স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে শেখ হাসিনা’র অভিযাত্রা

হীরেন পণ্ডিত: শেখ হাসিনা বাংলাদেশের নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পঞ্চমবারের মতো রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব¡ নিয়েছে। ২০২৪ সালের ১১ জানুয়ারি বঙ্গভবনের দরবার হলে মন্ত্রিসভার নতুন সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। নিয়ম অনুযায়ী প্রথমে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন আহমেদ এর কাছে সরকার প্রধান হিসেবে শপথ নেন। শপথ গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান রাষ্ট্রপতি। পরে নিয়ম অনুযায়ী মন্ত্রী পরিষদের সদস্যবৃন্দ শপথ গ্রহণ করেন।

আওয়ামী লীগের ২০০৮ সালের ইশতেহারের শিরোনাম ছিলো ‘দিন বদলের সনদ’, ২০১৪ সালের ‘এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ’, ২০১৮ সালের ইশতেহারের শিরোনাম ছিলো ‘সমৃদ্ধি ও অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’। ২১টি বিশেষ অঙ্গীকারে ছিলো এটিতে।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ : উন্নয়ন দৃশ্যমান, বাড়বে এবার কর্মসংস্থান’ স্লোগানে নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা দিয়েছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের ঘোষিত ইশতেহারে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসা, গণতান্ত্রিক চর্চার প্রসার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, আর্থিক খাতে দক্ষতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবা সুলভ করা, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলাসহ মোট ১১টি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ইশতেহারে আরো বলা হয়েছে, সরকার কৃষির জন্য সহায়তা ও ভর্তুকি তথা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৃষি উপকরণে বিনিয়োগ সহায়তা প্রদান অব্যাহত রাখবে। ব্যবহারযোগ্য কৃষি যন্ত্রপাতি সহজলভ্য ও সহজপ্রাপ্য করা হবে। কৃষি যন্ত্রপাতিতে ভর্তুকি প্রদান অব্যাহত রাখা হবে। বাণিজ্যিক কৃষি, জৈবপ্রযুক্তি, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং রোবোটিকস, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ন্যানো-টেকনোলজিসহ গ্রামীণ অকৃষিজ খাতের উন্নয়ন ও বিশ্বায়ন মোকাবেলায় উপযুক্ত কর্মকৌশল গ্রহণ করা হবে।

কৃষির আধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং কৃষি গবেষণার সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ অব্যাহত থাকবে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ২০২৮ সালের মধ্যে গবাদিপশুর উৎপাদনশীলতা ১ দশমিক ৫ গুণ বৃদ্ধি করা হবে। বাণিজ্যিক দুগ্ধ, পোলট্রি ও মৎস্য খামার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য দূরীকরণে সহজ শর্তে ঋণ, প্রয়োজনীয় ভর্তুকি, প্রযুক্তিগত পরামর্শ ও নীতিগত সহায়তা দেয়ার কথাও বলা হয়েছে।

জনগণের বিবেচনায় ১৫ বছরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে উন্নয়নের ‘রোল মডেল’ হয়েছে, নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণ করোনার কারণে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এলডিসির সুবিধাগুলো বজায় রাখার জন্যই বাংলাদেশ এ অনুরোধ করে। অনেক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, পদ্মা বহুমুখী সেতু, ঢাকা মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালু করা, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, কর্ণফুলী টানেল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, মাতারবাড়ী ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রকল্প, পায়রা বন্দর, পায়রা ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রকল্প, রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প, বাঁশখালী বিদ্যুৎ প্রকল্প।

বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের জনগণের সার্বিক কল্যাণ, উন্নয়ন ও মুক্তির পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ শুরু করেন। তিনি প্রমাণ করেছেন যে বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও উন্নয়নে তাঁর কোনো বিকল্প নেই। শেখ হাসিনার সততা, নিষ্ঠা, যৌক্তিক মানসিকতা, দৃঢ় মনোবল, প্রজ্ঞা ও অসাধারণ নেতৃত্ব বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে এক ভিন্ন উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি এখন বিশ্বখ্যাত নেত্রী হিসেবে পরিচিত।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সব ধরনের শোষণ, বঞ্চনা, অবিচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে সোচ্চার, সুরক্ষামূলক ভূমিকা পালন করে আসছে। আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে জনগণের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির জন্য কাজ করে যাচ্ছে। তাঁর দল ক্ষমতায় থাকলে মানুষের ভাগ্যের উন্নতি হয়। এই দলের প্রতিষ্ঠার পর থেকে ৭৪ বছরের ইতিহাস এই সত্যের সাক্ষ্য বহন করে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সাহসী কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় রয়েছে এবং তিনি জনগণের কল্যাণে নিষ্ঠার সাথে কাজ করে যাচ্ছেন।

শেখ হাসিনার অদম্য শক্তি, সাহস, মনোবল ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বিশ্ব বিস্মিত। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের ২৯তম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হবে এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ২০তম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হবে। এদিকে বাংলাদেশকে ২০২৬ সালে ‘মধ্যম আয়ের দেশ’ ঘোষণা করা হয়েছে এবং ২০৪১ সালে ‘উন্নত দেশ’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। এর বড় প্রমাণ বাংলাদেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে গত কয়েক বছরে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে। বর্তমানে মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৭৯৫ মার্কিন ডলার।

অর্থনৈতিক অগ্রগতির দিক থেকে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের শীর্ষ স্থানীয় দেশগুলোর একটি। পঞ্চমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন শেখ হাসিনা। সকল রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে শেখ হাসিনা বিশ্বনেত্রী। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বিপুল বিজয় এনে দেন ক্যারিশমাটিক এই নেতা। পঞ্চমবারের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে আরেকটি রেকর্ড গড়লেন তিনি। দেশ ও জাতির স্বার্থকে সর্বদা সবার ওপরে রাখা শেখ হাসিনা উল্লেখ করেন, দেশের জনগণের কাছে আমার জবাবদিহিতা, দেশবাসী মেনে নিলেই হলো কেউ কি বলে তাতে আমার কিছু যায় আসে না। অনেক বাধা ছিল, কিন্তু দেশের মানুষ ভোটাধিকার নিয়ে সতর্ক ছিল।

প্রতি পাঁচ বছর অন্তর জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। মানুষ যাতে কোনো ঝামেলা ছাড়াই ভোট দিতে পারে সে পরিবেশ তৈরি করেছি। জনগণ এই নির্বাচন গ্রহণ করবে কি না তা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের সমর্থনে সরকার গঠন করে আমরা উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের যে মর্যাদা পেয়েছে তা বাস্তবায়ন করতে পারব। জনগণের প্রতি আমার এই বিশ্বাস ও আস্থা আছে। ২০০৯ সাল থেকে এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কারণেই দেশের এত উন্নয়ন হয়েছে। আমাদের সামনে আরও কাজ আছে, যা আমরা সম্পূর্ণ করতে চাই। ২০০৮ সালের নির্বাচন নিয়ে কেউ অভিযোগ করতে পারেনি। ওই নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বিএনপি পায় মাত্র ৩০টি এবং আওয়ামী লীগ পায় ২৩৩টি আসন।

১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ হত্যার সময় শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা জার্মানিতে ছিলেন। প্রায় অর্ধশতক নির্বাসনে কাটিয়ে ১৯৮১ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন। তাঁর ৪৩ বছরের রাজনৈতিক যাত্রায়, তিনি ভোটের অধিকারের জন্য লড়াই করে অবিচলিত পথ হেঁটেছেন। ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে, ২৩ জুন সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় শেখ হাসিনার জন্য পঞ্চমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দরজা খুলে দিয়েছে। এটাও হবে দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার রেকর্ড। সব মিলিয়ে নতুন বছরে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন শেখ হাসিনা। তিনি তিনবার বিরোধী দলের নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সব জল্পনা-কল্পনা, শঙ্কা ও শঙ্কার অবসান ঘটিয়ে সারাদেশে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।

কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া দেশের কোথাও বড় ধরনের সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে এবং ভোটারদের নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে মাঠ পর্যায়ে পুলিশ, র‌্যাব, আনসার-ভিডিপি, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ডসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় ৮ লাখ সদস্যকে মোতায়ন করা হয়।

প্রায় দুই শতাধিক দেশি ৭৬ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছেন। এদের মধ্যে ৭৬ জন সাংবাদিক। এ ছাড়া কয়েক হাজার স্থানীয় পর্যবেক্ষক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেন। ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোট দিয়েছেন। ভোটাররাও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। পুরুষের পাশাপাশি নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। নির্বাচন বিরোধী অপপ্রচার ও জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা সত্ত্বেও সারাদেশে ভোটার উপস্থিতি সন্তোষজনক ছিলো।

এটা গণতন্ত্রের বিজয়। নির্বাচন কমিশন এবং প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী সভাপতি শেখ হাসিনা নিরপেক্ষ নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন। এদিকে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আন্তরিকতা ও সহযোগিতার কারণে জাতীয় নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে বলে মন্তব্য করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল। সরকার আন্তরিক এবং সরকারের প্রতিশ্রম্নতি অনুযায়ী আমরা সমর্থন পেয়েছি, তাই দলীয় সরকারের অধীনে সমন্বিত প্রচেষ্টায় অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনে ৪১ দশমিক ৮ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব ষড়যন্ত্র সফলভাবে মোকাবেলা করে তার দল আওয়ামী লীগকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করে পুনরায় ক্ষমতায় আনতে সক্ষম হয়েছেন।

আওয়ামী লীগ আমার গ্রাম আমার শহর, গ্রামে সব নাগরিক সুযোগ-সুবিধা এবং আমার বাড়ি আমার খামারের মাধ্যমে জনগণকে সমর্থন দিতে সক্ষম হয়েছে। শেখ হাসিনা তৃণমূল থেকে আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত নিজেকে তদারকি করেছেন। বিদেশি পর্যবেক্ষকরাও নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি এবং আয়ারল্যান্ডের পর্যবেক্ষক দলের প্রশংসাসূচক এবং ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দিয়েছে।

ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন শেষে এত বেশি ভোটারের উপস্থিতি এবং ভোটকেন্দে্র শান্তিপূর্ণ পরিবেশ দেখে তারা খুবই সন্তুষ্ট এবং বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে খুবই আশাবাদী। রাজধানীর বাইরে ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ ভোটারের উপস্থিতি দেখে তারা বাংলাদেশ সরকারকে অভিনন্দন জানান। যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও আয়ারল্যান্ডের পর্যবেক্ষক দলও বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরা হবে বলে জানিয়েছে। যুক্তরাষ্টে্র ডেমোক্রেটিক পার্টির রাজনীতিবিদ জিম ব্যাটস বলেছেন, ভোটটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক-বাহক বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের হাত ধরেই ২০৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উচ্চ-মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ স্মার্ট সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠিত হবে। যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট সেবা সম্প্রসারণের ফলে গ্রামীণ উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থা গতিপ্রাপ্ত হয়েছে। কৃষি উপকরণ সহজলভ্য ও কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারিত হয়েছে, গ্রামীণ চাহিদা মেটানোর জন্য কৃষি প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এবং কুটির ও ক্ষুদ্র শিল্পের বিকাশ ত্বরান্বিত হচ্ছে। কৃষিজ ও অকৃষিজ উভয় ক্ষেত্রে কর্মকাণ্ড বহুগুণ সম্প্রসারিত হয়েছে।

উন্নত রাস্তাঘাট, যোগাযোগ, সুপেয় পানি, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা ও সুচিকিৎসা, মানসম্পন্ন শিক্ষা, উন্নত পয়ঃনিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি, কমপিউটার ও দ্রুতগতিসম্পন্ন ইন্টারনেট সুবিধা, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামসহ মানসম্পন্ন ভোগ্যপণ্যের বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে প্রতিটি গ্রামকে আধুনিক শহরের সব সুবিধা দেয়ার ব্যবস্থা আরও উন্নত করা হবে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে সাফল্যে ভর করেই দূরদর্শী, প্রজ্ঞাবান ও বিচক্ষণ নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২২ সালের ১২ ডিসেম্বর ডিজিটাল বাংলাদেশ দিবসে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের ঘোষণা দেন। আমরা সবাই জানি যে, বাংলাদেশের ইতিহাসে ডিজিটাল বাংলাদেশ ছিল সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘোষণা। ঠিক একইভাবে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের ঘোষণাও ইতিমধ্যে মানুষের মনে শুধু আলোড়ন সৃষ্টিই করেনি, নব আশার সঞ্চার করেছে। প্রধানমন্ত্রীর আইসিটিবিষয়ক মাননীয় উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের তত্ত্বাবধানে স্মার্ট বাংলাদেশের চারটি স্তম্ভ স্মার্ট সিটিজেন, স্মার্ট অর্থনীতি, স্মার্ট গভর্নমেন্ট এবং স্মার্ট সোসাইটির ওপর ভিত্তি করে সরকার স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই ব্যাপক পরিসরে কাজ করছে।

স্মার্ট বাংলাদেশ কতটা আধুনিক একটি কর্মসূচি, তা এর চার স্তম্ভের লক্ষ্য থেকেই অনুধাবন করা যায়। সম্পূর্ণ পরিকল্পনা স্বল্প, মধ্যর্ম এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমেই সাজানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে জাতিসংঘের সুপারিশ পেয়েছে। ন্যায্য, সত্য ও মানুষের কল্যাণের পক্ষে সোচ্চার দূরদর্শী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১ বিনির্মাণের যে ভিশন ঘোষণা করেছেন, তাতে শক্তি, সাহস, সক্ষমতা ও প্রেরণা জুগিয়েছে ডিজিটাল বাংলাদেশ। নতুন করে আবারও ক্ষমতাসীন হলে ২০৪১-এর আগেই বাংলাদেশ হবে বুদ্ধিদীপ্ত, উদ্ভাবনী ও সমৃদ্ধ উচ্চ অর্থনীতির আধুনিক স্মার্ট বাংলাদেশ।

‘স্মার্ট বাংলাদেশের মূল সারমর্ম হবে- দেশের প্রতিটি নাগরিক প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ হবে, উইথ স্মার্ট ইকোনমি। অর্থাৎ ইকোনমির সমস্ত কার্যক্রম আমরা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে করব। স্মার্ট গভর্নমেন্ট; ইতোমধ্যে আমরা অনেকটা কেও ফেলেছি। সেটাও করে ফেলব। আর আমাদের সমস্ত সমাজটাই হবে স্মার্ট সোসাইটি।

সেই বিবেচনায় ২০২১ থেকে ৪১ প্রেক্ষিত পরিকল্পনাও প্রণয়ন শুরু হয়ে গিয়েছে অর্থাৎ ২১ থেকে ৪১ কীভাবে বাংলাদেশের উন্নয়নটা হবে তার একটা কাঠামো পরিকল্পনা বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই প্রণয়ন করেছে। যা জনগণের জন্য অন্যতম আর্শীবাদ বয়ে আনবে।

অন্যদিকে ২০৪১ সালেই শেষ নয়, ২১০০ সালেও এই বঙ্গীয় ব-দ্বীপ যেন জলবায়ুর অভিঘাত থেকে রক্ষা পায়, দেশ উন্নত হয়, দেশের মানুষ যাতে ‘সুন্দর, সুস্থ এবং স্মার্টলি’ বাঁচতে পারে, সেজন্য ডেল্টা প্ল্যান করে দেওয়ার কথা বলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।

স্মার্ট বাংলাদেশ কী এবং কীভাবে তা অর্জিত হতে পারে সেটি ডিজিটাল বাংলাদেশ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, আগামী ২০৪১ সাল নাগাদ আমাদের দেশ হবে স্মার্ট বাংলাদেশ, ডিজিটাল বাংলাদেশের পর স্মার্ট বাংলাদেশের পরিকল্পনা এই শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সিদ্ধান্ত, কেননা উন্নত বিশ্বের দেশগুলো তো এরই মধ্যে স্মার্ট দেশে রূপান্তরিত হয়েছে, এমনকি অনেক উন্নয়নশীল দেশও স্মার্ট দেশে রূপান্তরের পথে অনেক দূর এগিয়ে গেছে, তাই দেশের উন্নতি এবং অগ্রযাত্রা ধরে রাখতে হলে দেশকে উন্নত বিশ্বের কাতারে নিয়ে যেতে হবে। আগামীতে যেসব দেশ প্রযুক্তি ব্যবহারে এগিয়ে থাকবে তারাই ব্যবসা-বাণিজ্য, আন্তর্জাতিক লেনদেন এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থা তৈরি করতে পারবে।

দেড় যুগ আগে বর্তমান সরকার স্মার্ট বাংলাদেশের মতোই ডিজিটাল বাংলাদেশের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল, যার শতভাগ সফলতা এখন দৃশ্যমান। বিগত করোনা মহামারির বিস্তর ক্ষয়-ক্ষতি বাংলাদেশ অনেক উন্নত দেশের চেয়েও সুন্দরভাবে সামাল দিতে পেরেছে তার অনেক কারণের মধ্যে একটি হচ্ছে দেশের ডিজিটালাইজেশন।

ডিজিটাল বাংলাদেশের একটি বড় সুবিধা হচ্ছে, দেশের সব কিছু উন্নত বিশ্বের মতো প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলা, যাকে এককথায় ডিজিটালাইজেশন বলা হয়ে থাকে, বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তিনির্ভর ডকুমেন্টের গ্রহণযোগ্যতা সবচেয়ে বেশি, একসময় আমাদের দেশের পাসপোর্টের গ্রহণযোগ্যতা অনেক দেশেই কম ছিল, সেই পাসপোর্ট যখন সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর ই-পাসপোর্টে রূপান্তর করা হলো, তখন এর গ্রহণযোগ্যতাও অনেক গুণ বেড়ে গেল।

ডিজিটাল বাংলাদেশের বদৌলতে সরকার দেশের সব নাগরিকের জন্য ন্যাশনাল আইডি (এনআইডি) চালু করেছে, যেহেতু এনআইডি সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর একটি ডকুমেন্ট, তাই এর গ্রহণযোগ্যতা শুধু দেশের অভ্যন্তরেই নয়, দেশের বাইরেও অনেক বেশি, এখানকার সরকারি অফিস থেকে এনআইডির কপি চেয়ে (যে কোনো প্রয়োজনেই চাওয়া হয়) এবং সেই কপি জমা দেওয়ার কারণে অনেক আনুষঙ্গিক কাগজপত্র জমা দিতে হয় না অথচ এরাই আগে আমাদের দেশের কোনো কাগজপত্রই খুব সহজে বিশ্বাস করতে চাইত না, এখানেই দৃশ্যমান হয় ডিজিটাল বাংলাদেশের গুরুত্ব এবং সুবিধা।

২০০৮ সালে যুগ আগে বর্তমান সরকার স্মার্ট বাংলাদেশের মতোই ডিজিটাল বাংলাদেশের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল, যার শতভাগ সফলতা এখন দৃশ্যমান। বিগত করোনা মহামারির বিস্তর ক্ষয়-ক্ষতি বাংলাদেশ অনেক উন্নত দেশের চেয়েও সুন্দরভাবে সামাল দিতে পেরেছে তার অনেক কারণের মধ্যে একটি হচ্ছে দেশের ডিজিটালাইজেশন।

ডিজিটাল বাংলাদেশের একটি বড় সুবিধা হচ্ছে, দেশের সব কিছু উন্নত বিশ্বের মতো প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলা, যাকে এককথায় ডিজিটালাইজেশন বলা হয়ে থাকে, বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তিনির্ভর ডকুমেন্টের গ্রহণযোগ্যতা সবচেয়ে বেশি, একসময় আমাদের দেশের পাসপোর্টের গ্রহণযোগ্যতা অনেক দেশেই কম ছিল, সেই পাসপোর্ট যখন সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর ই-পাসপোর্টে রূপান্তর করা হলো, তখন এর গ্রহণযোগ্যতাও অনেক গুণ বেড়েছে।

আবার বর্তমান যুগে সব কিছু ডিজিটাল পদ্ধতিতে রূপান্তর না করতে পারলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যে কী মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে তার দৃষ্টান্ত আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাত। দেড় যুগ আগে ডিজিটাল বাংলাদেশের সূচনা হলেও দেশের ব্যাংকিং খাত সেভাবে প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠতে পারেনি কিংবা প্রযুক্তি নির্ভর হলেও রয়েছে সমন্বয়হীনতা। বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন ব্যাংক ভিন্ন রকম প্রযুক্তির ব্যবহার করছে ঠিকই, কিন্তু তাতে প্রকৃত ডিজিটাল ব্যাংকিং থেকে আমাদেও দেশের ব্যাংকিং খাত অনেক দূরে।

ডিজিটাল বাংলাদেশের হাত ধরে দেশকে এগিয়ে নিতে হলে বাংলাদেশকে প্রযুক্তি ব্যবহারে অনেক উন্নত হতে হবে এবং সেই উদ্যোগ সফল করতে হলে স্মার্ট বাংলাদেশ এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়োপযোগী এক কর্মপরিকল্পনা। অনেকেই হয়তো বলার চেষ্টা করবেন যে দেশকে প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে নেওয়ার জন্য স্মার্ট বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হবে।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সুফল গ্রহণের মাধ্যমে স্মার্ট বাংলাদেশ করতে হলে প্রয়োজন স্মার্ট সিটিজেন। ভবিষ্যতে যাদের যোগ্যতা ও দক্ষতা থাকবে তারাই ভালো কাজ পাবে। যাদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা থাকবে না, তারা কাজ হারাবে। তবে সবাই কাজের অযোগ্য হয়ে যাবে তা মোটেই নয়। অনেক বেশি কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ফলে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ফলে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বর্তমানের চেয়ে ৫-১০ গুণও বাড়তে পারে। ভবিষ্যতের এই অদম্য অগ্রযাত্রায় সবাইকে সামিল হতে হবে।

উন্নত বিশ্বপ্রযুক্তি আজ যে পর্যায়ে এসেছে আমাদের দেশে তার কাজটা শুরু হয়েছিল আজ থেকে তিন দশক আগে। তারপরও এখন দেশ যে শতভাগ প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে গেছে এমন দাবি করার সময় এখনো আসেনি। সেই বিবেচনায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সঠিক সময়েই স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। এখন প্রয়োজন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই উদ্যোগ সফলভাবে এগিয়ে নেওয়া।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, খেলাধুলাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। নতুন স্মার্ট মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন তারা সবাই দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবেন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে- এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, আর্থিক খাতের অনিয়ম দূর করতে হবে এবং অর্থপাচার রোধ করতে হবে। শেখ হাসিনা এখন বিশ্বের সেরা উদাহরণ এবং বিশ্বনেতারা বৈশ্বিক সংকট মোকাবেলায় তাঁর উদ্যোগের প্রশংসা করছেন।

হীরেন পণ্ডিত, প্রাবন্ধিক ও গবেষক




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *