ইশতেহারে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ সুরক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ

হীরেন পণ্ডিত: ২৭ ডিসেম্বর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ : উন্নয়ন দৃশ্যমান, বাড়বে এবার কর্মসংস্থান’ স্লোগানে নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের ঘোষিত ইশতেহারে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসা, গণতান্ত্রিক চর্চার প্রসার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, আর্থিক খাতে দক্ষতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবা সুলভ করা, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলাসহ মোট ১১টি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আওয়ামী লীগের ২০০৮ সালের ইশতেহারের শিরোনাম ছিলো ‘দিন বদলের সনদ’, ২০১৪ সালের ‘এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ’, ২০১৮ সালের ইশতেহারের শিরোনাম ছিলো ‘সমৃদ্ধি ও অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’। ২১টি বিশেষ অঙ্গীকারে ছিলো এটিতে। আর্থসামাজিক উনয়নের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে নতুন কৌশল উদ্ভাবন ও বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে বলেও ইশতেহার ঘোষণার সময় জানানো হয়।

নতুন করে সরকারে এলে দলটি জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ সুরক্ষার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেবে বলে অঙ্গীকার করেছে। ইশতেহারে শুধু পাঁচ বছর নয়, ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশ গড়ার কথাও উঠে এসেছে। ইশতেহারে বলা হয়, গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স ২০২১ অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ১০টি দেশের মধ্যে সপ্তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত চ্যালেঞ্জ সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করা ও খাপ খাইয়ে চলা বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ভৌত-প্রাকৃতিক চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে ক্রমবর্ধমান শিল্পায়ন, নগরায়ণ, আধুনিকায়ন এবং জনসংখ্যা-উৎপাদন-ভোগ বৃদ্ধির পরিবেশগত অভিঘাত সুষ্ঠুভাবে মোকাবিলা করা আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই দুই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিগত সময়কালে আওয়ামী লীগ সরকার যথেষ্ট সাফল্য অর্জন করেছে এবং আগামী দিনেও এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে অঙ্গীকারবদ্ধ।

২০২৩ সালের সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত জলবায়ু সম্মেলনে (কপ-২৮) জলবায়ু বিষয়ক কর্মকাণ্ডে নেতৃত্বের কণ্ঠস্বর হিসেবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা মানুষের পক্ষে বিশ্বব্যাপী অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘ক্লাইমেট মোবিলিটি চ্যাম্পিয়ন লিডার অ্যাওয়ার্ড’-এ ভূষিত করা হয়। জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা সমর্থিত গ্লোবাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট মোবিলিটি (জিসিসিএম) তাকে এ পুরস্কারে ভূষিত করে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে বাংলাদেশকে রক্ষার জন্য ২০০৯ সালে বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড অ্যাকশন প্ল্যান (বিসিসিএসএপি) তৈরি করা হয়েছে। নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলারের বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করা হয়েছে। এ ফান্ডের অর্থায়নে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

২০১৮ সালে সরকার অংশীজনের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে ‘জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা’ প্রণয়ন করে। এই পরিকল্পনায় ১৪টি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ ও ১১টি ‘জলবায়ু সংকটাপন্ন এলাকা’ চিহ্নিত করে কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়।

১০টি প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সেগুলোর মধ্যে ৫টি প্রকল্প সম্পূর্ণ বাতিল এবং বাকি ৫টি কয়লার পরিবর্তে গ্যাসে রূপান্তর করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘের ‘প্যারিস চুক্তি’ স্বাক্ষর করে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যমান প্রবণতার তুলনায় উষ্ণতা বৃদ্ধিকারক গ্যাসের উদগিরণ শর্তহীনভাবে ৬.৭ শতাংশ এবং শর্তাধীনভাবে আরও ১৫.১ শতাংশ হ্রাসে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৮তম অধিবেশনের ক্লাইমেট মোবিলিটি সামিটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জলবায়ুজনিত কারণে বাধ্য হয়ে অভিবাসন এবং বাস্তচ্যুতির দিকটি বিশ্ব নেতৃবৃন্দের তীক্ষè দৃষ্টিতে নিয়ে আসেন। এর আগেও বাংলাদেশ গত কয়েক বছর ধরে ঢাকায় আইওএমের সহযোগিতায় আয়োজিত দু’টি সংলাপ এবং গত বছর মিসরের শার্ম এল শেখে কপ ২৭ এ বিষয়টি তুলে ধরেন।

একই সঙ্গে কক্সবাজারে বাস্তুচ্যুত ৪ হাজার ৪০০ পরিবারকে পুনর্বাসনের জন্য বিশ্বের বৃহত্তম বহুতল সামাজিক আবাসন প্রকল্প নির্মাণসহ জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের উদ্যোগের নানা দিক তুলে ধরেন তিনি। জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর একটি বিস্তৃত জোট এই ইস্যুতে একযোগে কাজ করছে।

জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক সংকট। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর অন্যতম। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব; যেমন- বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস, টর্নেডো এবং জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা প্রভৃতির কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এই জলবায়ু পরিবর্তন দেশের কৃষি, অবকাঠামো ও জীবনযাত্রার ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলছে।

বিশ্বের সকল দেশের শীর্ষ নেতারা একত্র হয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবগুলো মোকাবেলা করতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অগ্রভাগে থাকা বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বিপন্ন ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে একসঙ্গে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে এই বছরের জলবায়ু সম্মেলনে অংশ নিয়েছে। চলতি বছরের সম্মেলনে বাংলাদেশ পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে একসঙ্গে কাজ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

বৈশ্বিক স্টক-বাংলাদেশের এজেন্ডার প্রথম ইস্যুটি ‘প্রথম বৈশ্বিক স্টকটেক’ সম্পর্কিত, যা এই বছরের জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বৈশ্বিক মজুদ হলো দেশ এবং অংশীদারদের জন্য একটি প্রক্রিয়া, যেখানে তারা প্যারিস জলবায়ু পরিবর্তন চুক্তির লক্ষ্য পূরণের দিকে সম্মিলিতভাবে কোথায় অগ্রগতি করছে এবং কোথায় নেই, তা দেখার জন্য। লস অ্যান্ড ড্যামেজ তহবিল : লস অ্যান্ড ড্যামেজ শব্দটি বোঝায় যে দেশগুলো, বিশেষত জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো জলবায়ু সংকটের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে- তারা যে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। জাতিসংঘ এটিকে এভাবে ব্যাখ্যা করেছে : ‘জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে উদ্ভূত ক্ষতি ও ক্ষতির মধ্যে চরম আবহাওয়ার ঘটনাগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। তবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, সমুদ্রের অ্যাসিডিফিকেশন, হিমবাহ পশ্চাদপসরণ এবং সম্পর্কিত প্রভাব, লবণাক্ততা, ভূমি ও বন অবক্ষয়, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি এবং মরুকরণের মতো ধীরগতির ঘটনাগুলোও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।’

অভিযোজনে বৈশ্বিক লক্ষ্য : গ্লোবাল গোল অন অ্যাডাপ্টেশন জিজিএ প্যারিস চুক্তির ৭.১ অনুচ্ছেদের অধীনে একটি সম্মিলিত প্রতিশ্রæতি, যার লক্ষ্য ‘বিশ্বের অভিযোজিত ক্ষমতা বৃদ্ধি, স্থিতিস্থাপকতা জোরদার করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি হ্রাস করা।’ জিজিএর উদ্দেশ্য হলো একটি ঐক্যবদ্ধ কাঠামো হিসেবে কাজ করা, যা প্রশমনের মতো একই মাত্রায় অভিযোজনের জন্য রাজনৈতিক পদক্ষেপ এবং অর্থ পরিচালনা করতে পারে।

বাংলাদেশ ‘বৈশ্বিক অভিযোজন লক্ষ্য’-এর কাঠামো তৈরি ও প্রণয়নে সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে একযোগে কাজ করতে চায়। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর পাশাপাশি বাংলাদেশ সদস্য দেশগুলোকে তাদের জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদানে (এনডিসি) বর্ণিত ২০৩০ সালের প্রশমন লক্ষ্যগুলো ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে এবং এলডিসি দেশগুলোতে তহবিল বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জলবায়ু অর্থায়ন। জাতিসংঘের মতে, জলবায়ু অর্থায়ন বলতে স্থানীয়, জাতীয় বা আন্তঃদেশীয় অর্থায়নকে বোঝায়। সরকারি, বেসরকারি এবং অর্থায়নের বিকল্প উৎস থেকে নেওয়া, যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা করবে এমন প্রশমন এবং অভিযোজন পদক্ষেপকে সমর্থন করতে চায়।

অভিযোজন তহবিল উন্নয়নশীল দেশগুলোর দুর্বল সম্প্রদায়গুলোকে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সহায়তা করে এমন প্রকল্প এবং কর্মসূচিকে অর্থায়ন করে। দেশের চাহিদা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং অগ্রাধিকারের ওপর ভিত্তি করে উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এ বছর লস অ্যান্ড ড্যামেজ তহবিলের বিষয়ে একটি দীর্ঘ প্রতীক্ষিত চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হয়েছে। প্রথমে বিশ্বব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি তহবিল গঠন করা হবে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অর্থ বিতরণ করতে সক্ষম হবে এবং ধনী শিল্পোন্নত দেশ, উদীয়মান অর্থনীতি এবং জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশ; যেমন- চীন, উপসাগরীয় দেশ ।

জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ফলে জলবায়ু জরুরি অবস্থার তীব্রতা বৃদ্ধি পাবে। অ্যাডভান্সেস ইন অ্যাটমস্ফিয়ারিক সায়েন্সেস জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় এটি উল্লেখ করেছে যে এশিয়ার বৃহৎ অংশ এবং আমেরিকা মহাদেশের বেশির ভাগ অংশ একটি ব্যতিক্রমী উষ্ণ শীত অনুভব করতে পারে এবং এটি ৯৫ শতাংশ সম্ভাবনা দেয় যে ২০২৩-২৪ শীতের জন্য বিশ্বব্যাপী গড় পৃষ্ঠের তাপমাত্রা একটি নতুন ঐতিহাসিক রেকর্ড স্থাপন করবে।

জার্মান ওয়াচের তথ্য মতে, বাংলাদেশ বিশ্বের সপ্তম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিগত বছরগুলো থেকে বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে; যেমন- ক্রমাগত তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টি, বন্যার প্রকোপ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, সাইক্লোনের মাত্রা ও তীব্রতা বৃদ্ধি, অকাল খরা ইত্যাদি। তবে উপকূলীয় অঞ্চলের একটি প্রধান সমস্যা হলো মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানিতে অতিরিক্ত লবণাক্ততা।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ জলবায়ু ব্যবস্থাপনায় প্রতিবছর প্রায় পাঁচ-ছয় বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ বার্ষিক বাজেট থেকে খরচ করছে। অথচ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল থেকে বছরে মাত্র এক বিলিয়ন ডলারের মতো সহযোগিতা আসছে। সে ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কয়েক গুণ বেশি অর্থের প্রয়োজন, যে পরিমাণ অর্থ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল থেকে পাওয়ার জন্য আমাদের কাজ করে যেতে হবে। শুধু তা-ই নয় বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য যে উন্নয়ন পরিকল্পনা করেছে, তা অর্জন করার জন্য আমাদের সম্মিলিতভাবে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় কাজ করতে হবে।

জলবায়ু বাস্তচ্যুতির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানান এবং ভবিষ্যৎ মানবসংকটের মুখোমুখি হওয়া থেকে তাদের রক্ষায় মানবগতিশীলতার কয়েকটি বিষয়ের ওপর আমাদের নজর দেওয়া দরকার। বেশির ভাগ জলবায়ু স্থানচ্যুতি জাতীয় সীমানার মধ্যে এবং কিছু ভয়ানক পরিস্থিতিতে সীমান্তের ওপারে ঘটে। এ ধরনের পরিস্থিতি যাতে মানবিক সংকটে পরিণত না হয়, সে জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা ও সংহতি প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যাঁরা বাস্তুচ্যুত বা আটকে পড়েছেন, তাঁদের মৌলিক পরিষেবা, সামাজিক সুরক্ষা ও জীবিকার বিকল্পগুলোয় প্রবেশাধিকার থাকা দরকার। তাঁদের আশ্রয়দাতা সম্প্রদায়ের ওপর বিরূপ প্রভাবগুলোও একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পদ্ধতিতে মোকাবিলা করা দরকার।

এটি অনুমান করা হয়েছে যে জলবায়ু পরিবর্তন ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের ২১ কোটি ৬০ লোককে বাস্তুচ্যুত করতে পারে, এর মধ্যে ৪ কোটি এককভাবে দক্ষিণ এশিয়ার। বাংলাদেশে আমাদের জনসংখ্যার ২০ শতাংশ উপকূলীয় অঞ্চলে বাস করে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ, ঘন ঘন বন্যা ও প্রবল ঘূর্ণিঝড় তাঁদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। এ ধরনের স্থানচ্যুতি আমরা যা ভাবি, তার চেয়ে দ্রæতগতিতে ঘটছে।

জলবায়ু– অভিবাসীদের অভিঘাত ও ক্ষতির প্রসঙ্গে নির্দিষ্ট সমাধান খুঁজে বের করার জন্য জলবায়ু ন্যায্যতার আলোকে পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হবে। অভিবাসনকে জলবায়ু অভিযোজন কৌশল হিসেবে দেখার জন্য স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে প্রস্তুত হতে হবে, যেখানে এটি সর্বোত্তম সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে প্রমাণিত হবে। জলবায়ু অভিবাসী, বিশেষ করে নারী, শিশু ও অন্য ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর পুনরুদ্ধারের জন্য বিদ্যমান আন্তর্জাতিক সুরক্ষামান পর্যালোচনা করতে হবে। সংকীর্ণ রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে এটির জন্য একটি গঠনমূলক অবস্থান তৈরিতে মানবগতিশীলতার ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিষয়ে উন্নত গবেষণা ডেটা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে বিনিয়োগ করা উচিত।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে জলবায়ু অর্থায়নের জন্য ‘মুজিব ক্লাইমেট প্রসপারিটি প্ল্যান’ গ্রহণ করা হয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসের লক্ষ্যে উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী সৃজন এবং বনায়নের ব্যাপক কর্মসূচির আওতায় ২০০৯-১০ থেকে ২০২১-২২ সালের মধ্যে ম্যানগ্রোভ বনসহ প্রায় দুই লাখ হেক্টর বনায়ন ব্লক এবং ২৮ হাজার ৪৫৮ কিলোমিটার সরু বাগান সৃজন করা হয়েছে।

শিল্পদূষণ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ২০২১ সাল পর্যন্ত ২ হাজার ২২০টি শিল্প প্রতিষ্ঠানে বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) স্থাপিত হয়েছে এবং প্লাস্টিক বর্জ্য হ্রাসের লক্ষ্যে সারাদেশে একবার ব্যবহৃতব্য প্লাস্টিক দ্রব্যাদি ব্যবহার কমানো এবং এগুলোর প্রাকৃতিক বিকল্প ব্যবহার বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

দেশবাসীকে বাসযোগ্য পরিবেশ উপহার দেয়ার লক্ষ্যে বায়ুদূষণ, পানিদূষণ ও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন কার্যকর কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পাহাড় ও টিলা কর্তন এবং পুকুর ও জলাশয় ভরাট রোধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত আছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ পর্যন্ত ২৫ মিলিয়ন মানুষ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সুবিধা পাচ্ছে। কৃষিতে ডিজেলচালিত পানির পাম্পের বিকল্প হিসেবে সৌর সেচপাম্প স্থাপন উৎসাহিত করা হচ্ছে। রান্নার কাজ থেকে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যে ২০ লাখ উন্নত চুলা সরবরাহ করা হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা, দূষণমুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলা এবং পানিসম্পদ রক্ষায় ইতোমধ্যে সরকার যেসব নীতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, তার বাস্তবায়ন অব্যাহত থাকবে।

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য উৎপাদনশীল ও সামাজিক বনায়ন ২০ শতাংশে উন্নীত; ঢাকা ও অন্যান্য বড় নগরে বায়ুর মান উন্নয়ন; শিল্পবর্জ্যকে শূন্য নির্গমন ও নিক্ষেপণ প্রবর্ধন; আইনসংগতভাবে বিভিন্ন নগরে জলাভূমি সংরক্ষণ, পুনরুদ্ধার ও সুরক্ষা; সমুদ্রউপকূলে ৫০০ মিটার বিস্তৃত স্থায়ী সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা কর্মসূচি বাস্তবায়ন অব্যাহত থাকবে।

পরিবেশের ওপর প্লাস্টিক পণ্যের বিরূপ প্রভাব নিয়ন্ত্রণে প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব ও পচনশীল প্লাস্টিকের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হবে। দেশের মোট জ্বালানিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২০৪১ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ অর্জনে জোরালো প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হবে। ভূ-উপরিস্থ পানির যুক্তিসংগত ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। সুন্দরবন ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বন সংরক্ষণে অগ্রাধিকারসহ দেশের বনসম্পদ রক্ষা, বন সৃজন, বন্য প্রাণী, অতিথি পাখিসহ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।

সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ ও লবণাক্ততা রোধ এবং সুন্দরবন ও অন্যান্য অববাহিকা অঞ্চলে মিঠাপানির অভাব দূর করার ব্যবস্থা বাড়ানো হবে। দশের বিস্তীর্ণ হাওর ও ভাটি অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার জন্য স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। নেপাল ও ভারতের সঙ্গে সপ্তকোষী প্রকল্পে বাংলাদেশের ন্যায্য অংশীদারত্ব অর্জনের চেষ্টা করা হবে।

হীরেন পণ্ডিত : প্রাবন্ধিক ও গবেষক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *