বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়


হীরেন পণ্ডিত

১৯৭১ সালে ৯ মাস বাংলাদেশে যে যুদ্ধ হয়, তা ছিল নিজ স্বাধীন দেশকে হানাদার বাহিনী থেকে মুক্ত করার যুদ্ধ। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ভেতর দিয়ে আসা একটি স্বাধীন দেশের জন্য সব মানুষ এই যুদ্ধ করে। স্বাধীন বাংলাদেশ নামক যে দেশটি ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ জন্ম নিল, ওই দেশ বা রাষ্ট্রটি যে নির্বাচনের ভেতর দিয়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত- তা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র বা বাংলাদেশের সংবিধানের মাতৃজননকোষে স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখিত।

যে কোনো মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রাম যেমন দেশের মানুষের আত্মত্যাগের মাধ্যমে হয়, তেমনি এর সঙ্গে সহযোদ্ধা হিসেবে পাশে দাঁড়ায় পুরো পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষ। পুরো পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষকে সেদিন বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়ানোর নায্যতা দিয়েছিলেন বন্দি স্বাধীন রাষ্ট্রপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জনগণের কূটনীতিতে সেদিন ইয়াহিয়াকে পরাজিত করেছিলেন বন্দি বঙ্গবন্ধু। অর্থাৎ নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির মধ্য দিয়ে সরকার গঠন করে, সশস্ত্র পথে হানাদার তাড়ানোর যুদ্ধে সেদিন বঙ্গবন্ধুর কূটনীতির কাছে হেরে যায় পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ। বিজয়ী হন বঙ্গবন্ধু, রূপান্তরিত হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান থেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানে। ভারত, রাশিয়াসহ বিশ্ববিবেকের সমর্থন না পেলে ৯ মাসে স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব নাও হতে পারত। তা ছাড়া কেউ ইচ্ছা করলেই একটি দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করতে পারেন না। স্বাধীনতা ঘোষণা করার এখতিয়ার বা অধিকার থাকতে হয়। যিনি ঘোষণা করবেন, তার প্রতি নিজ দেশের এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বের সমর্থন থাকতে হবে। স্বাধীনতার ডাক দিলেই জনগণ এতে সমর্থন দেবে না। সত্তরের নির্বাচনে বিজয়ী দলের নেতা হিসেবে একমাত্র বঙ্গবন্ধুরই স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার অধিকার ছিল।

ইতিহাসের যে কোনো বড় ঘটনার উদারতা এই যে, তা নতুন বাস্তবতায় নতুনতর তাৎপর্যে আমাদের পথ দেখাতে পারে। প্রকৃতপক্ষে মুক্তিযুদ্ধ এমন এক বিশাল বিষয়- নতুন নতুন বাস্তবতায় যা বারবার আত্মস্থ করে আমাদের পথের ঠিকানা ঠিক করে নেওয়ার দরকার হয়। গত ৫২ বছরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অনেক চড়াই-উতরাই ঘটেছে। ওই অভিজ্ঞতার আলোকে এসব আদর্শ ও মূল্যবোধের ধারণায় নতুন নতুন বিষয় যুক্ত হয়েছে, এখনো হচ্ছে। অনেক ধারণা এই পরিস্থিতির ব্যাপকভাবে পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমান পৃথিবীতে এসব নতুন বিষয়ে আমাদের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, সাফল্য-ব্যর্থতা, নিজেদের অর্জন-বিসর্জনের পর্যালোচনা না করে জাতি হিসেবে আমাদের এগোনোর উপায় নেই।

মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি; পেয়েছি সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে সেটিই আমাদের মহান অর্জন। কিন্তু ১৯৭১ সালের যুদ্ধকে ভালোবেসে আমরা নাম দিয়েছিলাম মুক্তিযুদ্ধ। কারণ ওই যুদ্ধে স্বাধীনতার দাবির পরিসর আরও বেড়ে গিয়েছিল। ধারণা হিসেবে ‘মুক্তি’ শব্দটির ভাব আরও ব্যাপক। মুক্তি মানে মানুষের সার্বিক বিকাশের মুক্তি। সেদিকেই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।

এখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত আছে এবং জনগণের কল্যাণে নিবেদিত হয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশকে যেভাবে এগিয়ে নিয়েছিলেন, তার অসম্পূর্ণ স্বপ্নপূরণের পথে এগিয়ে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার গতিশীল নেতৃত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় এমডিজি অর্জন, এসডিজি বাস্তবায়ন, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল চালু করা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, লিঙ্গসমতা, কৃষি, দারিদ্র্যসীমা হ্রাস, গড় আয়ু বৃদ্ধি, রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন, ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, পোশাকশিল্প, ওষুধশিল্প, রপ্তানি আয় বৃদ্ধিসহ নানা অর্থনৈতিক সূচক বেড়েছে। এই সরকারের মেয়াদকালে তিনি দেশের জন্য বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড করেছেন।

শেখ হাসিনা তার পিতার মতোই দৃঢ়ভাবে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। এ দেশে ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তিনিই ছিলেন অগ্রভাগে। দেশের গরিব-দুঃখী মানুষের বেদনাও তিনিই সবচেয়ে গভীরভাবে অনুভব করেন। দেশের অর্থনীতি পরিচালনার দিকেও রয়েছে তার দৃষ্টি। সবচেয়ে দুঃসময়ে দলের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে আওয়ামী লীগকে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির লালন, শোষণমুক্ত সমাজ বিনির্মাণ এবং একটি উন্নত, সমৃদ্ধ, আধুনিক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা বিনির্মাণের লক্ষ্যে নিরন্তর কাজ করে চলেছেন। বাংলাদেশ জন্মের ৫২ বছর অতিক্রম করছে। বাংলাদেশ নানা দিক থেকেই এগিয়ে যাচ্ছে। আর এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, অগগ্রতির মধ্য দিয়েই একটি দেশ সমৃদ্ধ হয়। যদি বিশ্বের অন্যান্য দেশ বাংলাদেশের অগ্রগতির স্বীকৃতি দেয় এবং প্রশংসা করে, তা হলে সেটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও অনুপ্রেরণার। স্বাধীনতা-পরবর্তী একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দরিদ্র দেশ থেকে দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ হওয়ার পথে বাংলাদেশের গত পাঁচ দশকের যাত্রা ছিল অভাবনীয়। বাংলাদেশ নানা দিক থেকেই এগিয়ে যাচ্ছে। তা বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই আলোচনায় এসেছে।

বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার কাজটি সহজ ছিল না। নানা ধরনের ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে দেশের অগ্রগতি অব্যাহত আছে। ফলে যে বিষয়গুলো সামনে আসছে, তা প্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করে সংশ্লিষ্টদের কর্তব্য হওয়া দরকার আরও পদক্ষেপ গ্রহণ ও দেশের সামগ্রিক সমৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে উদ্যোগী হওয়া। আমলে নেওয়া দরকার, একটি উদারনৈতিক দেশ হিসেবে উগ্রবাদ মোকাবিলায় বাংলাদেশের অর্জন প্রশংসনীয়।

ডিজিটাল বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান উনয়ন ও আধুনিকীকরণ এবং নাগরিকদের সুবিধার্থে কাজ করছে। সেবা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবস্থাপনা, কাজের পদ্ধতি, শিল্প, বাণিজ্য ও উৎপাদন, অর্থনীতি, সামাজিক, সাংস্কৃতিক জীবন ডিজিটাল পদ্ধতিতে। দেশের প্রত্যেক নাগরিকের কাছে প্রযুক্তি যেমন সহজলভ্য হয়েছে, তেমনি প্রান্তিক সব মানুষের কাছেও পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সব নাগরিক পরিষেবা ও জীবিকার ক্ষেত্রে প্রযুক্তি একটি বিশ্বস্ত মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

অনেক পরিবর্তন ও উন্নয়ন! অবকাঠামোসহ অনেক বিষয়ে দেশ এগিয়েছে। চোখের সামনে যা দৃশ্যমান, তা অস্বীকার করা নিছক বোকামি। আওয়ামী লীগ সরকার অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও নাগরিক সেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছে, সহজ করে দিয়েছে এবং এতে সরকারপ্রধানের কঠোর নির্দেশনা আছে- এটি মানতেই হবে। গ্রাম এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থা ও সড়ক কাঠামো চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না যে, এসব অঞ্চলের মানুষ জীবন-জীবিকাকে কতটা সহজভাবে গ্রহণ করতে পেরেছে এবং অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। শেখ হাসিনার স্বপ্ন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। দেশের মানুষকে উন্নয়নের স্বাদ পাইয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে তিনি কাজ করছেন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনা, বঙ্গবন্ধুর অস্তিত্বকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে স্থান দিয়ে যথাযথ মর্যাদার আসনে বসানোই ছিল তার মূল লক্ষ্য। বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের অঙ্গীকার ছিল দেশবাসীর অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ইত্যাদি মৌলিক অধিকার পূরণ করা।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা গত ১৫ বছরেরও বেশি দেশকে যেভাবে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন এবং বাংলাদেশ বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটেও অন্য দেশগুলোর মতো বড় ধরনের কোনো অর্থনৈতিক সংকটে না পড়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে এই সময়ে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে শক্ত অবস্থানে নিতে পেরেছেন। তা না হলে ১৭ কোটি মানুষের দেশটিকে এই সংকটকালেও বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করা বেশ কঠিন হতো। সামনে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দেশের মানুষ অবশ্যই তাদের অর্জন-অপ্রাপ্তির তুলনা করতে বসবে। শেখ হাসিনার ১৫ বছরের দেশ পরিচালনায় বাংলাদেশ কী পেল? তবে সবকিছু ছাড়িয়ে এক নতুন উচ্চতায় উঠে এসেছে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। নতুন প্রজন্মকে এই অর্জন এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

হীরেন পণ্ডিত : প্রাবন্ধিক ও গবেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *