আ. লীগের ইশতেহারে নারীর ক্ষমতায়নকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে


হীরেন পণ্ডিত: দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। এবারের ইশতেহারের স্লোগান- ‘স্মার্ট বাংলাদেশ: উন্নয়ন দৃশ্যমান বাড়বে এবার কর্মসংস্থান’।
এতে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করে ১১টি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়েছে ক্ষমতাসীন দল।

২৭ ডিসেম্বর এ ইশতেহার ঘোষণা করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইশতেহারে ডিজিটাল থেকে স্মার্ট বাংলাদেশে উত্তরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে বিশ্ব প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য প্রযুক্তি সক্ষমতা একান্ত প্রয়োজন। এজন্য ‘স্মার্ট নাগরিক’, ‘স্মার্ট সরকার’, ‘স্মার্ট অর্থনীতি’ ও ‘স্মার্ট সমাজ’-এই চারটি স্তম্ভের সমন্বয়ে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার ঘোষণা দেওয়া। স্মার্ট বাংলাদেশ বাস্তবায়নে প্রতিটি ক্ষেত্রে কাজের কথা উল্লেখ করা হয়। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত স্মার্ট সোনার বাংলা হিসাবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করা হয়েছে।

নারীর ক্ষমতায়ন, জেন্ডার সমতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি নারী উন্নয়নে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। গ্রামীণ নারীদের সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন এবং শ্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ বৃদ্ধি করা হবে। শিল্প-ব্যবসা-বাণিজ্যে নারীদের আরও বেশি অংশগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া অব্যাহত থাকবে। নারী উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী গড়ে তোলার কাজে ‘জয়িতা ফাউন্ডেশন’-এর কার্যকর ভূমিকা সম্প্রসারিত হবে।

আবারও নৌকায় ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে জয়যুক্ত করে আপনাদের সেবা করার সুযোগ দিন। আপনারা আমাদের ভোট দিন, আমরা আপনাদের উন্নয়ন, শান্তি ও সমৃদ্ধি দেব। নির্বাচন সামনে রেখে ঘোষিত ইশতেহারে জনকল্যাণমুখী প্রশাসন গঠন এবং গণতন্ত্রকে আরও সুদৃঢ় করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আওয়ামী লীগ।

বিগত বছরগুলোতে আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নের কথা তুলে ধরে টানা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বিগত ১৫ বছরের সরকার পরিচালনার পথপরিক্রমায় যা কিছু ভুল-ত্রুটি, তার দায়ভার আমার। সাফল্যের কৃতিত্ব আপনাদের। আমাদের ভুল-ত্রুটিগুলো ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আমরা কথা দিচ্ছি, অতীতের ভুল-ভ্রান্তি থেকে শিক্ষা নিয়ে আপনাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করব।

একমাত্র আওয়ামী লীগই পারবে দেশকে নতুন উচ্চতায় নিতে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এ মুহূর্তে বাংলাদেশ এক ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হতে যাচ্ছে দেশ। এ উত্তরণ যেমন একদিকে সম্মানের, অন্যদিকে বিশাল চ্যালেঞ্জেরও। ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারকে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সক্ষমতা থাকতে হবে। একমাত্র আওয়ামী লীগই পারবে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে। শেখ হাসিনা বলেন, মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার আদায়, মাতৃভূমির স্বাধীনতা থেকে শুরু করে এ দেশের যা কিছু মহৎ অর্জন, তা এসেছে আওয়ামী লীগের হাত ধরে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক-বাহক বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের হাত ধরেই ২০৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উচ্চ-মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃার্ট ‘সোনার বাংলা’ প্রতিষ্ঠিত হবে। তিনি বলেন, নাগরিকমুখী, কল্যাণমূলক দক্ষ ও স্মার্ট প্রশাসন গড়ার মাধ্যমে জনগণকে উন্নত সেবা দেওয়া এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আওয়ামী লীগ অঙ্গীকারবদ্ধ। মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের মাধ্যমে দক্ষ, উদ্যোগী, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ও দুর্নীতিমুক্ত দেশপ্রেমিক প্রশাসন গড়ে তোলার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

বাংলাদেশে নারী মুক্তির ইতিহাস দীর্ঘদিনের, স্বাধীনতা যুদ্ধে নারীর সরাসরি অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রশংসনীয়। সুদৃঢ় প্রশাসনিক ও আইনী কাঠামো, সচেতন সুশীল সমাজের কারণে বাংলাদেশের নারী আন্দোলন শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে যা নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় এবং নারী-বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে কার্যকরী ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশ শুরু থেকেই নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য দূরীকরণ সনদে (সিডও) স্বাক্ষর করেছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সারা জীবনই এদেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন। তিনি নির্যাতনের শিকার, নিপীড়িত, শোষিত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করেছেন দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। তাদের বাদ দিয়ে দেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।

স্বাধীনতা অর্জনের পরপরই ১৯৭২ সালে সংবিধানে নারীর সমঅধিকার নিশ্চিত করেন। আইন প্রণয়নের সর্বোচ্চ জাতীয় প্রতিষ্ঠান মহান জাতীয় সংসদে নারীদের পক্ষে কথা বলার জন্য নারী আসন সংরক্ষণ করেন। জাতির পিতার পথ ধরে জাতির জনকের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারীর উন্নয়ন, নারীর কর্মসংস্থান, নারীর ক্ষমতায়ন ও নারীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।

সব ধরনের শিক্ষায় নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করা, বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাসহ উচ্চ শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি নারীর ক্ষমতায়নকে ত্বরান্বিত করা ছিলো অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। জেন্ডার সমতা এবং নারীর ক্ষমতায়নকে অন্যতম প্রধান বিষয় হিসেবে ধরে নেয়া হয়েছিলো স্বাধীনতার পর থেকেই। কারণ হিসেবে বলা হয়েছিলো লিঙ্গ সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে জেন্ডার বৈষম্য অনেকটাই কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে এবং উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়েও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছাত্রী ভর্তি হয়েছে। তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ে জ্ঞান অর্জন লিঙ্গ সমতা তৈরীতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

উন্নয়ন কাঠামো ও পরিকল্পনায় নারীর অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত ন্যায্যতা, সর্বোপরি মানবাধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে আরো বেশি করে ভাবার সময় এসেছে। নারীদের জন্য যে নতুন উন্নয়ন মডেলের বিষয়ে বিশ্বব্যাপি আলোচনা চলছে, সেখানে মূলত মোটা দাগে ৪টি বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করা হয়েছে।

মানসম্মত কাজের পরিবেশ এবং মজুরি। নতুন উন্নয়ন মডেলের বিষয়ে ভাবতে হলে প্রথমেই আমাদের শ্রমিকের ন্যায্য মজুরির বিষয়টি আলোচনায় আনতে হবে, বিশেষ করে নারী শ্রমিকের মজুরির বিষয়টি। মানসম্মত কাজের পরিবেশ ও ন্যায্য মজুরি ব্যতীত দারিদ্র্য বিমোচন কখোনোই সম্ভব নয়।

শান্তি ও ন্যায় বিচার বা নায্যতা। একটি ন্যায্য ও টেকসই উন্নয়নের জন্য শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীল অবস্থা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে নারীর নিরাপত্তা ও অধিকারে প্রশ্নে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে, সুশাসনের শূন্যতা নারী অধিকার নিশ্চয়তার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। জেন্ডার সমতা একটি মৌলিক অধিকার। জেন্ডার সমতা তৈরী একটি দেশের উন্নয়নের জন্য বাস্তব এবং কার্যকরী পদক্ষেপ। দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার পাশাপাশি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ বিনির্মাণে টেকসই উন্নয়ন খুবই জরুরি।

বিশ্বে এগিয়ে যাচ্ছে নারী; বাদ নেই বাংলাদেশের নারীরাও। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার দেশের নারীসমাজকে এগিয়ে দিয়েছে কয়েক ধাপ। সেইসাথে বেড়েছে ক্ষমতায়নের সুযোগ। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর অর্ধেকই নারী। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশ সরকারও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নারীদের সম্পৃক্ত করতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম প্রকাশিত বৈশ্বিক লিঙ্গ বিভাজন সূচক ২০২০ (গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ ইনডেক্স) অনুযায়ী ১৫৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৫০তম এবং দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে। ডিজিটাল খাতে বর্তমান বিশ্বের অগ্রগতিকে নারী-পুরুষের বৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্যে কাজে লাগানো, যাতে নারীর সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা ও যৌন সহিংসতা মোকাবিলায় প্রযুক্তি হয় গণতান্ত্রিক, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি সহায়ক ও সৃজনশীল।

বর্তমানে সমাজের প্রায় সব খাতেই নারীর অংশগ্রহণ দৃশ্যমান হচ্ছে। শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে মেয়েদের উপস্থিতি এখন শতভাগ। পোশাক শিল্পের কৃতিত্বের সিংহভাগই নারীর। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে। বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশই যেখানে নারী, সেখানে অগ্রগতি দৃশ্যমান হচ্ছে খুব অল্পসংখ্যক নারীর মধ্যেই। নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়ন ছাড়া দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।

২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জন করতে হলে অবশ্যই এর ৫ এবং ১০ অভীষ্ট অর্জনে সাফল্য দেখাতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল একটি বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণ। বাংলাদেশের সংবিধানেও এর প্রতিফলন আছে। জেন্ডার বাজেটের যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে নারীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়ন, প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে জেন্ডার সমতা, শিশু ও মাতমৃত্যু হ্রাস, স্বাস্থ্য ও টিকাদানের ক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন হয়েছে। নারীর আর্থসামাজিক অগ্রগতির মাধ্যমে নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন দৃশ্যমান হয়। এজন্য দরকার নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা ও সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা এবং আর্থিক বরাদ্দ নিশ্চিত করা।

বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে প্রযুক্তির উন্নয়ন ও ব্যবহার বিশ্ববাসীকে পরস্পরের কাছাকাছি এনে দিয়েছে। ফলে পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধির পাশাপাশি অর্থনৈতিক অগ্রগতিও সাধিত হয়েছে। তবে সব শ্রেণীর মানুষের যেহেতু প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার সমান নয়, তাই এ অগ্রগতির সুফল সব মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছেনি। বিদ্যমান প্রযুক্তি নারীবান্ধব কতটুকু সে প্রশ্ন সামনে আসছে। সেখানে প্রবেশাধিকার ও সুফল ভোগ করার ক্ষেত্রে নারীরা ব্যাপকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। প্রায় ৫৫ ভাগ নারী এখনো প্রযুক্তির বাইরে রয়েছে।

প্রযুক্তি মানবসমাজকে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করেছে। এমনকি নারী সমাজের যে অংশের প্রযুক্তিতে প্রবেশাকিারের সুযোগ ছিলো, তারাও এ সুবিধা পেয়েছে। প্রযুক্তি ব্যবহারে তারা সমান দক্ষতা দেখিয়েছে। বেকারত্ব, দারিদ্র্য থেকে মুক্ত হতে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তাসহ বিভিন্ন কর্মসংস্থান বেছে নিয়েছে। প্রযুক্তির সহায়তায় শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে গেছে, প্রশিক্ষণ কর্মসূচিসহ সরকারের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করতে পেরেছে। তাই প্রযুক্তিতে নারীর প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে হবে।

বিংশ শতাব্দীতে জেন্ডার সমতাভিত্তিক যে সমাজ গঠনের ডাক দিয়েছিলেন বেগম রোকেয়া, সে সমাজ গঠনের পথে আজ ৫২ বছর পেরিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। সবদিক বিবেচনা করে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে বিশ্বে নারীর ক্ষমতায়নে আজ বাংলাদেশ রোল মডেল। নারী ক্ষমতায়ন মূল্যায়নে যেসব অনুঘটক বা সূচক ব্যবহার করা হয় তার সবকটি সূচকে আজ বাংলাদেশ বিশ্বে এগিয়ে। দেশের প্রধানমন্ত্রী নারী, জাতীয় সংসদের স্পিকার নারী, বিরোধীদলীয় নেত্রী নারী।

নারী সমাজের উন্নয়নের জন্য এর চেয়ে বড় ইতিবাচক শর্ত আর কী হতে পারে? বাংলাদেশের সংবিধানসহ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতিমালায় নারীর রাজনৈতিক-সামাজিক ক্ষমতায়ন ও অংশগ্রহণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি-২০১১ প্রণয়ন করেন। জাতীয় সংসদের স্পিকার পদে একজন নারীকে নির্বাচিত করেন। শেখ হাসিনাই প্রথম তাঁর মন্ত্রিসভায় প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদে নারীকে দায়িত্ব প্রদান করেন। সংসদ উপনেতাও হন একজন নারী। নাগরিক সমাজের কেউ কেউ বলতেন দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ও বিরোধীদলীয় নেতা নারী হলেই কি নারীর ক্ষমতায়ন হয়ে যাবে! এ কথাও সত্য, এতসব গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীর পদায়নের ফলে নারীদের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে, যার ফলশ্রুতিতে নারীর ক্ষমতায়ন দীর্ঘস্থায়ী ও সুদূরপ্রসারী হয়েছে।

উপজেলা পরিষদে মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদ সৃষ্টি ও ইউনিয়ন পরিষদে তিনজন নারী সদস্য নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নির্বাচিত হওয়ার বিধান নিশ্চিত করা হয়েছে। বাংলাদেশের নারীরা এখন শুধু বিচারক, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার নন, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছেন দক্ষতার সঙ্গে। শিক্ষা, চিকিৎসা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং কূটনৈতিক দক্ষতা, খেলাধুলা, পর্বতারোহণ, নাসায় কর্মরতসহ সব চ্যালেঞ্জিং পেশায় সাফল্যের চিহ্ন রাখছে।

বাংলাদেশে এখন অনেক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়সহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সচিব বা সমমর্যাদার পদে নারী কর্মকর্তা কর্মরত আছেন, যা ইতোপূর্বে ছিল না। শেখ হাসিনা সরকারই উচ্চ আদালতের বিচারপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী উপাচার্য, প্রথম নারী সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল পদে পদায়িত করেছেন।

নারী আন্দোলনের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় নারী সমাজের যথেষ্ট অগ্রগতি সাধন হলেও জেন্ডার সমতার বিষয়টি এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এটি শুধু বাংলাদেশেই নয়, পৃথিবীর সর্বত্রই বিরাজমান। দেশ কিংবা সমাজের উন্নয়ন নির্ভর করে জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক অবদান ও অংশগ্রহণের ওপর। অর্থাৎ সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর (নারী) অংশগ্রহণ ছাড়া কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে, কিন্তু তা কাঙ্ক্ষিত মাত্রার অনেক নিচে অবস্থান করছে।

শুধু তা-ই নয়, নারী নির্যাতন ও বঞ্চনাও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা সম্ভব হয়নি। দেশের নারী সমাজ এখনো নানা ধরনের পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নির্যাতন-বঞ্চনার শিকার। জাতীয় রাজনীতিসহ সর্বক্ষেত্রে নারীর ৩৩ শতাংশ অংশগ্রহণ এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। স্থানীয় সরকার পর্যায়ে নারীর ক্ষমতায়ন ফলপ্রসূ হচ্ছে না।

নারী উন্নয়নের অন্যতম সূচক হচ্ছে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ। বর্তমানে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণের হার ৩৮ শতাংশ। বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলো তৈরি পোশাক খাত। এ খাতের শ্রমিকদের ৭০ শতাংশের বেশি নারী। আবার দেশের বৃহত্তম সেবা খাত হলো স্বাস্থ্যসেবা। এ খাতেও কর্মরতদের মধ্যে ৭০ শতাংশেরও বেশি নারী। দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) নারীর অবদান প্রায় ২০ শতাংশ।

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৯(৩) অনুচ্ছেদে জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে নারীদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা রাষ্ট্র কর্তৃক নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। নারীদের যথার্থ মর্যাদা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি অর্থনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে সরকার নারী শিক্ষার বিস্তার, অধিকার প্রতিষ্ঠা, ক্ষমতায়নসহ নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে ব্যাপক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে।

নারীর ক্ষমতায়ন বিশ্বব্যাপী উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে উন্নত বিশ্বের উন্নয়নের চিত্র পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, নারীর ক্ষমতায়নের দিক দিয়ে আজকের উন্নত দেশগুলোও যে খুব সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে তা নয়; বরং বিভিন্ন দেশের নারীরা বিভিন্ন বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এখানে অবশ্য বৈষম্যকে অনেকভাবেই দেখা যায়, তবে প্রধানত যে বৈষম্যগুলোকে উন্নয়নের পথে প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচনা করা হয় তা হলো স্বাস্থ্য ও বেঁচে থাকা, শিক্ষায় অংশগ্রহণ, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং রাজনীতিতে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সবাই বলছে বাংলাদেশ নারী উন্নয়নের রোল মডেল এবং জেন্ডার সমতা অর্জনে ইতিবাচকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।

নারীর ক্ষমতায়ন, জেন্ডার সমতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নারী উন্নয়নে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। গ্রামীণ নারীদের সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন এবং শ্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ বৃদ্ধি করা হবে। গ্রামীণ নারীদের অন-লাইনে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ট্রেনিং দেওয়া হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকার নারী ও শিশু পাচার রোধে আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করেছে, যা অধিকতর সক্রিয় ও কার্যকর করা হবে। শিল্প-ব্যবসা-বাণিজ্যে নারীদের আরও বেশি অংশগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া অব্যাহত থাকবে। নারী উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী গড়ে তোলার কাজে ‘জয়িতা ফাউন্ডেশন’ এর কার্যকর ভূমিকা সম্প্রসারিত হবে।

হীরেন পণ্ডিত : প্রাবন্ধিক ও রিসার্চ ফেলো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *