বৈশ্বিক কূটনীতিতেই সরকারের গুরুত্ব

হীরেন পণ্ডিত: দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নানা কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কে তিক্ততার সৃষ্টি হলেও সরকার গঠনের পর তা বদলে গেছে। নির্বাচনের আগে ও পরে যে ধরনের বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা করা হয়েছিল তা হয়নি। এটা আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য খুবই স্বস্তিদায়ক। একই সঙ্গে বহির্বিশ্বের একটা ইতিবাচক সিগন্যাল যাচ্ছে এর মাধ্যমে। এখন আমাদের চলমান সংকট মোকাবিলায় কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নে মনোযোগী হতে হবে। একই সঙ্গে আর্থিক খাতের সংস্কারে মন দিতে হবে।

নির্বাচন সমাপনের পর এ নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রতিক্রিয়া ছিল প্রত্যাশিত লাইনেই। এ নির্বাচন নিয়ে বেশ আগে থেকেই সোচ্চার ছিল বিশ্বের শক্তিমান সব রাষ্ট্র। ভারত, রাশিয়া, চীন পূর্ণ সমর্থন দিয়ে গেছে সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠানে। পক্ষান্তরে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন চেয়েছে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। নির্বাচনে জয়লাভের জন্য ভারত, রাশিয়া, চীন তাৎক্ষণিকভাবে অভিনন্দন জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারকে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সম্প্রতি ইইউ রাষ্ট্রদূত চার্লস হোয়াইটলির দেখা করেছেন এবং পারস্পরিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর ১১ জানুয়ারি টানা চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। এর পরপরই বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছেন, জানাচ্ছেন। রাষ্ট্রদূত পিটার হাসও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের সঙ্গে দেখা করে দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। এ সময় বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান গতিশীল ও বহুমুখী সম্পর্কের প্রশংসা করেন তিনি।

এদিকে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম সপ্তাহেই বিশ্বব্যাংক, ভারতীয় হাইকমিশনার, এডিবিসহ উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন অর্থমন্ত্রী। সেখানে বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি আবদুল্লায়ে সেক ও অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী উভয়ে দুই পক্ষের সম্পর্ক জোরদারে গুরুত্ব আরোপ করেছেন। বৈঠকে চলমান বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের করণীয় প্রসঙ্গে আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকট ও উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নিতে বিশ্বব্যাংক সব ধরনের সহায়তা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে বলে জানা গেছে। ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক-আইডিবি, জাপান আন্তর্জাতিক কো-অপারেনশন এজেন্সি-জাইকাসহ অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীর সঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয় কাজ করছে। ইউএসএ, ইউকে, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নসহ উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গেও ধারাবাহিক বৈঠক করছে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়।

বাংলাদেশের উন্নয়নে সহায়তা বাড়াবে বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইএমএফ, জাইকাসহ উন্নয়ন সহযোগীরা। বহির্বিশ্বের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের অংশ হিসেবে আগামী মার্চেই শুরু হতে পারে প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফর। জুনের আগে বাংলাদেশ উন্নয়ন ফোরাম (বিডিএফ) সম্মেলনের বিষয়ে ৩২টি উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু হবে। এদিকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের আমন্ত্রণে ৭ ফেব্রুয়ারি ভারত সফরে যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ব্রিফিংয়ে মন্ত্রী এ তথ্য উল্লেখ করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নতুন দায়িত্ব নেওয়ার পর এটাই হতে যাচ্ছে তাঁর প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফর।

জানুয়ারির ৭ তারিখের ভোটের পর বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতায় নমনীয়তা লক্ষ্য করা গেছে। ভোটের পর বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। নতুন সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দেখা করে তাদের অভিনন্দন জানিয়েছেন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস। কূটনীতিকদের অনেকেই বলছেন যে, ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কে বরফ গলছে। আবার কূটনীতিকদের একটি অংশ বলছে যে, বাংলাদেশ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কী হবে তা স্পষ্ট হওয়ার জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে, আরও পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, দক্ষিণ এশিয়া এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশ এখন গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ। দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপনে বাংলাদেশ সেতু হিসেবে কাজ করছে। বৈশ্বিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থান দেশটিকে ভূ-রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের গুরুত্বকে এককাঠি ওপরে তুলে দিয়েছে। সে সঙ্গে দেশটির মানুষের অদম্য কর্মস্পৃহার কারণে বাংলাদেশ করোনাকালীন সময়েও ঈর্ষণীয় অর্থনৈতিক উন্নতি করেছে-যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও দৃষ্টি কেড়েছে। এই অঞ্চলে বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব কৌশলপত্র রয়েছে। যা বাস্তবায়ন এবং এই কৌশলে ওয়াশিংটন তাদের লক্ষ্যে পৌঁছতে চাইলে বাংলাদেশের সহযোগিতা ছাড়া সম্ভব না। যে কারণে ভোটের আগে যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং নির্বাচন ইস্যুতে গুরুত্ব দিয়েছে। ভোটের আগে ওয়াশিংটনের যে তৎপরতা ছিল ভোটের পর সে তৎপরতায় কিছুটা ভাটার টান লক্ষ্য করা গেছে। নিজেদের স্বার্থ বাস্তবায়নেই যুক্তরাষ্ট্র এবার জোয়ারে, আবার ভাটায় নৌকা ভাসাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্বাস করে যে, সামনের দিনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে পারবে। যে সব ইস্যুতে পশ্চিমাদের আপত্তি রয়েছে সে সব বিষয়ে সরকারের অবস্থান নিয়ে তাদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রকে সরকারের পক্ষ থেকে সঠিক তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করা হবে, যাতে কোনো বিভ্রান্তির সৃষ্টি না হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ ইস্যুতে কী অবস্থান নিচ্ছে তা পরিষ্কার হতে অন্তত আরও কয়েক মাস পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের সঙ্গে প্রথমবারের মতো সাক্ষাৎ করতে এসে রাষ্ট্রদূত পিটার হাস গত বুধবার বলেন, দুই পক্ষের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো কীভাবে এগিয়ে নেব তা নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছি। দুই পক্ষের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং রোহিঙ্গা সংকটে একে অন্যকে কীভাবে সহযোগিতা করতে পারি, সেটা নিয়ে আলোচনা করেছি। সামনের দিনগুলোতে আমাদের পারস্পরিক স্বার্থ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমরা আরও কাজ করব। দুই পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক অভিন্ন স্বার্থে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক উইলসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়া ইনস্টিটিউটের পরিচালক মাইকেল কুগেলম্যান সম্প্রতি এক নিবন্ধে বলেন, বাংলাদেশে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রয়েছে, ঠিক তেমনই যুক্তরাষ্ট্রেও বাংলাদেশের স্বার্থ রয়েছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের অন্যতম প্রধান গন্তব্য হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। আবার বাংলাদেশ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে বিনিয়োগ করছে। ভোটের আগে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে সমৃদ্ধ করতে তৎপরতা চালিয়েছে। সে জন্য যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের নির্বাচন, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দেশটির রাজনৈতিক নেতা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কাজ করেছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি সমৃদ্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রের এত তৎপরতার পেছনের কারণ এখনও পরিষ্কার না। ভোটের পর বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র দুটি ইস্যুর ওপর জোর দিতে পারে। একটি হচ্ছে যে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকার কতটা বাধা দিয়েছে। অন্যটি হচ্ছে, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্র কী হাসিল করতে চায় তার ওপর।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলেন ভোটের পর যুক্তরাষ্ট্রের বিবৃতিতে নমনীয়তা লক্ষ্য করা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশ ইস্যুতে কী অবস্থান নেবে তা স্পষ্ট হতে আরও পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র নমনীয় হলে সরকারের উচিত হবে কিছু ছাড় দিয়ে হলেও তাদের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি করা। কেননা পশ্চিমা বিশ্বকে প্রত্যাখ্যান করার সক্ষমতা বাংলাদেশের নেই। বল এখন যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে। যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বিষয়টি পর্যালোচনা করে আবার নতুন করে শুরু করবে। যেখানে সম্পর্কটা থেমেছিল সেখান থেকে রিভিউ করে আবার নতুন করে শুরু করবে।

গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে যাই হোক না কেন, দুই পক্ষকে সম্পর্কের খাতিরে সংবেদনশীল হতে হবে। বাংলাদেশ কখনই চায় না যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হোক। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রও এমনটি চায়। এই অঞ্চলে বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না। কূটনীতিতে দুই পক্ষের সম্পর্ক কখনো এক থাকে না। সম্পর্কে ওঠা-নামা থাকে। আশা করি যে ওয়াশিংটন-ঢাকা সম্পর্ক সামনের দিনে ওপরের দিকেই উঠবে।

যুক্তরাষ্ট্র অংশগ্রহণমূলক, অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন দেখতে চেয়েছিল। তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী নির্বাচন না হলে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কথাও তারা বলে রেখেছিলো। আমাদের নির্বাচন শেষে মাত্রই নতুন সরকার গঠন হলো। যুক্তরাষ্ট্র এখন কী করবে তা জানার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। আরও পর্যবেক্ষণের পর যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিষ্কার হবে। ভোটের পর রাষ্ট্রদূত পিটার হাস নতুন সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সঙ্গে যে দেখা-সাক্ষাৎ করছেন তা কূটনীতিতে স্বাভাবিক কাজ, যা সর্বদা চলবে। এই দেখা-সাক্ষাৎ দিয়ে সহজেই বোঝার কোনো কায়দা নেই যে সম্পর্ক কোনদিকে যাচ্ছে।

অর্থ বিভাগ ও পরিকল্পনা কমিশনের সূত্রগুলো বলছেন, নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে অগ্রাধিকার পাবে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার। এশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার দিকে নজর দেওয়া। মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার ঝালাই করার কাজে হাত দেওয়া। এ ছাড়া দেশে একটা শ্রেণি রয়েছে ভারত, রাশিয়া ও চীন বিরোধী। তাদের কৌশলে হ্যান্ডেল করা হবে। জাতিসংঘের সঙ্গেও সম্পর্কোন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়া হবে। সেখানে বাংলাদেশের যে স্থায়ী মিশন রয়েছে তা পুনর্গঠন করা হবে। জাতিসংঘের স্থায়ী মিশনের কাজের পরিধি ও পলিসি এমনভাবে নেওয়া হবে যাতে সম্পর্কোন্নয়নে তা সহায়ক ভূমিকা রাখে।

বাইডেনের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মেয়াদ শেষ দিকে চলে এসেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যে মতাদর্শের সরকারই ক্ষমতায় আসুক বাংলাদেশ-আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। কারও সঙ্গে বৈরিতা না রেখে সুসম্পর্ক তৈরি করতে হবে বলে জানান তিনি। এ ছাড়া অন্যান্য বৈশ্বিক সংস্থা বা জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা, ডব্লিউএইচও, ডব্লিউটিও, এফএও, ইউএনএইচসিআরসহ সব সংস্থার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে মনোযোগী হতে হবে। তা ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে চীন, ভারত, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ইইউভুক্ত দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্কের বিকল্প নেই।

এদিকে বাংলাদেশ থেকে পোশাক ও বস্ত্র শিল্পের পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শুল্ক বলবৎ রয়েছে। বাংলাদেশের এসব পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করতে ১৬ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। অথচ ভারত ও চীন মাত্র ৫ শতাংশ শুল্ক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এসব পণ্য রপ্তানি করতে পারে।পৃথিবীর মধ্যে শুধু বাংলাদেশ ও কম্বোডিয়ার ওপর তারা এত বেশি শুল্ক আরোপ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এ শুল্ক প্রত্যাহার করলে মার্কিন ক্রেতাদের ১৬ শতাংশ কম দামে পোশাক ও বস্ত্র খাতের পণ্য দেওয়া সম্ভব হতো। কিন্তু এ নিয়ে অতীতে বাংলাদেশ সরকার কোনো লবিস্ট গ্রুপ নিয়োগ করেনি। এ ইস্যু নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। প্রয়োজনে লবিস্টও নিয়োগ করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

ড. হাছান মাহমুদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর প্রথম অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আমি আমার প্রধান ফোকাস হিসেবে অর্থনৈতিক কূটনীতির ওপর জোর দেব। অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে ঢাকা বিশেষ করে আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে সম্প্রসারিত অর্থনৈতিক সম্পর্ক অন্বেষণ করতে আগ্রহী। ক্রমবর্ধমান বিশ্ব মেরুকরণের পটভূমিতে পূর্ব ও পশ্চিম গোলার্ধেও দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। পূর্ব ও পশ্চিমের দেশগুলো ঢাকার সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়েছে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের কারণে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ সব দেশের দূত নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং ঢাকার সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

অনেকের আশঙ্কা ছিল, ২০২৪ সালে একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভিসা এবং বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে, যাতে বাংলাদেশের বর্তমান বিপর্যস্ত অর্থনীতি আরও ব্যাপক সংকটের সম্মুখীন হতে পারে। কিন্তু নির্বাচন-পূর্ববর্তী মাসগুলোয় পশ্চিমা দেশগুলোর কণ্ঠস্বর যে রকম সরব ছিল, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর তা যেন অনেকটাই স্মিমিত হয়ে আসে। নির্বাচন এবং নতুন সরকার গঠনের পর এ দেশগুলোর প্রতিক্রিয়াও অনেকটাই ২০১৪ বা ২০১৮ সালের নির্বাচন-পরবর্তী ভাষ্যের সঙ্গে তুলনীয় বলেই মনে হয়।

নির্বাচন-পূর্ববর্তী সপ্তাহগুলোয় মার্কিন ভাষ্যের তীব্রতা কমে এলেও হোয়াইট হাউসের সংবাদ সম্মেলনে বরাবরই বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গে মার্কিন নীতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। নির্বাচন-পরবর্তী বিবৃতিতেও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জনগণ এবং তাদের গণতন্ত্র, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি তাদের আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন করে।

আগামী মাসগুলোয় বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র কী পদক্ষেপ নেয়, বা আদৌ কোনো পদক্ষেপ নেয় কি না, তার ওপর সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে অব্যাহত প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রসহ, পূর্ব এবং পশ্চিমের সবার সাথেই সুসম্পর্ক বজায় রাখাই হবে বাংলাদেশের জন্য কল্যাণের।

গ্লোবাল গেটওয়ে সুবিধার আওতায় পরিবেশ, সুশাসন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং পরিবহণসহ বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশ বিদ্যমান যে সুবিধা পাচ্ছে তা আগামী দিনে আরও জোরদার হবে। সম্প্রতি বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত গ্লোবাল গেটওয়ে ফোরাম সম্মেলনে ইইউ বাংলাদেশকে ৪০৭ মিলিয়ন ইউরো দিয়েছে। ইইউ রাষ্ট্রদূত অস্ত্র ছাড়া সবকিছু (ইবিএ) সুবিধার আওতায় বাংলাদেশকে দেওয়া সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বাংলাদেশকে জিএসপি প্লাস সুবিধা দেওয়ারও অঙ্গীকার করেন। ইইউ রাষ্ট্রদূত প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে শেখ হাসিনা সরকারের গৃহীত উদ্যোগেরও ভূয়সী প্রশংসা করেন।

বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী গত ৫০ বছরে বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্কের বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি গ্লোবাল গেটওয়ে কর্মসূচির আওতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে আরও সহযোগিতা কামনা করেন।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *