন্বয় থাকাটা জরুরি। 

গবেষণায় আরো অর্থ বাড়াতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আমাদের তরুণদের চিন্তা করার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পড়াশোনায় বৈচিত্র্য বাড়ানো দরকার। আমাদেও যেমন গণিত নিয়ে পড়তে হবে, তেমনি পড়তে হবে শিল্প-সংস্কৃতি নিয়ে।  প্রোগ্রামিংসহ বিভিন্ন প্রাথমিক দক্ষতা সবার মধ্যে থাকা এখন ভীষণ জরুরি। কেবল পরিকল্পনা করলেই তো হবে না, অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি আমাদের মানবসম্পদকেও যথাযথভাবে প্রস্তুত করতে হবে এ পরিবর্তনের জন্য। তবে আশার কথা, ‘ন্যাশনাল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স স্ট্র্যাটেজি’ নিয়ে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। কিন্তু গোড়ার সমস্যার সমাধান না করে এসব পরিকল্পনায় তেমন সুফল মিলবে না।

বাংলাদেশে উদ্ভাবনী জ্ঞান, উচ্চদক্ষতা, গভীর চিন্তাভাবনা ও সমস্যা সমাধান করার মতো দক্ষতাসম্পন্ন মানবসম্পদ পর্যাপ্ত পরিমাণে তৈরি হয়নি। তাই সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রগুলোয় প্রতিবেশী ও অন্যান্য দেশ থেকে বাধ্য হয়ে অভিজ্ঞ ও দক্ষতাসম্পন্ন পরামর্শক নিয়োগ দিতে হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এ খরচ বাবদ ৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা যে কার্যকরী নয়, তা সাম্প্রতিক সময়ের এই পরিসংখ্যানিক বিশ্লেষণ থেকেই বোঝা যায়। আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান উন্নতি ও সফলতা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে শিল্প ও সেবাচালিত অর্থনীতিতে পরিবর্তন হচ্ছে। অন্যদিকে সবচেয়ে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে প্রযুক্তি খাতে। 

ফলে শিল্প ও সেবার ধরনেও আসছে পরিবর্তন। তাই এ পরিবর্তনের সঙ্গে মিল  রেখে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, নতুন নতুন কৌশল উদ্ভাবন এবং প্রবল প্রতিযোগিতামূলক বাজারের জন্য নিজেদের যদি তৈরি করা না যায়, তবে হাজার হাজার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোনো কাজে আসবে না। আর উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা লাখ লাখ শিক্ষার্থী রাষ্ট্রের বোঝা হয়েই থাকবে।

তাই আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ ও হাইটেক পার্কসহ সবাইকে এক হয়ে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের বিষয়টি মনেপ্রাণে অনুধাবনপূর্বক কারিগরি শিক্ষার উন্নয়নের জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে এবং সরকারকে এ খাতে উন্নয়ন বাজেট বাড়াতে হবে। তা না হলে আমরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বো এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে আমাদেরকে চ্যালেঞ্জের সম্মুখে পড়তে হবে।

তথ্যপ্রযুক্তি দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে এনে দিয়েছে নতুন মাত্রা। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ফলে অর্থনৈতিক লেনদেনের সুবিধা সাধারণ মানুষের জীবনকে সহজ করেছে। তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে স্টার্টআপ সংস্কৃতির বিস্তৃৃতি লাভ করেছে। নারীরাও তথ্যপ্রযুক্তিতে যুক্ত হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নারী উদ্যোক্তাদের উপস্থিতি বাড়ছে। দেশে প্রায় ২০ হাজার ফেসবুক পেজে কেনাকাটা চলছে। দক্ষভাবেই চলছে কাজগুলো। তবে দক্ষতা অর্জনে আরো বিশেষ ভূমিকা নিতে হবে।

জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানি-সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। দু’বছর আগেই অভিবাসন নীতিতে পরিবর্তন এনেছে জাপান। এর মাধ্যমে দেশটিতে জনশক্তি রফতানির সুযোগ আরো বেড়েছে। কোভিডে কারণে প্রভাবান্বিত বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানিতে এটি ইতিবাচক খবর ছিলো বটে। তবে এজন্য প্রয়োজন দক্ষ জনশক্তি। কারণ জাপান দক্ষ জনশক্তিই নিতে আগ্রহী। বাজারটিতে প্রবেশের জন্য বাংলাদেশকে চীন, কোরিয়া, ভিয়েতনামের মতো দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে, যারা দক্ষ জনশক্তি রফতানিতে এগিয়ে। বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানি বাজারটি মূলত অদক্ষ কর্মীনির্ভর। কিন্তু জাপানে জনশক্তি রফতানি বাড়াতে হলে দক্ষতা প্রয়োজন। প্রত্যাশা সবার উন্মোচিত হওয়া এই নতুন জনশক্তির বাজার সঠিকভাবে কাজে লাগাতে যথাযথ পরিকল্পনা নেয়া হবে।

সারা বিশ্বে বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি মানুষ বিভিন্ন কর্মে নিয়োজিত। আবার প্রতি বছর গড়ে ছয়-সাত লাখ মানুষ কাজের সন্ধানে বিদেশে গেলেও মাত্র এক-তৃতীয়াংশ প্রশিক্ষিত। বাকিরা আধা দক্ষ ও অদক্ষ হিসেবে বিদেশে যায়। বিশেষ করে জনশক্তি প্রেরণ খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত উদ্যোক্তাদের নিজস্ব উদ্যোগে সৃষ্ট কিছু কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে ও সরকারের টিটিসি থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে যতটা সম্ভব দক্ষ কর্মীরা বিভিন্ন দেশে যাচ্ছেন। অভিবাসন খাতের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট কেউই দক্ষ কর্মী গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সুবিধা, ট্রেনিং সেন্টার স্থাপনের জন্য বিশেষ অঞ্চল বা জমি বরাদ্দ, ব্যাংকঋণ সুবিধা ইত্যাদি কোনো ধরনের সরকারি-বেসরকারি সুবিধা পান না। অভিবাসন একটি সম্ভাবনাময় খাত হওয়ায় এর প্রতি সরকারের নজর বা পৃষ্ঠপোষকতা আরো বাড়াতে হবে। দুই দশক আগেও বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রফতানির মূল গন্তব্য ছিল উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থাভুক্ত (জিসিসি) ছয়টি দেশ। এরপর নতুন গন্তব্য হিসেবে যুক্ত হয় মালয়েশিয়া। তবে অর্থনৈতিক মন্দা, বৈশ্বিক রাজনীতি, মধ্যস্বত্বভোগীদের অধিক মুনাফার লোভ, কূটনৈতিকসহ নানা কারণে ক্রমেই আস্থা হারাচ্ছে বিদ্যমান বৈদেশিক শ্রমবাজারগুলো। এমন অবস্থায় জাপানসহ অন্য দেশে জনশক্তি রফতানির অগ্রগতি নিঃসন্দেহে আশাজাগানিয়া।

জাপান ও অন্যান্য দেশ দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শ্রমিক নেবে। তাই মধ্যপ্রাচ্য বা মালয়েশিয়ায় যে জনশক্তি রফতানি হয়, জাপান তার থেকে ভিন্ন হবে। অন্য দেশের তুলনায় জাপানে আয়ের সুযোগও বেশি। আগামী পাঁচ বছরে সাড়ে তিন লাখ বিদেশী কর্মী নেবে দেশটি। স্বাভাবিকভাবে যে দেশ বেশিসংখ্যক প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তির জোগান দিতে পারবে, সে দেশ থেকে বেশিসংখ্যক শ্রমিক তারা নেবে। জাপানের মানুষের গড় আয়ু ৮৪ বছর এবং ১০০ বছর বা তার অধিক বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৭০ হাজার। বয়স্ক এসব মানুষের সেবার জন্যও দক্ষ জনবল দরকার। নির্মাণ শিল্প, প্রযুক্তি, নার্সিং, কৃষি, হোটেল ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ট্যুরিজম খাতেও কাজের সুযোগ আছে। সুতরাং জাপানে জনশক্তির নতুন বাজার খুলেছে এ খবরে আমাদের সে দেশে পাঠানোর উপযোগী দক্ষ জনবল তৈরির দিকে মনোযোগ দিয়ে কতটুকু সফলতা অর্জন করতে পেরেছি সেটা ভাবনার বিষয়। তাদের যে ধরনের বিশেষায়িত ও দক্ষ শ্রমিক প্রয়োজন, সে রকম শ্রমিক পরিকল্পিতভাবে তৈরি করতে হবে। আর এটাও বাস্তব যে অদক্ষ ও অপ্রশিক্ষিত জনশক্তি রফতানির সুযোগ ভবিষ্যতে আরো কমে যাবে। জাপানে জনশক্তি রফতানির জন্য বিশেষভাবে জোর দিতে হবে জাপানি ভাষা শিক্ষার ওপর। প্রশিক্ষণের আওতা বাড়াতে বেসরকারি জনশক্তি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। তাদের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাতে হবে। আগে থেকেই আটটি দেশ যথাক্রমে চীন, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, মিয়ানমার, ফিলিপাইন, মঙ্গোলিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম দেশটিতে জনশক্তি পাঠাচ্ছে। সে হিসাবে দেশটিতে বাংলাদেশ নবম জনশক্তি রফতানিকারক দেশ। বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশকে পরিকল্পনা সাজাতে হবে। দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে কাজ করছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। এদিকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্যসূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে দক্ষ শ্রমিক তৈরিতে ৬৪টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে, যেগুলোয় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন নতুন নতুন প্রশিক্ষণ মডিউল চালুর পরিকল্পনা করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া দেশের সব জেলায় আরো প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং এরই মধ্যে এ বিষয় নিয়ে কাজ শুরু করেছে মন্ত্রণালয়। এছাড়া আরো জানা যায়, প্রথম পর্যায়ে আট বিভাগের ৭১টি উপজেলায় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ করেছে যাচ্ছে সরকার। এগুলো নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। তবে খেয়াল রাখতে হবে শুধু যেন অবকাঠামো নির্মাণ আর কাগজ-কলমে এ উদ্যোগ সীমাবদ্ধ না থাকে। এখান থেকে যেন দক্ষ জনশক্তি তৈরি হয়, সেদিকে সবসময় দৃষ্টি রাখতে হবে। ক্ষেত্রবিশেষে প্রয়োজনে বিদেশ থেকে প্রশিক্ষক এনে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। নিয়মিত তদারক করতে হবে। ভালো হয় সরকারি কার্যক্রমের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগকে এ খাতে উৎসাহিত করলে। তাহলে এ খাতে প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হবে। আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলো যেমন ভারত, শ্রীলংকা, ভিয়েতনাম এরই মধ্যে এ খাতে তাদের বিনিয়োগ বাড়িয়েছে এবং তাদের বেসরকারি খাতগুলোও সমানতালে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করছে। সবচেয়ে ভালো হয় চাহিদাসম্পন্ন কোনো নির্দিষ্ট খাতে ফোকাস করে ওই খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা। যেমন ভিয়েতনাম দক্ষ নার্স তৈরি করে এবং ইউরোপের অনেক দেশেই তাদের নার্স রয়েছে। ভারত আইটি সেক্টরের দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বিখ্যাত। এ রকমভাবে কোনো চাহিদাসম্পন্ন নির্দিষ্ট খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারলে বাংলাদেশকে বিশ্ব ওই নির্দিষ্ট জনশক্তির ব্র্যান্ড হিসেবে জানবে।

জাপানের মানুষের গড় আয়ু ৮৪ বছর হলেও ১০০ বা তার অধিক বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৭০ হাজার। বয়স্ক এসব মানুষের সেবার জন্য দক্ষ জনবল দরকার। নির্মাণ শিল্প, প্রযুক্তি, নার্সিং, কৃষি, হোটেল ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ট্যুরিজম খাতেও কাজের সুযোগ আছে সেখানে। থাকা-খাওয়া বাদে প্রতি মাসে প্রায় ৮০ হাজার টাকা উপার্জনের সুযোগ পাবেন একজন দক্ষ শ্রমিক। জাপান যেতে অভিবাসন ব্যয় নেই বললেই চলে। তবে বিদেশী শ্রমিক নেয়ার ব্যাপারে জাপান বরাবরই রক্ষণশীল। তাই কোনো অঘটনের কারণে যেন বাজারটি বন্ধ হয়ে না যায়, সেদিকে মনোযোগ দিয়েই এগোতে হবে। জাপানি ভাষা প্রশিক্ষণ না নিয়ে কেউ জাপানে যাওয়ার সুযোগ পাবেন না। তাই প্রশিক্ষণের আওতা বাড়াতে গত ফেব্রুয়ারিতে বেসরকারি জনশক্তি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। সরকার প্রণীত নীতিমালার আওতায় এরই মধ্যে বেশকিছু আগ্রহী প্রতিষ্ঠান বিএমইটিতে আবেদন করেছে। এসব আবেদন তদন্ত করে যাচাই-বাছাইয়ের পর মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছে বিএমইটি। মন্ত্রণালয় থেকে চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হবে। বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করলে প্রশিক্ষিত শ্রমিকের সংখ্যা আরো বাড়বে। চুক্তি অনুযায়ী যারা জাপানে চাকরি পাবেন তারা বিনা খরচে সেখানে যেতে পারবেন। কোনো অসাধু জনশক্তি রফতানিকারকের দ্বারা যাতে কেউ প্রতারিত না হন, সে বিষয়ে সরকারের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে মালয়েশিয়া একাধিকবার বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি আমদানি স্থগিত করেছে। জনশক্তি রফতানির নতুন বাজার জাপানের ক্ষেত্রে যেন এ রকম না হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারেরই।

বাংলাদেশকে দক্ষ শ্রমিক তৈরির দিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। তাছাড়া আমাদের প্রধান বৈদেশিক শ্রমবাজার ‘মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার’ বিভিন্ন কারণে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। এর উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হলো, বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে যাওয়া, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অভ্যন্তরীণ বেকারত্ব বেড়ে যাওয়া, বিভিন্ন খাতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি। তাই সহজেই অনুমেয় ভবিষ্যতে কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। তাই আমাদের দক্ষ শ্রমিক তৈরির পাশাপাশি বিকল্প শ্রমবাজারের অনুসন্ধান করতে হবে। জাপানের জনশক্তির বাজারে প্রবেশের সুযোগ কাজে লাগাতে সরকারকে অবশ্যই বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। প্রতিযোগিতামূলক এ বাজারে বাংলাদেশের সুযোগ বিস্তৃৃত করার জন্য কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি কর্মী প্রেরণে স্বচ্ছতার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনকারী জনশক্তি খাতের দিকে বিশেষ দৃষ্টি দেয়ার তাগিদ নানা মহল থেকে বারবার দেয়া হলেও অসাধুদের অপতৎপরতা বন্ধ করা যায়নি। জাপানে যে সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে সেগুলো অন্য দেশের ক্ষেত্রে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখাও জরুরি। জনশক্তি রফতানি আমাদের অর্থনীতির এক বড় চালিকাশক্তি। রেমিট্যান্সের কারণেই বাংলাদেশে বিশ্বমন্দায় তেমন কোন সমস্যা হয়নি। মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা ও নতুন নতুন শ্রমবাজার সন্ধানে দৃষ্টি প্রসারিত করাও সমভাবেই জরুরি।

হীরেন পণ্ডিত: প্রাবন্ধিক ও গবেষক

তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ করেই চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মোকাবিলা করতে হবে

  

তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ করেই চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মোকাবিলা করতে হবে তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ করেই চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মোকাবিলা করতে হবে

বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী আগামী দুই দশকের মধ্যে মানবজাতির ৪৭ ভাগ কাজ স্বয়ংক্রিয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন যন্ত্রের মাধ্যমে হতে পারে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ফলে শ্রমনির্ভর এবং অপেক্ষাকৃত কম দক্ষতা নির্ভর চাকরি বিলুপ্ত হলেও উচ্চ দক্ষতানির্ভর যে নতুন কর্মবাজার সৃষ্টি হবে সে বিষয়ে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে তার জন্য প্রস্তুত করে তোলার এখনই সেরা সময়। দক্ষ জনশক্তি প্রস্তুত করা সম্ভব হলে জনমিতিক লভ্যাংশকে কাজে লাগিয়ে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সুফল ভোগ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অন্য অনেক দেশ থেকে অনেক বেশি উপযুক্ত।

এক্ষেত্রে আমাদের জন্য সবচেয়ে ভাল উদাহরণ হতে পারে জাপান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে আজকের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জাপান পৃথিবীকে দেখিয়ে দিয়েছে শুধু মানবসম্পদকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক এবং সার্বিক জীবনমানের উত্তরণ ঘটানো যায়। জাপানের প্রাকৃতিক সম্পদ অত্যন্ত নগণ্য এবং আবাদযোগ্য কৃষি জমির পরিমাণ মাত্র ১৫%।

জাপান সব প্রাকৃতিক প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করেছে তার জনসংখ্যাকে সুদক্ষ জনশক্তিকে রূপান্তর করার মাধ্যমে। জাপানের এই উদাহরণ আমাদের জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী। বাংলাদেশের সুবিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে পারলে আমাদের পক্ষেও উন্নত অর্থনীতির একটি দেশে পরিণত হওয়া অসম্ভব নয়।

শিল্প-কারখানায় কী ধরনের জ্ঞান ও দক্ষতা লাগবে সে বিষয়ে আমাদের শিক্ষাক্রমের তেমন সমন্বয় নেই। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব মোকাবেলায় শিক্ষা ব্যবস্থাকেও ঢেলে সাজাতে হবে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, আইওটি, ব্লকচেইন এসব প্রযুক্তিতে বাংলাদেশ এখনও অনেক পিছিয়ে। এসব প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, পণ্য সরবরাহ, চিকিৎসা, শিল্প-কারখানা, ব্যাংকিং, কৃষি, শিক্ষাসহ নানা ক্ষেত্রে কাজ করার পরিধি এখনও তাই ব্যাপকভাবে উন্মুক্ত।

কর্মক্ষেত্রে আমাদের শ্রমিকদের অদক্ষতাই তাদের আয়ের ক্ষেত্রে এই বিরাট ব্যবধানের কারণ। সঙ্গত কারণেই আমাদের উচিত কারিগরি দক্ষতার ওপর আরও জোর দেয়া। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনাটাও একান্ত জরুরি। শিল্প প্রতিষ্ঠান ও একাডেমিয়া একত্রে কোলাবারেশনের মাধ্যমে হাতে-কলমে শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে।

আমাদের উচিত হবে সকল বিভাগ ও সেক্টর তাদের নিজস্ব কাজকে আরও বেগবান করার লক্ষ্যে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রযুক্তি ভাবনাকে সামনে রেখে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা। অতঃপর সকল সেক্টরের কর্মপরিকল্পনাকে সুসমন্বিত করে একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে সকলে মিলে কাজ করতে হবে।

আশার কথা, শিল্প বিপ্লবের ভিত্তি হিসেবে তিনটি বিষয়ে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। এগুলো হলো- অত্যাধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে শিল্পের বিকাশ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মী বাহিনী তৈরি করা এবং পরিবেশ সংরক্ষণ। প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন ব্যাপকহারে সরকারী বেসরকারী যৌথ উদ্যোগ। তাই সবাই মিলে আমাদের এখন থেকেই একটি সুপরিকল্পনার মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হবে। তবেই আমরা আমাদের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব, গড়তে পারব বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা।

কেবল পরিকল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি আমাদের মানবসম্পদকেও যথাযথভাবে প্রস্তুত করতে হবে এ পরিবর্তনের জন্য। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, আইওটি, ব্লকচেইন এসব প্রযুক্তিতে বাংলাদেশ এখনো তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে। এসব প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, পণ্য সরবরাহ, চিকিৎসা, শিল্প-কারখানা, ব্যাংকিং, কৃষি, শিক্ষাসহ নানা ক্ষেত্রে কাজ করার পরিধি এখনো তাই ব্যাপকভাবে উন্মুক্ত। সত্যিকার অর্থে যেহেতু তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের সুফলই আমরা সবার কাছে পৌঁছতে পারিনি, চতুর্থ বিপ্লব মোকাবেলার জন্য আমাদের প্রস্তুতি কতটকু তা আরো গভীরভাবে ভাবতে হবে। ব্যাপক সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো স্থাপনের মাধ্যমে তা করা সম্ভব।

শুধু দেশেই নয়, যারা বিদেশে কাজ করছেন তাদেরকেও যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশে পাঠাতে হবে। বিদেশে আমাদের এক কোটি ২০ লাখ ১৩ হাজার ৯১৫ জন শ্রমিক আয় করেন ১৫ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে ভারতের ১ কোটি ৩০ লাখ শ্রমিক আয় করেন ৬৮ বিলিয়ন ডলার। কর্মক্ষেত্রে আমাদের শ্রমিকদের অদক্ষতাই তাদের আয়ের ক্ষেত্রে এ বিরাট ব্যবধানের কারণ। সংগত কারণেই আমাদের উচিত কারিগরি দক্ষতার ওপর আরো জোর দেয়া।

সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনাটাও একান্ত জরুরি। আগামী দিনের সৃজনশীল, সুচিন্তার অধিকারী, সমস্যা সমাধানে পটু জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার উপায় হলো শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজানো, যাতে এ দক্ষতাগুলো শিক্ষার্থীর মধ্যে সঞ্চারিত হয় এবং কাজটি করতে হবে প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য টিচিং অ্যান্ড লার্নিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন।

আমাদের কারিগরি শিক্ষা ও বিশ্ব প্রস্তুতিতে দেখা যায়, জার্মানিতে ১৯৬৯ সালে, সিঙ্গাপুরে ১৯৬০ সালে ও বাংলাদেশে ১৯৬৭ সালে শুরু হয়েছে। অন্যান্য দেশগুলি দ্রুত উন্নতি করলেও আমরা বিভিন্ন পরিসংখ্যানে কারিগরি শিক্ষার হার ও গুণগত মানের দিক দিয়ে অন্যদের থেকে অনেক পিছিয়ে আছি। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সূত্র অনুযায়ী আমাদেও দেশে বর্তমানে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৮ হাজার ৬৭৫ টি। বর্তমানে প্রায় ১২ লক্ষ শিক্ষার্থী কারিগরি শিক্ষায় পড়াশোনা করছে।

কারিগরি শিক্ষার হারে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে। আমাদের মাত্র ১৪% শিক্ষার্থী কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করছে যেখানে বর্তমানে কারিগরি শিক্ষার হার জার্মানিতে ৭৩ শতাংশ, জাপান ৬৬ শতাংশ, সিঙ্গাপুর ৬৫ শতাংশ, অষ্ট্রেলিয়া ৬০ শতাংশ, চীন ৫৫ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়া ৫০ শতাংশ, মালয়েশিয়া ৪৬ শতাংশ। অবশ্য আমাদের বর্তমান সরকার কারিগরি শিক্ষার উন্নয়নে একটি দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে যা ২০২০ সালে ২০% , ২০৩০ সালে ৩০% এবং ২০৫০ সাল নাগাদ কারিগরি শিক্ষার হার ৫০% এ উন্নীত করার এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করছে।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব মোকাবেলায় জনগোষ্ঠীকে যেসব দক্ষতা অর্জন করা প্রয়োজন, তার প্রায় পুরোটাই নির্ভর করবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর। শিক্ষাক্রম হলো নিজস্ব আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক; একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক চাহিদার আলোকে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন এবং শিক্ষার লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য সুনির্দিষ্ট, সুপরিকল্পিত ও পূর্ণাঙ্গ একটি পথনির্দেশ। আগামী দিনের সৃজনশীল ও পরিস্থিতি অনুযায়ী সমস্যা সমাধানে দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার দিকনির্দেশনাও থাকে শিক্ষাক্রমে।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব উপযোগী প্রত্যাশিত শিক্ষাক্রম কেমন হওয়া উচিত, তা অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। এক্ষেত্রে পাঠ্যবইকেন্দ্রিক শিক্ষাক্রম চিন্তা থেকে বের হয়ে কর্মনির্ভর ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। মুখস্থ করার পরিবর্তে আত্মস্থ, বিশ্লেষণ ও সূত্রের প্রায়োগিক দিককে শিক্ষাক্রম প্রণয়নে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

গুরুত্ব দিতে হবে জ্ঞান-বিজ্ঞানের নতুন ও মৌলিক অর্জনের ওপর। রিস্কিলিং, আপস্কিলিং ও ডিস্কিলিং পদ্ধতির বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। বিদ্যমান শিখন কার্যক্রমের সঙ্গে ডিজিটালনির্ভর অন্যান্য ব্যবস্থা, যেমন ই-লার্নিং ও অনলাইন শিক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে। অর্থাৎ প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার উপযোগী শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করতে হবে।

বাংলাদেশ জনশক্তি রফতানিতে এখনো যেমন অদক্ষ ক্যাটাগরিতে রয়েছে, তেমনি দেশে দক্ষ জনবলের অভাবে বিদেশ থেকে লোক আনতে হচ্ছে। এজন্য জার্মানি, জাপান, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের কারিগরি শিক্ষার মডেল আমাদের অনুসরণ করতে হবে। জার্মানিতে কারিগরি শিক্ষার হার ৭৩ শতাংশ। দেশে দক্ষতা বিষয়ক শিক্ষার হার অন্তত ৬০ শতাংশে উন্নীত করার মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন ও উত্তর কোরিয়ার মতো দেশের উন্নতির মূলে রয়েছে কারিগরি শিক্ষা। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রস্তুতি হিসেবে বাংলাদেশ সরকার স্কুলের পাঠ্যসূচিতে কোডিং শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করতে যাচ্ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রকল্পের আওতায় স্কুলে কম্পিউটার এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বেড়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে গ্রামীণ বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো আমাদের শিশু ও তরুণদের তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের উপযোগীই করতে পারেনি। শিক্ষার অংশগ্রহণ ও প্রযুক্তি ব্যবহারের হার বেড়েছে কিন্তু মানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। এ রকম একটি ভঙ্গুর সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে একচ্ছত্র প্রযুক্তিসংক্রান্ত বিনিয়োগ টেকসই হওয়া কঠিন। এতে সামাজিক অসমতা আরো বাড়বে। করোনা মোকাবেলায় স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাণিজ্য সব খাতে সর্বজনীন প্রযুক্তি সংক্রান্ত বিনিয়োগ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দিকে আরো ধাবিত করছে। করোনাকালীন প্রযুক্তিগত সংস্কার অতি অল্প সময়ের মধ্যে শিক্ষা ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে মালয়েশিয়া। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দ্রুত ও সময়োচিত পদক্ষেপ এবং নীতিমালা প্রণয়নের মধ্য দিয়ে সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ডিজিটাল প্রযুক্তির সর্বজনীন অবকাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল গভর্ন্যান্সের মাধ্যমে পুরোদমে সব কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দ্রুত সময়ে কর্মী ট্রেসিং অ্যাপ উন্নয়ন করেছে, যার মাধ্যমে শিক্ষক ও কর্মচারীরাই দৈনন্দিন কার্যক্রম তদারক করছেন। বাংলাদেশও মালয়েশিয়ার উচ্চশিক্ষার মডেল অনুসরণ করতে পারে।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি শত সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে। এ সময় দক্ষ নেতৃত্ব ও গুণগত শিক্ষার ওপর জোর দেয়া আবশ্যক। আমাদের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো জরুরি। শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে আমাদের। শিক্ষার বহুমাত্রিকতা আগামীর নেতৃত্ব গঠনে ভূমিকা রাখবে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আমাদের শিক্ষার্থীরা নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গবেষণা, সরকার ও শিল্প খাতের মধ্যে সমন্বয় থাকাটা জরুরি।

গবেষণায় আরো অর্থ বাড়াতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আমাদের তরুণদের চিন্তা করার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পড়াশোনায় বৈচিত্র্য বাড়ানো দরকার। আমাদেও যেমন গণিত নিয়ে পড়তে হবে, তেমনি পড়তে হবে শিল্প-সংস্কৃতি নিয়ে। প্রোগ্রামিংসহ বিভিন্ন প্রাথমিক দক্ষতা সবার মধ্যে থাকা এখন ভীষণ জরুরি। কেবল পরিকল্পনা করলেই তো হবে না, অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি আমাদের মানবসম্পদকেও যথাযথভাবে প্রস্তুত করতে হবে এ পরিবর্তনের জন্য। তবে আশার কথা, ‘ন্যাশনাল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স স্ট্র্যাটেজি’ নিয়ে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। কিন্তু গোড়ার সমস্যার সমাধান না করে এসব পরিকল্পনায় তেমন সুফল মিলবে না।

বাংলাদেশে উদ্ভাবনী জ্ঞান, উচ্চদক্ষতা, গভীর চিন্তাভাবনা ও সমস্যা সমাধান করার মতো দক্ষতাসম্পন্ন মানবসম্পদ পর্যাপ্ত পরিমাণে তৈরি হয়নি। তাই সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রগুলোয় প্রতিবেশী ও অন্যান্য দেশ থেকে বাধ্য হয়ে অভিজ্ঞ ও দক্ষতাসম্পন্ন পরামর্শক নিয়োগ দিতে হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এ খরচ বাবদ ৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা যে কার্যকরী নয়, তা সাম্প্রতিক সময়ের এই পরিসংখ্যানিক বিশ্লেষণ থেকেই বোঝা যায়। আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান উন্নতি ও সফলতা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে শিল্প ও সেবাচালিত অর্থনীতিতে পরিবর্তন হচ্ছে। অন্যদিকে সবচেয়ে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে প্রযুক্তি খাতে।

ফলে শিল্প ও সেবার ধরনেও আসছে পরিবর্তন। তাই এ পরিবর্তনের সঙ্গে মিল রেখে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, নতুন নতুন কৌশল উদ্ভাবন এবং প্রবল প্রতিযোগিতামূলক বাজারের জন্য নিজেদের যদি তৈরি করা না যায়, তবে হাজার হাজার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোনো কাজে আসবে না। আর উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা লাখ লাখ শিক্ষার্থী রাষ্ট্রের বোঝা হয়েই থাকবে।

তাই আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ ও হাইটেক পার্কসহ সবাইকে এক হয়ে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের বিষয়টি মনেপ্রাণে অনুধাবনপূর্বক কারিগরি শিক্ষার উন্নয়নের জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে এবং সরকারকে এ খাতে উন্নয়ন বাজেট বাড়াতে হবে। তা না হলে আমরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বো এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে আমাদেরকে চ্যালেঞ্জের সম্মুখে পড়তে হবে।

তথ্যপ্রযুক্তি দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে এনে দিয়েছে নতুন মাত্রা। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ফলে অর্থনৈতিক লেনদেনের সুবিধা সাধারণ মানুষের জীবনকে সহজ করেছে। তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে স্টার্টআপ সংস্কৃতির বিস্তৃৃতি লাভ করেছে। নারীরাও তথ্যপ্রযুক্তিতে যুক্ত হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নারী উদ্যোক্তাদের উপস্থিতি বাড়ছে। দেশে প্রায় ২০ হাজার ফেসবুক পেজে কেনাকাটা চলছে। দক্ষভাবেই চলছে কাজগুলো। তবে দক্ষতা অর্জনে আরো বিশেষ ভূমিকা নিতে হবে।

জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানি-সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। দু’বছর আগেই অভিবাসন নীতিতে পরিবর্তন এনেছে জাপান। এর মাধ্যমে দেশটিতে জনশক্তি রফতানির সুযোগ আরো বেড়েছে। কোভিডে কারণে প্রভাবান্বিত বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানিতে এটি ইতিবাচক খবর ছিলো বটে। তবে এজন্য প্রয়োজন দক্ষ জনশক্তি। কারণ জাপান দক্ষ জনশক্তিই নিতে আগ্রহী। বাজারটিতে প্রবেশের জন্য বাংলাদেশকে চীন, কোরিয়া, ভিয়েতনামের মতো দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে, যারা দক্ষ জনশক্তি রফতানিতে এগিয়ে। বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানি বাজারটি মূলত অদক্ষ কর্মীনির্ভর। কিন্তু জাপানে জনশক্তি রফতানি বাড়াতে হলে দক্ষতা প্রয়োজন। প্রত্যাশা সবার উন্মোচিত হওয়া এই নতুন জনশক্তির বাজার সঠিকভাবে কাজে লাগাতে যথাযথ পরিকল্পনা নেয়া হবে।

সারা বিশ্বে বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি মানুষ বিভিন্ন কর্মে নিয়োজিত। আবার প্রতি বছর গড়ে ছয়-সাত লাখ মানুষ কাজের সন্ধানে বিদেশে গেলেও মাত্র এক-তৃতীয়াংশ প্রশিক্ষিত। বাকিরা আধা দক্ষ ও অদক্ষ হিসেবে বিদেশে যায়। বিশেষ করে জনশক্তি প্রেরণ খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত উদ্যোক্তাদের নিজস্ব উদ্যোগে সৃষ্ট কিছু কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে ও সরকারের টিটিসি থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে যতটা সম্ভব দক্ষ কর্মীরা বিভিন্ন দেশে যাচ্ছেন। অভিবাসন খাতের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট কেউই দক্ষ কর্মী গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সুবিধা, ট্রেনিং সেন্টার স্থাপনের জন্য বিশেষ অঞ্চল বা জমি বরাদ্দ, ব্যাংকঋণ সুবিধা ইত্যাদি কোনো ধরনের সরকারি-বেসরকারি সুবিধা পান না। অভিবাসন একটি সম্ভাবনাময় খাত হওয়ায় এর প্রতি সরকারের নজর বা পৃষ্ঠপোষকতা আরো বাড়াতে হবে। দুই দশক আগেও বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রফতানির মূল গন্তব্য ছিল উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থাভুক্ত (জিসিসি) ছয়টি দেশ। এরপর নতুন গন্তব্য হিসেবে যুক্ত হয় মালয়েশিয়া। তবে অর্থনৈতিক মন্দা, বৈশ্বিক রাজনীতি, মধ্যস্বত্বভোগীদের অধিক মুনাফার লোভ, কূটনৈতিকসহ নানা কারণে ক্রমেই আস্থা হারাচ্ছে বিদ্যমান বৈদেশিক শ্রমবাজারগুলো। এমন অবস্থায় জাপানসহ অন্য দেশে জনশক্তি রফতানির অগ্রগতি নিঃসন্দেহে আশাজাগানিয়া।

জাপান ও অন্যান্য দেশ দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শ্রমিক নেবে। তাই মধ্যপ্রাচ্য বা মালয়েশিয়ায় যে জনশক্তি রফতানি হয়, জাপান তার থেকে ভিন্ন হবে। অন্য দেশের তুলনায় জাপানে আয়ের সুযোগও বেশি। আগামী পাঁচ বছরে সাড়ে তিন লাখ বিদেশী কর্মী নেবে দেশটি। স্বাভাবিকভাবে যে দেশ বেশিসংখ্যক প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তির জোগান দিতে পারবে, সে দেশ থেকে বেশিসংখ্যক শ্রমিক তারা নেবে। জাপানের মানুষের গড় আয়ু ৮৪ বছর এবং ১০০ বছর বা তার অধিক বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৭০ হাজার। বয়স্ক এসব মানুষের সেবার জন্যও দক্ষ জনবল দরকার। নির্মাণ শিল্প, প্রযুক্তি, নার্সিং, কৃষি, হোটেল ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ট্যুরিজম খাতেও কাজের সুযোগ আছে। সুতরাং জাপানে জনশক্তির নতুন বাজার খুলেছে এ খবরে আমাদের সে দেশে পাঠানোর উপযোগী দক্ষ জনবল তৈরির দিকে মনোযোগ দিয়ে কতটুকু সফলতা অর্জন করতে পেরেছি সেটা ভাবনার বিষয়। তাদের যে ধরনের বিশেষায়িত ও দক্ষ শ্রমিক প্রয়োজন, সে রকম শ্রমিক পরিকল্পিতভাবে তৈরি করতে হবে। আর এটাও বাস্তব যে অদক্ষ ও অপ্রশিক্ষিত জনশক্তি রফতানির সুযোগ ভবিষ্যতে আরো কমে যাবে। জাপানে জনশক্তি রফতানির জন্য বিশেষভাবে জোর দিতে হবে জাপানি ভাষা শিক্ষার ওপর। প্রশিক্ষণের আওতা বাড়াতে বেসরকারি জনশক্তি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। তাদের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাতে হবে। আগে থেকেই আটটি দেশ যথাক্রমে চীন, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, মিয়ানমার, ফিলিপাইন, মঙ্গোলিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম দেশটিতে জনশক্তি পাঠাচ্ছে। সে হিসাবে দেশটিতে বাংলাদেশ নবম জনশক্তি রফতানিকারক দেশ। বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশকে পরিকল্পনা সাজাতে হবে। দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে কাজ করছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। এদিকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্যসূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে দক্ষ শ্রমিক তৈরিতে ৬৪টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে, যেগুলোয় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন নতুন নতুন প্রশিক্ষণ মডিউল চালুর পরিকল্পনা করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া দেশের সব জেলায় আরো প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং এরই মধ্যে এ বিষয় নিয়ে কাজ শুরু করেছে মন্ত্রণালয়। এছাড়া আরো জানা যায়, প্রথম পর্যায়ে আট বিভাগের ৭১টি উপজেলায় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ করেছে যাচ্ছে সরকার। এগুলো নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। তবে খেয়াল রাখতে হবে শুধু যেন অবকাঠামো নির্মাণ আর কাগজ-কলমে এ উদ্যোগ সীমাবদ্ধ না থাকে। এখান থেকে যেন দক্ষ জনশক্তি তৈরি হয়, সেদিকে সবসময় দৃষ্টি রাখতে হবে। ক্ষেত্রবিশেষে প্রয়োজনে বিদেশ থেকে প্রশিক্ষক এনে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। নিয়মিত তদারক করতে হবে। ভালো হয় সরকারি কার্যক্রমের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগকে এ খাতে উৎসাহিত করলে। তাহলে এ খাতে প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হবে। আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলো যেমন ভারত, শ্রীলংকা, ভিয়েতনাম এরই মধ্যে এ খাতে তাদের বিনিয়োগ বাড়িয়েছে এবং তাদের বেসরকারি খাতগুলোও সমানতালে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করছে। সবচেয়ে ভালো হয় চাহিদাসম্পন্ন কোনো নির্দিষ্ট খাতে ফোকাস করে ওই খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা। যেমন ভিয়েতনাম দক্ষ নার্স তৈরি করে এবং ইউরোপের অনেক দেশেই তাদের নার্স রয়েছে। ভারত আইটি সেক্টরের দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বিখ্যাত। এ রকমভাবে কোনো চাহিদাসম্পন্ন নির্দিষ্ট খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারলে বাংলাদেশকে বিশ্ব ওই নির্দিষ্ট জনশক্তির ব্র্যান্ড হিসেবে জানবে।

জাপানের মানুষের গড় আয়ু ৮৪ বছর হলেও ১০০ বা তার অধিক বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৭০ হাজার। বয়স্ক এসব মানুষের সেবার জন্য দক্ষ জনবল দরকার। নির্মাণ শিল্প, প্রযুক্তি, নার্সিং, কৃষি, হোটেল ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ট্যুরিজম খাতেও কাজের সুযোগ আছে সেখানে। থাকা-খাওয়া বাদে প্রতি মাসে প্রায় ৮০ হাজার টাকা উপার্জনের সুযোগ পাবেন একজন দক্ষ শ্রমিক। জাপান যেতে অভিবাসন ব্যয় নেই বললেই চলে। তবে বিদেশী শ্রমিক নেয়ার ব্যাপারে জাপান বরাবরই রক্ষণশীল। তাই কোনো অঘটনের কারণে যেন বাজারটি বন্ধ হয়ে না যায়, সেদিকে মনোযোগ দিয়েই এগোতে হবে। জাপানি ভাষা প্রশিক্ষণ না নিয়ে কেউ জাপানে যাওয়ার সুযোগ পাবেন না। তাই প্রশিক্ষণের আওতা বাড়াতে গত ফেব্রুয়ারিতে বেসরকারি জনশক্তি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। সরকার প্রণীত নীতিমালার আওতায় এরই মধ্যে বেশকিছু আগ্রহী প্রতিষ্ঠান বিএমইটিতে আবেদন করেছে। এসব আবেদন তদন্ত করে যাচাই-বাছাইয়ের পর মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছে বিএমইটি। মন্ত্রণালয় থেকে চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হবে। বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করলে প্রশিক্ষিত শ্রমিকের সংখ্যা আরো বাড়বে। চুক্তি অনুযায়ী যারা জাপানে চাকরি পাবেন তারা বিনা খরচে সেখানে যেতে পারবেন। কোনো অসাধু জনশক্তি রফতানিকারকের দ্বারা যাতে কেউ প্রতারিত না হন, সে বিষয়ে সরকারের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে মালয়েশিয়া একাধিকবার বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি আমদানি স্থগিত করেছে। জনশক্তি রফতানির নতুন বাজার জাপানের ক্ষেত্রে যেন এ রকম না হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারেরই।

বাংলাদেশকে দক্ষ শ্রমিক তৈরির দিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। তাছাড়া আমাদের প্রধান বৈদেশিক শ্রমবাজার ‘মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার’ বিভিন্ন কারণে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। এর উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হলো, বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে যাওয়া, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অভ্যন্তরীণ বেকারত্ব বেড়ে যাওয়া, বিভিন্ন খাতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি। তাই সহজেই অনুমেয় ভবিষ্যতে কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। তাই আমাদের দক্ষ শ্রমিক তৈরির পাশাপাশি বিকল্প শ্রমবাজারের অনুসন্ধান করতে হবে। জাপানের জনশক্তির বাজারে প্রবেশের সুযোগ কাজে লাগাতে সরকারকে অবশ্যই বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। প্রতিযোগিতামূলক এ বাজারে বাংলাদেশের সুযোগ বিস্তৃৃত করার জন্য কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি কর্মী প্রেরণে স্বচ্ছতার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনকারী জনশক্তি খাতের দিকে বিশেষ দৃষ্টি দেয়ার তাগিদ নানা মহল থেকে বারবার দেয়া হলেও অসাধুদের অপতৎপরতা বন্ধ করা যায়নি। জাপানে যে সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে সেগুলো অন্য দেশের ক্ষেত্রে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখাও জরুরি। জনশক্তি রফতানি আমাদের অর্থনীতির এক বড় চালিকাশক্তি। রেমিট্যান্সের কারণেই বাংলাদেশে বিশ্বমন্দায় তেমন কোন সমস্যা হয়নি। মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা ও নতুন নতুন শ্রমবাজার সন্ধানে দৃষ্টি প্রসারিত করাও সমভাবেই জরুরি।

হীরেন পণ্ডিত: প্রাবন্ধিক ও গবেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

slot qris

slot bet 100 rupiah

slot spaceman

mahjong ways

spaceman slot

slot olympus slot deposit 10 ribu slot bet 100 rupiah scatter pink slot deposit pulsa slot gacor slot princess slot server thailand super gacor slot server thailand slot depo 10k slot777 online slot bet 100 rupiah deposit 25 bonus 25 slot joker123 situs slot gacor slot deposit qris slot joker123 mahjong scatter hitam

sicbo

roulette

pusathoki slot

orbit4d slot

pusatmenang slot

https://www.firstwokchinesefood.com/

orbit4d

https://www.mycolonialcafe.com/

https://www.chicagotattooremovalexpert.com/

fokuswin

slot bet 200

pusatmenang

pusatplay

https://partnersfoods.com/

https://www.tica2023.com/

https://dronesafeespana.com/

https://mrzrestaurants.com/

slot server luar