নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বে বাংলাদেশ একটি রোল মডেল


হীরেন পণ্ডিত: বিশ্বে এগিয়ে যাচ্ছে নারী; বাদ নেই বাংলাদেশের নারীরাও। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার দেশের নারীসমাজকে এগিয়ে দিয়েছে কয়েক ধাপ। সেইসাথে বেড়েছে ক্ষমতায়নের সুযোগ। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর অর্ধেকই নারী। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশ সরকারও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নারীদের সম্পৃক্ত করতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম প্রকাশিত বৈশ্বিক লিঙ্গ বিভাজন সূচক ২০২০ (গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ ইনডেক্স) অনুযায়ী ১৫৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৫০তম এবং দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে। ডিজিটাল খাতে বর্তমান বিশ্বের অগ্রগতিকে নারী-পুরুষের বৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্যে কাজে লাগানো, যাতে নারীর সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা ও যৌন সহিংসতা মোকাবিলায় প্রযুক্তি হয় গণতান্ত্রিক, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি সহায়ক ও সৃজনশীল।
বর্তমানে সমাজের প্রায় সব খাতেই নারীর অংশগ্রহণ দৃশ্যমান হচ্ছে। শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে মেয়েদের উপস্থিতি এখন শতভাগ। পোশাক শিল্পের কৃতিত্বের সিংহভাগই নারীর। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে। বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশই যেখানে নারী, সেখানে অগ্রগতি দৃশ্যমান হচ্ছে খুব অল্পসংখ্যক নারীর মধ্যেই। নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়ন ছাড়া দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।
২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জন করতে হলে অবশ্যই এর ৫ এবং ১০ অভীষ্ট অর্জনে সাফল্য দেখাতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল একটি বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণ। বাংলাদেশের সংবিধানেও এর প্রতিফলন আছে। কিন্তু ৫২ বছরে কি আমরা বৈষম্যহীন সমাজ নির্মাণ করতে পেরেছি? সিডও সনদের শর্ত বাস্তবায়ন করতে হলেও নারী-পুরুষ বৈষম্য দূর করার কোনো বিকল্প নেই। জেন্ডার রেসপন্সিভ বাজেটের মাধ্যমে নারীর প্রতি বৈষম্য হ্রাস ও সুযোগের সমতা সৃষ্টি। জেন্ডার বাজেটের যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে নারীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়ন, প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে লিঙ্গসমতা, শিশু ও মাতমৃত্যু হ্রাস, স্বাস্থ্য ও টিকাদানের ক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন হয়েছে। নারীর আর্থসামাজিক অগ্রগতির মাধ্যমে নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন দৃশ্যমান হয়। এজন্য দরকার নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা ও সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা এবং আর্থিক বরাদ্দ নিশ্চিত করা।
বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে প্রযুক্তির উন্নয়ন ও ব্যবহার বিশ্ববাসীকে পরস্পরের কাছাকাছি এনে দিয়েছে। ফলে পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধির পাশাপাশি অর্থনৈতিক অগ্রগতিও সাধিত হয়েছে। তবে সব শ্রেণীর মানুষের যেহেতু প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার সমান নয়, তাই এ অগ্রগতির সুফল সব মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছেনি। বিদ্যমান প্রযুক্তি নারীবান্ধব কতটুকু সে প্রশ্ন সামনে আসছে। সেখানে প্রবেশাধিকার ও সুফল ভোগ করার ক্ষেত্রে নারীরা ব্যাপকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। প্রায় ৫৫ ভাগ নারী এখনো প্রযুক্তির বাইরে রয়েছে। প্রযুক্তি মানবসমাজকে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করেছে। এমনকি নারী সমাজের যে অংশের প্রযুক্তিতে প্রবেশাকিারের সুযোগ ছিলো, তারাও এ সুবিধা পেয়েছে। প্রযুক্তি ব্যবহারে তারা সমান দক্ষতা দেখিয়েছে। বেকারত্ব, দারিদ্র্য থেকে মুক্ত হতে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তাসহ বিভিন্ন কর্মসংস্থান বেছে নিয়েছে। প্রযুক্তির সহায়তায় শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে গেছে, প্রশিক্ষণ কর্মসূচিসহ সরকারের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করতে পেরেছে। তাই প্রযুক্তিতে নারীর প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে হবে।
বিংশ শতাব্দীতে লিঙ্গ সমতাভিত্তিক যে সমাজ গঠনের ডাক দিয়েছিলেন বেগম রোকেয়া, সে সমাজ গঠনের পথে আজ ৫২ বছর পেরিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। সবদিক বিবেচনা করে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে বিশ্বে নারীর ক্ষমতায়নে আজ বাংলাদেশ রোল মডেল। নারী ক্ষমতায়ন মূল্যায়নে যেসব অনুঘটক বা সূচক ব্যবহার করা হয় তার সবকটি সূচকে আজ বাংলাদেশ বিশ্বে এগিয়ে। দেশের প্রধানমন্ত্রী নারী, জাতীয় সংসদের স্পিকার নারী, বিরোধীদলীয় নেত্রী নারী। নারী সমাজের উন্নয়নের জন্য এর চেয়ে বড় ইতিবাচক শর্ত আর কী হতে পারে? বাংলাদেশের সংবিধানসহ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতিমালায় নারীর রাজনৈতিক-সামাজিক ক্ষমতায়ন ও অংশগ্রহণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি-২০১১ প্রণয়ন করেন। জাতীয় সংসদের স্পিকার পদে একজন নারীকে নির্বাচিত করেন। শেখ হাসিনাই প্রথম তাঁর মন্ত্রিসভায় প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদে নারীকে দায়িত্ব প্রদান করেন। সংসদ উপনেতাও হন একজন নারী। নাগরিক সমাজের কেউ কেউ বলতেন দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ও বিরোধীদলীয় নেতা নারী হলেই কি নারীর ক্ষমতায়ন হয়ে যাবে! তা বলা যাবে না, তবে এ কথাও সত্য, এতসব গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীর পদায়নের ফলে নারীদের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে, যার ফলশ্রæতিতে নারীর ক্ষমতায়ন দীর্ঘস্থায়ী ও সুদূরপ্রসারী হয়েছে। উপজেলা পরিষদে মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদ সৃষ্টি ও ইউনিয়ন পরিষদে তিনজন নারী সদস্য নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নির্বাচিত হওয়ার বিধান নিশ্চিত করা হয়েছে। বাংলাদেশের নারীরা এখন শুধু বিচারক, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার নন, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছেন দক্ষতার সঙ্গে। শিক্ষা, চিকিৎসা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং কূটনৈতিক দক্ষতা, খেলাধুলা, পর্বতারোহণ, নাসায় কর্মরতসহ সব চ্যালেঞ্জিং পেশায় সাফল্যের চিহ্ন রাখছে। বাংলাদেশে এখন অনেক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়সহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সচিব বা সমমর্যাদার পদে নারী কর্মকর্তা কর্মরত আছেন, যা ইতোপূর্বে ছিল না। শেখ হাসিনা সরকারই উচ্চ আদালতের বিচারপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী উপাচার্য, প্রথম নারী সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল পদে পদায়িত করেছেন।
প্রশাসনে নারী কর্মকর্তাদের অবস্থান সুদৃঢ়। বর্তমানে সিনিয়র সচিব ও সচিব পদমর্যাদায় ১০ জন, ডিসি ৯ জন রয়েছেন। আর অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার নারী কর্মকর্তা ৫৫ জন। তাদের মধ্যে অনেকেই বিভিন্ন সংস্থার চেয়ারম্যান ও মহাপরিচালক হিসাবে দায়িত্বপালন করছেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসাবে দায়িত্বপালন করছেন ১৬৪ জন নারী। যুগ্ম সচিব পদে ১৬৩ জন নারী কর্মকর্তা সরকারি দায়িত্বপালন করছেন। উপসচিব পদে দায়িত্বপালন করছেন ৩৭০ নারী। পাশাপাশি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পদে ১৬২ জন এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদে ১৩৩ জন নারী কর্মকর্তা কাজ করছেন। সহকারী সচিব/কমিশনার পদে কর্মরত ৪৩৩ জন নারী মাঠ পর্যায়ে দায়িত্বপালন করছেন। অনেকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্বও পালন করছেন। এছাড়া সহকারী সচিব ও সহকারী কমিশনার পদমর্যাদার কর্মকর্তা রয়েছেন ৪৩৩ জন।
দেশকে অগ্রসর করতে হলে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠা করতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার থেকে অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীকে পিছিয়ে রাখলে চলবে না। দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের মাধ্যমে এক্ষেত্রে সমতা আনয়ন করতে হবে। তথ্য প্রযুক্তিতে অভিগম্যতা বৃদ্ধি এবং প্রশিক্ষিত করে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে নারীর জন্য বিনিয়োগের পরিকল্পনা থাকতে হবে। তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারের প্রসার ঘটানোর মাধ্যমে আজকে সুযোগ এসেছে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তনের। যার মাধ্যমে নারীর মানবাধিকার, মানবিক সত্তা, সৃজনশীলতা স্বীকৃত হবে ও প্রতিষ্ঠিত হবে।
নারীরা শক্ত হাতে, যতœ করে যেমন সংসারের হাল ধরেন, তেমনই বহির্জগতেও তারা অনন্যা। জীবনের নানা স্তরে বৈষম্যের শিকার হয়েও সেই বাধা পেরিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নজির গড়েন নারী। লিঙ্গবৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে, সাফল্যের এ ধারা অব্যাহত রাখতে হলে নীতিনির্ধারণ ও অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে নারী সমাজকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান হারানো, আয় কমে যাওয়া ইত্যাদি কারণে জীবনযাত্রার মানে যে অবনতি ঘটেছে, তার বিরূপ প্রভাব নারীদের ওপরই বেশি পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাহলে নারী ও মেয়েশিশুদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি পরিস্থিতির অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হবে। ঘরে-বাইরে সর্বত্র নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোরালো উদ্যোগ দরকার।
তৃণমূল পর্যায়ের নারীদের দারিদ্র্যেও বোঝা বহন করতে, ঘরে দিতে হচ্ছে বিনামূল্যে শ্রম, উৎপাদিত পণ্যের দাম পায় কম, কাজের বিনিময়ে খাদ্য বা অনিশ্চিত নাগরিক কাজের ক্ষেত্রও সংকুচিত। ভূমি ব্যবহার ও মূলধন প্রাপ্তিতে তাদের প্রবেশাধিকার নেই, উৎপাদনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতায়ও তাদের প্রবেশাধিকার নেই। বর্তমানে উন্নয়নে নারীর সস্তা শ্রমকে শোষণ করা হয় তেমন ব্যবস্থাকে জোরদার না করে উচিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণের কারণ অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণ করা, যা শ্রেণী ও লিঙ্গবৈষম্যের জন্ম দেয়। নারীর সমমর্যাদা অর্জনের জন্য প্রয়োজন নারীর পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষমতায়ন, নিরাপদ ও নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ। রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে ও গুণগত মান বা সত্যিকার অর্থে মর্যাদা বৃদ্ধি।
নারী আন্দোলনের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় নারী সমাজের যথেষ্ট অগ্রগতি সাধন হলেও লিঙ্গসমতার বিষয়টি এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এটি শুধু বাংলাদেশেই নয়, পৃথিবীর সর্বত্রই বিরাজমান। দেশ কিংবা সমাজের উন্নয়ন নির্ভর করে জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক অবদান ও অংশগ্রহণের ওপর। অর্থাৎ সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর (নারী) অংশগ্রহণ ছাড়া কাক্সিক্ষত উন্নয়ন সম্ভব নয়। বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ও সামাজিক কর্মকাÐে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে, কিন্তু তা কাক্সিক্ষত মাত্রার অনেক নিচে অবস্থান করছে। শুধু তা-ই নয়, নারী নির্যাতন ও বঞ্চনাও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা সম্ভব হয়নি। দেশের নারী সমাজ এখনো নানা ধরনের পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নির্যাতন-বঞ্চনার শিকার। জাতীয় রাজনীতিসহ সর্বক্ষেত্রে নারীর ৩৩ শতাংশ অংশগ্রহণ এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। স্থানীয় সরকার পর্যায়ে নারীর ক্ষমতায়ন ফলপ্রসূ হচ্ছে না। সংরক্ষিত নারী আসন ও সংরক্ষিত নারী কোটা নারীকে আরো পেছনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে কিনা সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সবাই বলছে বাংলাদেশ নারী উন্নয়নের রোল মডেল।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *