তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলাদেশের অগ্রগতি


হীরেন পণ্ডিত: বাংলাদেশ ৫২ বছর পূর্ণ করল। বাংলাদেশের জন্মের সঙ্গে যাদের জন্ম হয়েছে, তাদের হয়তো ১০০ বছর পূর্তি দেখার সৌভাগ্য হবে না, তবে যদি কারও জীবনে সেটি হয়ে যায়, তাহলে চমৎকার একটি বিষয় ঘটবে। কিংবা এখন যার জন্ম হলো, সে যখন বাংলাদেশের ১০০ বছর নিয়ে লিখবে, তখন পেছনের ৫০ বছর, আর তার নিজের ৫০ বছর নিয়ে দুই জীবন লিখতে পারবে।

ইতিহাসের পরিক্রমায় গত ৫২ বছরে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তির পরিবর্তনটুকু নিয়ে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে মোট তিনটি ভাগ করে দেখা যেতে পারে। তাহলে আমাদের অবস্থান বুঝতে সহজ হবে। বাংলাদেশ মূলত তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রবেশ করে নব্বইয়ের দশকে। এর আগে বাংলাদেশে আইবিএম মেইনফ্রেম কম্পিউটার ছিল বিশেষ গবেষণার কাজে ব্যবহারের জন্য। সাধারণ মানুষের কিংবা সরকারের বড় কোনো কাজে সেগুলো ব্যবহৃত হতো না। সারা পৃথিবীতে তখন পার্সোনাল কম্পিউটারের ব্যবহার বাড়তে থাকে। বাংলাদেশেও এর ছোঁয়া লাগতে শুরু করে। আশির দশকে বাংলাদেশে কম্পিউটার কাউন্সিল গঠিত হলেও এর কাজে কিছুটা গতি আসে নব্বইয়ের দশকে এসে।

বাংলাদেশের মানুষ চড়া দামে খুব স্বল্পমাত্রায় অনলাইন ইন্টারনেট পেতে টেলিফোন লাইনের মাধ্যমে ডায়াল করে ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত হওয়া। পাশাপাশি পুরো পৃথিবীতে ডাটা এন্ট্রির বিশাল একটি বাজার তৈরি হলো। বাংলাদেশ ওই বাজারে প্রবেশ করতে পারল না। এর মূল কারণ ছিল- বাংলাদেশ তখনো ওই বাজার ধরার জন্য প্রস্তুত ছিল না। ভারত আশির দশকেই যেভাবে তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে গুরুত্ব দিয়ে প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছিল, সেটি বাংলাদেশ পারেনি। ফলে বিলিয়ন ডলারের পুরো ব্যবসাটাই চলে যায় ভারতে।

ওই দশকে বাংলাদেশ বিনামূল্য সাবমেরিন ক্যাবলে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল, যা তখনকার সরকার নেয়নি। তারা মনে করেছিল, সাবমেরিন ক্যাবলে যুক্ত হলে সব তথ্য পাচার হয়ে যাবে। আমরা যে এভাবে ভাবতে পেরেছিলাম, সেটি একটি জাতির অনেক কিছু বলে দেয়। তথ্যপ্রযুক্তিতে যে দেশগুলো ভালো করেছে, তাদের মনস্তত্ত্ব ভিন্ন। তার সঙ্গে আমাদের ফারাক অনেক। এতটাই ফারাক যে, আমরা সেটি বুঝতেই পারব না। এ দশকে বাংলাদেশে ইন্টারনেটের ব্যবহার কিছুটা বেড়েছিল। পুরো বিশ্বেই তখন ইন্টারনেটের ব্যবহার বাড়ছে এবং ইন্টারনেটের উত্থান ওই সময়টাতেই। সিসকোর মতো বিশাল প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছিল শুধু ইন্টারনেটের গ্রোথকে সামনে রেখে। ওই প্রতিষ্ঠানটি তখনই ট্রিলিয়ন ডলারের কোম্পানি হবে বলে প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

এ দশকের সবচে বড় প্রযুক্তি ছিল ভয়েস ওভার আইপি (ভিওআইপি)। পুরো বিশ্ব যখন এ প্রযুক্তিকে বুকে জড়িয়ে নিচ্ছে, তখন বাংলাদেশ এ প্রযুক্তিকে নিষিদ্ধ করে দিল। তারা মনে করল, এর ফলে আন্তর্জাতিক ভয়েস কলের মুনাফা কমে যাবে। এ প্রযুক্তিটিকে আটকে দিল বাংলাদেশকে। ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলো এ প্রযুক্তিকে কাছে টেনে নিল; তখন এ প্রযুক্তির ব্যবহারে বাংলাদেশ যুক্ত হলো না। দেশের মানুষকেও যুক্ত করল না। ইউরোপের একটি ছোট্ট দেশ এস্টোনিয়ার চারজন প্রোগ্রামার মিলে তৈরি করে ফেলল স্কাইপ। প্রযুক্তিকে উন্মুক্ত রাখলে মানুষ কতটা ক্রিয়েটিভ হতে পারে, মানুষ কতটা জ্ঞানের দিক থেকে এগিয়ে যেতে পারে- এটি একটি বড় উদাহরণ। সেই স্কাইপ আমরা এখনো ব্যবহার করছি। স্কাইপ হলো একটি উদাহরণ মাত্র। কিন্তু স্কাইপের মতো এমন অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়েছিল, যেগুলো পরবর্তী সময়ে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিশাল অবদান রেখেছে। আমরা এখন যেমন হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, ইমো, ম্যাসেঞ্জার, সিগন্যাল ইত্যাদি কমিউনিকেশন প্ল্যাটফর্ম দেখি, তার গোড়াপত্তন হয়েছিল এ দশকে ভিওআইপি প্রযুক্তির মাধ্যমে। একটি প্রযুক্তিকে আটকে দিলে কী হয়, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো এটি।

বিশ্বের অনেক দেশ তার জনসংখ্যাকে তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করে ফেলেছিল, যার সুবিধা তারা এখনো পাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ সেটি পারেনি। তথ্যপ্রযুক্তিকে বাধা এসেছে বারবার। একটি জাতিকে কীভাবে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রস্তুত করতে হয়, সেটি নীতিনির্ধারকবৃন্দ বুঝতে চাননি। প্রযুক্তি উন্মুক্ত করে রাখলে, বাংলাদেশের জনগণ এখন অনেক বেশি প্রস্তুত থাকত। অনেক বেশি আউটপুট দিতে পারত। বাংলাদেশ সেই ভিশন দেখাতে পারেনি। গত দশক থেকেই আসলে বাংলাদেশ তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করেছে। সরকার তার অনেক সেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে চেষ্টা করেছে। পাশাপাশি এ খাতটি একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। গত দশকের শুরুতে ইন্টারনেটের ব্যবহার যতটা ছিল, সেটি অনেকাংশে বেড়েছে দশকটির শেষ ভাগে এসে। তবে বাংলাদেশ এ ব্যবহারকারী আগের দশকেই পেতে পারত, যদি সে সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে পারত। এ দশকে বাংলাদেশের মানুষ প্রাইভেট সেক্টরেও সেবা পেতে শুরু করেছে। ইন্টারনেটভিত্তিক সেবা, ডিজিটাল পেমেন্ট, ই-কমার্সগুলো আসতে শুরু করে- যেগুলো পৃথিবীর অনেক দেশ আরও ২০ বছর আগেই করে ফেলেছে। অর্থাৎ আমরা অন্তত ২০ বছরে পিছিয়ে থাকলাম।

আমরা জানি, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব হচ্ছে ফিউশন অব ফিজিক্যাল, ডিজিটাল এবং বায়োলজিকাল স্ফেয়ার। এখানে ফিজিক্যাল হচ্ছে হিউম্যান, বায়োলজিকাল হচ্ছে প্রকৃতি এবং ডিজিটাল হচ্ছে টেকনোলজি। এই তিনটিকে আলাদা করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে কী হচ্ছে? সমাজে কী ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে? এর ফলে ইন্টেলেকচুয়ালাইজেশন হচ্ছে, হিউম্যান মেশিন ইন্টারফেস হচ্ছে এবং রিয়েলটি এবং ভার্চুয়ালিটি এক হয়ে যাচ্ছে। এখন যদি আমরা আমাদের চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের জন্য প্রস্তুত করতে হলে ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সি, ফিজিক্যাল ইন্টেলিজেন্সি, সোশ্যাল ইন্টেলিজেন্সি, কনটেস্ট ইন্টেলিজেন্সির মতো বিষয়গুলো তাদের মাথায় প্রবেশ করিয়ে দিতে হবে। তাহলে ভবিষ্যতে আমরা সবাইকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত করতে পারব। তবে ভবিষ্যতে কী কী কাজ তৈরি হবে সেটা অজানা। এই অজানা ভবিষ্যতের জন্য প্রজন্মকে তৈরি করতে আমরা আমাদের কয়েকটা বিষয়ে কাজ পারি। সভ্যতা পরিবর্তনের শক্তিশালী উপাদান হলো তথ্য। সভ্যতার শুরু থেকেই মানুষ তার অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে উদগ্রীব ছিল।

বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কার, বিদ্যুতের ব্যবহার এবং ট্রানজিস্টর আবিষ্কার ব্যাপক শিল্পায়ন সৃষ্টির মাধ্যমে মানব সভ্যতার গতিপথ বদলে দিয়েছিল বলে ওই তিন ঘটনাকে তিনটি শিল্পবিপ্লব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এখন বলা হচ্ছে, ডিজিটাল প্রযুক্তির নিত্যনতুন উদ্ভাবনের পথ ধরে আসছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, যেখানে বহু প্রযুক্তির এক ফিউশনে ভৌতজগৎ, ডিজিটাল-জগৎ আর জীবজগৎ পরস্পরের মধ্যে লীন হয়ে যাচ্ছে।

২০১৫ সালে কম্পিউটার আমদানিতে শুল্ক হ্রাস, হার্ডওয়ার, সফটওয়্যার শিল্প উৎপাদনকারীদের ভর্তুকি, প্রণোদনা প্রদানসহ বিভিন্ন কার্যকরী পদক্ষেণ গ্রহণ করেন। সরকারের বিভিন্ন নীতি সহায়তার ফলে বর্তমানে দেশে হাই-টেক পার্কসহ দেশি-বিদেশি ২০টি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ তৈরি করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রপ্তানিসহ দেশের মোবাইল ফোন চাহিদার ৭০ শতাংশ পূরণ করছে।

বর্তমানে সারা দেশে ৮ হাজার ৮০০টি ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে ৩০০-এর অধিক ধরনের সরকারি-বেসরকারি সেবা জনগণ পাচ্ছেন। একসময় প্রতি এমবিপিএস ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের দাম ছিল ৭৮ হাজার টাকা। বর্তমানে প্রতি এমবিপিএস ৬০ টাকার নিচে। দেশের ৫৫ হাজার ৫০০ সরকারি অফিস একই নেটওয়ার্কের আওতায়। ৫ হাজার ৫০০ ইউনিয়নে পৌঁছেছে উচ্চগতির (ব্রডব্যান্ড) ইন্টারনেট। দেশে মোবাইল সংযোগের সংখ্যা ১৮ কোটি ৬০ লাখ। ইন্টারনেট ব্যবহারকারী প্রায় ১৩ কোটি। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম-এর প্রতিবেদনে যথার্থভাবেই মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে গ্রামীণ এলাকায় আর্থসামাজিক ব্যবধান কমিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার করে আর্থিক সেবায় মানুষের অন্তর্ভুক্তি রীতিমতো বিস্ময়কর। অনলাইন ব্যাংকিং, ইলেকট্রনিক মানি ট্রান্সফার, এটিএম কার্ড ব্যবহার শুধু ক্যাশলেস সোসাইটি গড়াসহ ই-গভর্মেন্ট প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখছে তা নয়, ই-কমার্সেরও ব্যাপক প্রসার ঘটাচ্ছে। বিশ্বের ১৯৪টি দেশের সাইবার নিরাপত্তায় গৃহিত আইনি ব্যবস্থা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, সাংগঠনিক ব্যবস্থা, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পারস্পরিক সহযোগিতার উপর ভিত্তি করে তৈরি করা সূচকে আইটিইউ-তে ৫৩তম স্থানে এবং জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা (এনসিএসআই) সূচকে ৩৭তম স্থানে অবস্থান করছে। দক্ষিণ এশিয়া ও সার্ক দেশের মধ্যে প্রথম।

স্টার্টআপ সংস্কৃতির বিকাশে আইডিয়া প্রকল্প ও স্টার্টআপ বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেডসহ সরকারের নানা উদ্যোগে ভালো সুফল দিচ্ছে। দেশে স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে উঠছে। ই-গভর্নমেন্ট কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশন করা হয়েছে। ৫২ হাজারেরও বেশি ওয়েবসাইটের জাতীয় তথ্য বাতায়নে যুক্ত রয়েছে।

২০২৫ সাল নাগাদ যখন শতভাগ সরকারি সেবা অনলাইনে পাওয়া যাবে তখন নাগরিকদের সময়, খরচ ও যাতায়াত সাশ্রয় হবে। বর্তমানে আইসিটি খাতে রপ্তানি ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অনলাইন শ্রমশক্তিতে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। প্রায় সাড়ে ৬ লাখ ফ্রিল্যান্সারের আউটসোর্সিং খাত থেকে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হচ্ছে। ৩৯টি হাই-টেক ও আইটি পার্কের মধ্যে এরই মধ্যে নির্মিত ৯টিতে দেশি-বিদেশি ১৬৬টি প্রতিষ্ঠান ব্যাবসায়িক কার্যক্রম শুরু করেছে। এতে বিনিয়োগ ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং কর্মসংস্থান হয়েছে ২১ হাজার, মানবসম্পদ উন্নয়ন হয়েছে ৩২ হাজার। ১০ হাজার ৫০০ নারীকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ২০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।

করোনা মহামারিতে সরকারের বিভিন্ন ডিজিটাল উদ্যোগ মানুষকে সহায়তা করেছে। দেশব্যাপী লকডাউনে শিক্ষার্থীদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সহযোগিতায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, মাদ্রাসা ও কারিগরি পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করা হয়।

করোনা মহামারি থেকে দেশের জনগণকে সুরক্ষিত রাখতে তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের উদ্যোগে টিকা কার্যক্রম, টিকার তথ্য সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা এবং সনদ প্রদানের লক্ষ্যে টিকা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ‘সুরক্ষা’ ওয়েবসাইট চালু করা হয় এবং দেশের জনগণ এর সুবিধা পাচ্ছে। ২০২৫ সালে আইসিটি রপ্তানি ৫ বিলিয়ন ডলার ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান ৩০ লাখে উন্নীত করা এবং সরকারি সেবার শতভাগ অনলাইনে পাওয়া নিশ্চিত করা, আরো ৩০০ স্কুল অব ফিউচার ও ১ লাখ ৯ হাজার ওয়াইফাই কানেক্টিভিটি, ভিলেজ ডিজিটাল সেন্টার এবং ২৫ হাজার শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির যে প্রসার ঘটেছে তাকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে ২০৪১ সালের মধ্যেই সরকার বাংলার আধুনিক রূপ জ্ঞানভিত্তিক উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

২০১৮ সালের ১২ মে যুক্তরাষ্ট্রের কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ করা হয়। নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপকারী দেশ হিসেবে বিশ্বের ৫৭তম দেশ হয় বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটে-১ এ ২৬টি কে-ইউ ব্যান্ড এবং ১৪টি সি ব্যান্ড ট্রান্সপন্ডার রয়েছে। দেশের সব অঞ্চল, বঙ্গোপসাগরের জলসীমা, ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া এর কভারেজের আওতায় রয়েছে।

জ্ঞানভিত্তিক ডিজিটাল বাংলাদেশের গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্যোগে ডিজিটাল বাংলাদেশের যাত্রা শুরু। এখন দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে দেশের মানুষ ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফল ভোগ করছেন। ডিজিটাল বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য হলো- সমাজের শ্রেণি, বর্ণ, পেশা ও গ্রাম-শহর নির্বিশেষে সকল মানুষের দোরগোড়ায় সহজে এবং দ্রুততার সাথে সরকারি সেবা পৌঁছে দেয়া। এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার ইউনিয়ন পর্যায় থেকে শুরু করে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত সর্বত্র সমন্বিত ই-সেবা কাঠামো গড়ে তুলেছে। এ লক্ষ্যে এটুআই এর সহযোগিতায় বর্তমানে প্রায় সকল মন্ত্রণালয় ও বিভাগে বৃহৎ পরিসরে ই-সেবা প্রদান করে আসছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য সামনে রেখে এটুআই এর উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে কিশোর বাতায়ন, ডিজিটাল সেন্টার, জাতীয় তথ্য বাতায়ন, ই-নথি, একশপ, এক পে, জাতীয় হেল্পলাইন-৩৩৩, মুক্তপাঠ, শিক্ষক বাতায়ন, এসডিজি ট্র্যাকার, ই-মিউটেশন, উত্তরাধিকার বাংলা, ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড রুম, মাইগভ অ্যাপ, ডিজিটাল সার্ভিস ডিজাইন ল্যাব ও আই ল্যাব এবং ইনোভেশন ল্যাব ইত্যাদি।

জনগণের তথ্য প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং সরকারি দপ্তর থেকে প্রদেয় সেবাসমূহ প্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিধানের লক্ষ্যে দেশের সকল ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, বিভাগ, অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়সহ ৫৫ হাজারেরও অধিক সরকারি দপ্তরে ওয়েবসাইটের একটি সমন্বিত রূপ বা ওয়েব পোর্টাল হলো জাতীয় তথ্য বাতায়ন। এখানে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের এ পর্যন্ত ৬৫৭ টি ই-সেবা এবং ৮৯ লাখ ৪৪ হাজারেরও বেশি বিষয়ভিত্তিক কনটেন্ট যুক্ত করা হয়েছে। এই বাতায়নে প্রতিদিন গড়ে এক লাখেরও বেশি নাগরিক তথ্য সেবা গ্রহণ করছে।

বাংলাদেশের জাতীয় তথ্য বাতায়ন এর জনপ্রিয় সেবা এর মধ্যে রয়েছে-অর্থ ও বাণিজ্য সেবা, অনলাইন আবেদন, শিক্ষা বিষয়ক সেবা, অনলাইন নিবন্ধন, পাসপোর্ট, ভিসা ও ইমিগ্রেশন, নিয়োগ সংক্রান্ত সেবা, পরীক্ষার ফলাফল, কৃষি, ইউটিলিটি বিল, টিকিট বুকিং ও ক্রয়, তথ্য ভান্ডার, ভর্তির আবেদন, আয়কর, যানবাহন সেবা, প্রশিক্ষণ এ স্বাস্থ্য বিষয়ক পোর্টাল কুরিয়ার, ফরমস, ট্রেজারি চালানসহ ডিজিটাল সেন্টার। এখানে রয়েছে ৬শ’ এরও বেশি ই-সেবা, ১ হাজার ৬০০ এরও বেশি বিভিন্ন সরকারি ফরম অর্থাৎ সকল সেবার ফরম এক ঠিকানায়। রয়েছে কিশোর বাতায়ন-কানেক্ট, ইমাম বাতায়ন, মুক্তপাঠ, সকল সেবা এক ঠিকানায় সেবাকুঞ্জ, জাতীয় ই-তথ্যকোষ যে কোনো স্থানে, যে কোনো সময় পাঠ্যপুস্তকের সহজলভ্যতার জন্য তৈরী করা হয়েছে ই-বুক।

জাতীয় তথ্য বাতায়নের মাধ্যমে জনগণ ঘরে বসে অনলাইনে পাসপোর্টের আবেদন করেতে পারেন। করোনা মহামারীর সময় মানুষ তাঁর প্রয়োজনীয় কাজ ঘরে বসেই ঝুঁকিমুক্তভাবে করে ফেলতে পারছেন। যে কোনো পাবলিক পরীক্ষা যেমন: এসএসসি, দাখিল ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল শিক্ষার্থীরা ঘরে বসে মুঠোফোনের মাধ্যমে জানতে পারছে। জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য হালনাগাদ করার জন্য এখন আর নির্বাচন কমিশনের অফিসে ঘোরাঘুরি করতে হয় না। জাতীয় তথ্য বাতায়নের মাধ্যমে সকল তথ্য হালনাগাদ করা যায়। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন এবং নতুন ভোটার নিবন্ধনের মত কাজও এই তথ্য বাতায়ন থেকে করা সম্ভব। দেশব্যাপী কৃষকের দোরগোড়ায় দ্রুত ও সহজলভ্য কার্যকারী ই-কৃষি সেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম “কৃষি বাতায়ন” এর মাধ্যমে কৃষিবিষয়ক যে কোনো পরামর্শ ও সেবা সহজলভ্য করা হয়েছে। বর্তমানে কৃষি বাতায়নে ৮৮ লাখ কৃষকের তথ্য মাঠ পর্যায়ে কর্মরত ১৮ হাজার কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা এবং ৬১টি উপজেলার কৃষি বিষয়ক তথ্য এই বাতায়নে সংযুক্ত রয়েছে।

ইমাম বাতায়নের মাধ্যমে দেশের ৩ লাখ ইমাম-মুয়াজ্জিনদের মধ্যে ধর্মীয় সচেতনতা তৈরীর পাশাপাশি তাদের কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইমাম বাতায়নে বর্তমানে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৮৬১ জন সদস্য ও ১৩ হাজার ৭২৪ কন্টেন্ট রয়েছে। কিশোর বাতায়ন কিশোর-কিশোরীদের জন্য নির্মিত একটি শিক্ষামূলক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যেখানে প্রায় ৩৫ লাখের বেশি শিক্ষার্থী যুক্ত হয়েছে এবং ৫১ হাজার ৩৮৩ টিরও বেশি মানসম্মত কনটেন্ট রয়েছে। এর মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জ্ঞানার্জনের সুযোগ পাচ্ছে।

শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের জন্য শিক্ষক বাতায়ন একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। এতে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষার বিভিন্ন বিষয়ে অডিও, ভিডিও, অ্যানিমেশন, চিত্র, ডকুমেন্ট, প্রকাশনা ইত্যাদি কনটেন্ট সংরক্ষিত রয়েছে। এসব কনটেন্ট ব্যবহার করে শিক্ষকগণ মাল্টিমিডিয়ায় ক্লাসরুমে শিক্ষা প্রদান করতে পারেন। শিক্ষক বাতায়নের নিবন্ধিত সদস্য প্রায় ৬ লাখ ৪৯ হাজার জন। দেশে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে উচ্চ ও নিম্ন আদালতসহ বিচার বিভাগের তথ্য নিয়ে চালু আছে বিচার বিভাগীয় তথ্য বাতায়ন। স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনমুখী বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা এবং আদালত ও নাগরিকের মধ্যকার দূরত্ব কমানোর লক্ষ্যে এ উদ্যোগের যাত্রা। বর্তমানে ৬৪টি জেলা আদালত, ৫টি দায়রা আদালত এবং ৮টি ট্রাইব্যুনালে বিচার বিভাগীয় বাতায়ন সক্রিয় রয়েছে।

উত্তরাধিকার ক্যালকুলেটর একটি স্বয়ংক্রিয় ক্যালকুলেটর। এর মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি উত্তরাধিকারদের মধ্যে প্রাপ্যতা হিসাব করা যায়। মৃত ব্যক্তির সম্পদ বন্টন ব্যবস্থার জটিলতা থেকে সহজে মুক্তি পাওয়ার চিন্তা থেকেই উত্তরাধিকার বাতায়ন এবং অ্যাপের যাত্রা। এখন পর্যন্ত ৪ লাখের বেশি নাগরিক উত্তরাধিকার ক্যালকুলেটর ব্যবহার করছেন। প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবার আওতার বাইরে ব্যাপক জনগোষ্ঠী ডিজিটাল সেন্টার থেকে অ্যাকাউন্ট খোলা, টাকা পাঠানো, সঞ্চয় করা, ঋণ গ্রহণ, বিদেশ থেকে পাঠানো রেমিট্যান্স উত্তোলন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির টাকা উত্তোলন, বিভিন্ন ধরনের ফি প্রদান ইত্যাদি আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে।

জিটুপি সিস্টেমের মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক একক আইডি ব্যবহার করে ডিজিটাল সেবা প্রদান ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বয়স্ক, স্বামী নিগৃহীতা নারী, বিধবা ও ল্যাকটেটিং মাদার ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। ই-অফিসে কার্যক্রম অংশ হিসেবে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/সরকারি দপ্তরে কাজের গতিশীলতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি আনয়নে ই-নথি বাস্তবায়ন চালু করা হয়েছে। বর্তমানে ৮ হাজারেরও বেশি অফিসের প্রায় ১ লাখের অধিক কর্মকর্তা এর সাথে যুক্ত রয়েছে। এ পর্যন্ত দুই কোটির বেশি ফাইল ই-নথি সিস্টেমের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে।

সকল সেবা একটিমাত্র প্ল্যাটফর্ম সংযুক্ত করার লক্ষ্যে একসেবা প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ৮ হাজার ১৫১ টি দপ্তরকে একসেবার সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে এবং ৬৩৪টি সেবা সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে একসেবায় নিবন্ধিত ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৯৪ হাজারের বেশি ।

সরকারি সব সেবা এক প্ল্যাটফর্মে আনার অঙ্গীকার নিয়ে ‘আমার সরকার বা মাই গভ’ প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়েছে। কেউ বিপদে পড়লে অ্যাপটি খুলে মোবাইল ফোন ঝাঁকালে সরাসরি ৯৯৯ নম্বরে চলে যাবে ফোন। একই সঙ্গে ব্যবহারকারীরা ৩৩৩ নম্বরে কল করেও নানা ধরনের তথ্য ও সেবা নিতে পারবেন। প্রয়োজনীয় তথ্যের মাধ্যমে আবেদন, কাগজপত্র দাখিল, আবেদনের ফি পরিশোধ এবং আবেদন-পরবর্তী আপডেটসহ অন্যান্য বিষয় জানা যাবে। আর আবেদনকারীর পরিচয় নিশ্চিত করা হবে জাতীয় পরিচয়পত্রের সাহায্যে। প্ল্যাটফর্মটিতে বর্তমানে ৩৩৪টি সেবা জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ওই প্ল্যাটফর্মটি রেপিড ডিজিটাইজেশনের আওতায় প্রায় ৬৪১টি সেবা ডিজিটাইজেশন করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ বির্নিমাণের ঘোষণা এখন এটি প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা সেখান থেকেই শুরু হয়েছে স্মার্ট বাংলাদেশের দিকে। তথ্য ও প্রযুক্তির ব্যবহারে বাঙ্গালি জাতির অগ্রগতি বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি কেড়েছে। নাগরিক সেবায় মানোন্নয়নে বর্তমানে সরকার গৃহিত সামগ্রিক সেবাদান প্রক্রিয়া গতি এনেছে। সেদিন আর বেশি দূরে নয়, যেদিন বাংলাদেশ সত্যিকারের ডিজিটাল রাষ্ট্র হিসেবে উন্নয়নশীল দেশের কাতার থেকে একধাপ এগিয়ে উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে, আমরা হবো সেই গর্বিত রাষ্ট্রের নাগরিক।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন “আমরা আশা করি যে, এই গ্লোবাল ডিজিটাল কমপ্যাক্টে ডিজিটাল প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ও উৎপাদনশীল ব্যবহারের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য স্পষ্ট নির্দেশনা থাকবে।”

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্মার্ট বাংলাদেশের ৪ টি স্তম্ভের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বারবার সেই স্মার্ট বাংলাদেশ ভিশনের কথা বলছেন, যার অভীষ্ট লক্ষ্যই হলো ‘স্মার্ট’! একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজের ওপর ভিত্তি করে স্মার্ট নাগরিক, স্মার্ট সোসাইটি, স্মার্ট ইকোনমি ও স্মার্ট সরকার প্রতিষ্ঠা করার মধ্য দিয়ে ‘বিস্তৃত ডিজিটাল রূপান্তরের’ দিকেই প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি নিক্ষেপিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *