জাপান-বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা


হীরেন পণ্ডিত

২০২২ সালে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সুবিধার জন্য ‘অফিসিয়াল সিকিউরিটি অ্যাসিসট্যান্স’ নামে একটি নতুন সহযোগিতা কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করেছে জাপান। এই কর্মসূচি যার মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট অন্য সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং সরঞ্জাম প্রদানের পাশাপাশি দেশগুলোর নিরাপত্তার প্রয়োজনের ভিত্তিতে অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তা করে দেশটি।

ঢাকায় নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত ইওয়ামা কিমিনোরি বলেছেন, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিবিড় করতে বাংলাদেশকে সরকারি নিরাপত্তা সহায়তা (ওএসএ) প্রকল্পে যুক্ত করেছে জাপান। নতুন এই কর্মসূচিতে প্রথম বছর যে চার দেশকে জাপান যুক্ত করেছে, বাংলাদেশ তাদের অন্যতম। অন্য তিনটি দেশ হলো- ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া ও ফিজি। এ লক্ষ্যে জাপান ও বাংলাদেশ তাদের নিজ নিজ দূতাবাসে প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে নিয়োগে সম্মত হয়েছে। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে আসার পর এবং ২০২৬ সালের মধ্যে শুল্কমুক্ত সময়ে ঢাকা-টোকিও বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে একটি অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) সইয়ের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে।

সম্প্রতি ঢাকাস্থ জাপান দূতাবাসের মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল আলোচনার সমাপনী অধিবেশনে বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় রাষ্ট্রদূত কিমিনোরি এ কথা বলেন। গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্যান এশিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পারি) ‘বাংলাদেশ-জাপান কৌশলগত সম্পর্ক বাস্তবায়ন: কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জনগণ সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক’ শীর্ষক ওই আলোচনার আয়োজন করা হয়।
গত এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপান সফর করেন। এ সফরের সময় জাপানের প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদার সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকের পর দুই দেশের সম্পর্ক কৌশলগত পর্যায়ে উন্নীত হয়। শীর্ষ বৈঠকের পর প্রচারিত যৌথ ঘোষণায় বাংলাদেশকে ওএসএতে যুক্ত করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

জাপানের রাষ্ট্রদূত বলেন, সশস্ত্র বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করতে বাংলাদেশকে ওসিএতে যুক্ত করা হয়েছে। ওই রূপরেখার আওতায় সহযোগিতা বাড়াতে বিশেষ করে সমরাস্ত্র বিনিময় ও প্রযুক্তি বিনিময়ে সাম্প্রতিক মাসগুলোয় ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) সইয়ের জন্য গত বছরের ডিসেম্বরে যৌথ সমীক্ষা দল গঠন করা হয়েছে। এরই মধ্যে দুই দফা আলোচনা শেষ হয়েছে। সমীক্ষা দল তৃতীয় দফা আলোচনা শেষ করে খুব দ্রুত ইপিএ শুরু করতে চায়। জাপানের রাষ্ট্রদূত জানান, এ বছরের শেষ নাগাদ জাপানের স্বেচ্ছাসেবীদের আবার বাংলাদেশে পাঠানো শুরু হবে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ করা প্রয়োজন, কুষ্টিয়ায় জন্ম নেওয়া বাঙালি বিচারপতি রাধা বিনোদ পাল বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের ভিত্তি গড়েছিলেন। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপ্রক্রিয়ায় যে ভূমিকা রেখেছিলেন, সেটা এখনো জাপানিদের মনে আছে। এ ছাড়া ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় জাপানি শিক্ষার্থীরা টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে বাংলাদেশের শরণার্থীদের জন্য সহায়তা পাঠিয়েছিলেন, এটাও স্মরণযোগ্য। ২০১৪ সালে জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের ঢাকা সফর ও ২০২৩ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফর দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বেড়েছে। এই প্রথমবারের মতো দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ৪০০ কোটি ডলার অতিক্রম করেছে।

ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার সংযুক্তি বাড়ানোর কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এই সংযুক্তি বাড়াতে সহায়তা দিচ্ছে জাপান। বাংলাদেশ-জাপান আগামী দিনে এক সঙ্গে এগিয়ে যাবে। জাপান ও বাংলাদেশের সম্পর্কের বৈশিষ্ট্য হলো এ অঞ্চলে এবং এর বাইরে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বৃদ্ধিতে অভিন্ন অঙ্গীকার। তিনি বলেন, আগামী দিনে জাপান ও বাংলাদেশের মধ্যে যোগাযোগ ও সার্বিক সম্পর্ক আরও উন্নত হবে।

শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য জাপান সশস্ত্র বাহিনী এবং সমমনা দেশগুলোর আঞ্চলিক সংগঠনের সুবিধার জন্য ওএসএ সহযোগিতা কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছে। জাপান বাংলাদেশের সঙ্গে ‘প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তর’-সংক্রান্ত একটি চুক্তি বিষয়ে ঘোষণা দিয়েছে। গত এক দশকে বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটেছে।

জাপানি অর্থায়নে বাংলাদেশে বড় প্রকল্পগুলোর বিশেষ অগ্রগতি হয়েছে। এর মধ্যে অক্টোবরে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল চালু হয়েছে। এ ছাড়া মেট্রোরেল প্রকল্পের প্রথম ধাপ চালু হয়েছে দ্বিতীয়টি ধাপের কাজ শেষ। ঢাকা-নারিতা বিমান যোগাযোগও চালু হয়েছে। জাপান বাংলাদেশের বিশ্বস্ত বন্ধু। বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের দ্বিপক্ষীয় ছাড়াও দেশটির সঙ্গে বহুপক্ষীয় সম্পর্ক রয়েছে। এ ছাড়া আমাদের কৌশলগত সম্পর্কও শক্তিশালী হচ্ছে।

বাংলাদেশ-জাপান কূটনৈতিক সম্পর্ক সংস্থাপনের ৫০তম বার্ষিকী উদযাপিত হয়েছে। অর্থনৈতিক অবস্থানের দিক দিয়ে ব্যাপক ব্যবধান সত্তে¡ও এশিয়ার এ দু’টি দেশের সরকার ও জনগণের মধ্যে বিদ্যমান সুসম্পর্ক সুদৃঢ়করণ ও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা সম্প্রসারণের ঐকান্তিক ইচ্ছা কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের নানা আগ্রহ-আয়োজনের মধ্যে প্রতিফলিত হয়। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য স্বার্থ দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের আধুনিক পর্যায়ে প্রাধান্য পেলেও বর্তমান সম্পর্কের ভিত্তি সুদীর্ঘ সময়ের গভীরে প্রোথিত। ওইসিডি সদস্য দেশগুলোর মধ্যে শিল্পোন্নত জাপানই সর্বপ্রথম বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।
জাপানিদের মধ্যে তাকাশি হায়াকাওয়া জাপান বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদার করার ক্ষেত্রে অবিস্মরণীয় অবদান রাখেন। তিনি একটানা ৪০ বছর জাপানের জাতীয় সংসদ ‘ডায়েট’-এ নির্বাচিত সদস্য ছিলেন এবং ‘ফাদার অব দ্য ডায়েট’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। জাপানের ডায়েটে প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে হায়াকাওয়া বাংলাদেশের জনগণের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি জাপানি জনগণ ও সরকারের সমর্থন সম্প্রসারণের জন্য বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ জাপানি মিডিয়ায় বিশেষ গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশের শরণার্থীদের সাহায্যার্থে অর্থ সংগ্রহে এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রতি জাপানিদের সমর্থন সমন্বয়ে জাপানের বুদ্ধিজীবী, শিল্প মালিক, শ্রমিক, ছাত্রসমাজকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি।

১৯৭৩ সালের অক্টোবরে জাপানে বাংলাদেশ থেকে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে শীর্ষ পর্যায়ের প্রথম সফরের সময় বাংলাদেশ-জাপান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের ক্ষেত্রে যে সুযোগ সৃষ্টি হয়। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নতুন সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পর জাপান সরকার ও জনগণ বেশ সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যালোচনার পদক্ষেপ নেয়। বাংলাদেশ সরকারও জাপান-বাংলাদেশের বন্ধুত্বের বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। এই সময় শীর্ষ সফরের সময় জাপান-বাংলাদেশ আর্থিক সহযোগিতার দিগন্ত উন্মোচন হয়। যমুনা সার কারখানা, কর্ণফুলী সার কারখানা, যমুনা সেতুসহ কয়েকটি বড় প্রকল্প জাপানি অর্থায়নে বাস্তবায়নের উদ্যোগ গৃহীত হয়।

বাংলাদেশ জাপানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি বড় অনুষঙ্গ হলো গত ৫০ বছরে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বাণিজ্যিক আদান-প্রদানের প্রসারতা। এ কথা প্রণিধানযোগ্য যে আধুনিক পর্যায়ে দুই দেশের সম্পর্কের গভীরতা ও গতিপ্রকৃতিতে অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং বাংলাদেশ-জাপান দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের উত্থান-পতন বিশেষ নির্দেশক হিসেবে কাজ করেছে।
এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ চীন ও ভারতের পর তৃতীয় দেশ হিসেবে জাপানের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক গড়ল। জাপানের মতো পশ্চিমঘেঁষা দেশের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ককে বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপান সফরের সময় ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর আলোকে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীকে আরো আধুনিকায়নের পরিকল্পনা ও উদ্যোগ সম্পর্কে জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন। জাপান-বাংলাদেশ দুই পক্ষের মধ্যে কৃষি, শুল্কসংক্রান্ত, প্রতিরক্ষা, তথ্য-প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, শিল্পোন্নয়ন, মেধাসম্পদ, জাহাজ রিসাইক্লিং এবং মেট্রো রেল বিষয়ে যেসব চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্রে তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করবে।
তাছাড়া অন্যান্য সময়ের মতোই স্বাভাবিক রয়েছে ঢাকায় বিদেশি নাগরিকের আসা যাওয়ার সংখ্যা। বাংলাদেশে পা রেখেই অধিকাংশ বিদেশি নাগরিক বলেন, নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত নন তারা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তথ্যমতে পুরো দেশে অবস্থানরত লাখ লাখ বিদেশি নাগরিকের নিরাপত্তায় নেয়া হয় বিশেষ ব্যবস্থা।

কোনো দেশই শুধু তার নিজস্ব বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা অর্জন করতে পারে না, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রয়োজন। চীনের উত্থানের পেছনে যেমন জাপানি বিনিয়োগের অবদান রয়েছে, তেমনি আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর উন্নয়নেও জাপানি বিনিয়োগের ভূমিকা রয়েছে। আমাদের প্রতিবেশী ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কাসহ থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো চায়না প্লাস ওয়ান পলিসির সুযোগে জাপানি বিনিয়োগ পেতে এখন মরিয়া। এ সময় জেট্রোর প্রতিবেদনটি আমাদের দেশের জন্য খুবই স্বস্তিদায়ক। আমরা ভারত ছাড়া অন্য সব দেশের চেয়ে এগিয়ে আছি। এ সুযোগ কোনোভাবেই হাতছাড়া করা ঠিক হবে না। এ সুযোগ যেন হাতছাড়া না হয়, সে জন্য জাপানের ছাত্রছাত্রী ও জেট্রোর কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভের চিহ্নিত সমস্যাগুলো সমাধানের যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এখনই।

হীরেন পণ্ডিত: প্রাবন্ধিক ও গবেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *