মনুষ্যত্ববোধ আমাদের পরিচালনা করুক


হীরেন পণ্ডিত: নিজেদের আমরা সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ জীব দাবি করি। মানুষকে প্রমাণ করতে হবে সে মনুষ্যত্ববোধ নিয়ে চলে। অবশ্য বিশ্বের সবখানেই এখনো জাতি, ধর্ম বা বর্ণের ওপর ভিত্তি করে চলে নির্বিচার মানুষ হত্যা, করোনার মতো মহামারির কাছে হেরে যায় পারিবারিক স্নেহ, বন্ধন, মনুষ্যত্ববোধ। যেখানে এখনো নারীকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা পাওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়। বিভিন্ন বিষয় বাড়িয়ে তোলে নারী নির্যাতনের মতো ঘটনা, মহাদুর্যোগের সময় যেখানে কতিপয় ব্যক্তির জন্য হয়ে ওঠে মুনাফা লাভের মোক্ষম সুযোগ। মানুষ এখন পশু বা তার চেয়ে নিকৃষ্ট প্রাণীতে পরিণত হচ্ছে কি না, সেটিই একটি বড় প্রশ্ন। মানুষের স্বপ্ন তাকে বাঁচিয়ে রাখে, কিন্তু একটা বিশ্ব, একটা পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়োজন সবার ভালোবাসা, পারস্পরিক সম্মানবোধ ও বোঝাপড়া। আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য আজ আমরা যে বিশ্ব তৈরি করে যাচ্ছি, তা যেন পাঠ্যবইয়ে এমন কোনো বিলুপ্ত সময়ের প্রতিনিধিত্ব না করে, যা পড়ে তারা শঙ্কিত বোধ করবে, বরং সে বিশ্ব হোক ভালোবাসার আর উদারতার। জেগে উঠুক মানুষের মধ্যকার মনুষ্যত্ব আর মানবিকতাবোধ।

‘মানুষ বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণী, যখন সে আইন ও বিচারক্ষমতাসম্পন্ন থাকে, তখন সে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব, আর যখন সে আইন ও বিচারক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, তখন সে পৃথিবীর নিকৃষ্টতম প্রাণী’- এটি মনীষী অ্যারিস্টটলের কথা। আমরা মানুষ, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব, অন্যান্য প্রাণী বা সবকিছু থেকে আমাদের আলাদা করা হয় বিচারবুদ্ধির জন্য, বিবেকের জন্য। কিন্তু আমরা কি আমাদের বিচারবুদ্ধি, বিবেককে কাজে লাগাচ্ছি বা লাগাই? আমাদের প্রতিদিন কী পরিমাণ নৈতিক স্খলন, বিবেকের স্খলন হচ্ছে, তা আমরা ভেবে দেখি না। আমাদের কাছে থাকা মানবীয় গুণাবলি বিসর্জন দিচ্ছি প্রতিনিয়ত, হারিয়ে যাচ্ছে নীতিনৈতিকতা, লোপ পাচ্ছে আমাদের ভালোমন্দ বিচার করার ক্ষমতা। মানুষের প্রতি মানুষের সহমর্মিতা বিলীন হচ্ছে কালের গর্ভে, প্রেম-ভালোবাসা ও দয়ামায়া, ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের মাঝ থেকে। আমরা কিন্তু মানবীয় গুণাবলি হারিয়ে ক্রমেই অমানুষ হয়ে হিংস্র প্রাণীর মতো নিষ্ঠুর আচরণ করছি। এমন কেন হচ্ছে? আমরা যত শিক্ষিত হচ্ছি, আমাদের মধ্যে মানবতাবোধ যেখানে বৃদ্ধি পাওয়ার কথা, সেখানে মানবতবোধ প্রতিনিয়ত কমে যাচ্ছে। কিন্তু কেন? শিক্ষিত মানুষের মধ্যে মানবীয় গুণাবলি আরও বেশি থাকার কথা, তা কিন্তু এখন আর দেখা তেমন দেখা যাচ্ছে না। আজকাল প্রতিনিয়ত ক্ষতবিক্ষত হতে হয়, দৈনিক পত্রিকার পাতা ওলটালেই দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়, এসব খবর পড়ে, নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।

ভালো-মন্দের বিচারক্ষমতা দ্বারা যে বিবেক নির্ধারিত হয়, সে ব্যাপারে সবাই একই বিন্দুতে থাকবেন- নিঃসন্দেহে তা বলা সম্ভব। ভিন্ন বিন্দুতে থাকবেন ভালো-মন্দ আলাদা করা নিয়ে অর্থাৎ কোনটা ভালো ও কোনটা মন্দ, সেটা নির্ধারণে ভিন্ন ভিন্ন মত থাকবে। এ ভিন্নতা হতে পারে ব্যক্তি, সমাজ, এলাকা, সময়, ঘটনা ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে। বিবেকের কাজ হলো কোনো কিছুর ভালো-মন্দ, সুবিধা-অসুবিধা, সক্ষমতা-অক্ষমতা, নীতির কাছে সঁপে দিয়ে বর্তমানকে ভিত্তি ধরে ভবিষ্যৎ ভাবনাকে বিচার করে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে মানবসত্তাকে সহযোগিতা করা। কিন্তু আসল সিদ্ধান্তে আসতে হবে সত্তা নিজেকেই। আমরা প্রত্যেকেই দেশের শান্তির কথা বলি, সবার মিলনের কথা বলি, উজ্জ্বলতার কথা বলি, নীতির কথা বলি, সত্যের কথা বলি, সাফল্যের কথা বলি, এমনকি এসব কথা শুনতেও পছন্দ করি। কাজের বেলায়ও এসবের তরে নিজেকে সঁপে দিতে ভালো লাগে, কিন্তু যখন দেখা যায়, অন্যের তুলনায় নিজের থলেটা তেমনভাবে পূর্ণ হচ্ছে না, তখনই বিবেক হয়ে ওঠে হিংস্র। আর যে শান্তি কিংবা অন্য ইতিবাচক কিছুর জন্য নিজেকে তুলে ধরা হয়েছিল, সেসব কিছু একটি অসুস্থ বিবেক এসে ঢেকে ফেলে। যেমন করে মেঘ এসে আকাশের নীলকে অদৃশ্য করে দেয়, যা নিতান্তই কষ্টের জন্ম দেয় সবার।

কিন্তু আমরা কি বিবেক নিয়ে ভাবি? এখন আমরা ব্যস্ত আছি কে কতটা নিচে নামতে পারি সেই প্রতিযোগিতায়। কী পরিমাণ নৈতিক স্খলন হচ্ছে প্রতিদিন তা আমরা ভেবে দেখি না, জীবনযাত্রার দৌড়ে সবাই শামিল কে কাকে কীভাবে পেছনে ফেলে নিজে এগিয়ে যাবে তা নিয়েই ব্যতিব্যস্ত, বিবেকের স্খলন হচ্ছে তা আমাদের কাছে ব্যাপার নয়। যেকোনো মূল্যে সম্পদশালী হতে হবে। আমাদের কাছে থাকা মানবীয় গুণাবলি বিসর্জন দিচ্ছি প্রতিনিয়ত, সম্পদ আহরণের জন্য, ভোগ বিলাসের জন্য। আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে নীতিনৈতিকতা, লোপ পাচ্ছে আমাদের ভালো-মন্দ বিচার করার ক্ষমতা। মানুষের প্রতি মানুষের সহমর্মিতা বিলীন হচ্ছে কালের গর্ভে, প্রেম-ভালোবাসা ও দয়ামায়া ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের মাঝ থেকে।

নিজের বিরুদ্ধেই প্রতিনিয়ত যুদ্ধে নামছে মানুষ। সেই যুদ্ধে হারিয়ে যাচ্ছে তাদের মূল্যবোধ। হারিয়ে যাচ্ছে মানবিকতাও। অন্ন-বস্ত্রের প্রাচুর্যের চেয়েও নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও মনুষ্যত্ব বড়। মানুষ যতদিন পর্যন্ত এই বোধটি ধারণ করবে না, ততদিন পর্যন্ত কেউ মানবজীবনে সোনা ফলাতে পারবে না। তাদের মধ্যে সেই শিক্ষা প্রাথমিক পর্যায় থেকেই দিয়ে দিতে না পারলে কখনোই মূল্যবোধ সৃষ্টি হবে না। কেননা শিক্ষার আসল কাজই হলো মূল্যবোধ সৃষ্টি। শুধু জ্ঞান দান নয়। জ্ঞান মূল্যবোধ সৃষ্টির উপায়মাত্র।

এমন সব কারণে আমাদের সমাজে মেধাবী কম না হলেও আদর্শনিষ্ঠ এবং সৎ ও নীতিপরায়ণ মেধাবী প্রতিবাদী মানুষের সংখ্যা কমে আসছে। নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের দিক থেকে আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকেছে, চলুন, আমরা আবার সামনের দিকে ঘুরে দাঁড়াই, নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে আমাদের সুকুমার বৃত্তিগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে, নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয় রোধ করে আমাদের মনুষ্যত্ববোধকে জাগিয়ে বাংলাদেশকে আরও সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাই। যার জন্য ৩০ লাখ শহিদ আত্মত্যাগ করেছেন, অসংখ্য মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছেন। একটি সুন্দর বাংলাদেশ বিনির্মাণে আমরা মনোনিবেশ করি, আমরাই একটি সুন্দর সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারি।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *