মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্মার্ট বাংলাদেশ

হীরেন পণ্ডিত: মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির কাছে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ঘটনা এবং যত দিন বাঙালি জাতি থাকবে তত দিন এই মুক্তিযুদ্ধই থাকবে শ্রেষ্ঠ গৌরবের অধ্যায় হিসেবে, অবিস্মরণীয় এক গৌরবগাথা হিসেবে। কারণ বাঙালি জাতির জন্ম থেকেই কোনো না কোনো শাসক দ্বারা শোষিত হয়েছে, অনেক কিছু বিসর্জন দিতে হয়েছে। কখনো মোঘল-পাঠান, কখনো ব্রিটিশ, কখনো পাকিস্তানিদের দ্বারা জাঁতাকলে পিষ্ট হতে হয়েছে। বাঙালির ইতিহাস মানেই শোষণ আর অধিকার থেকে বঞ্চনার ইতিহাস। বাঙালির ইতিহাস মানে না পাওয়া আর বেদনার ইতিহাস। আজকের নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করার জন্য দরকার মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তাদের সামনে উপস্থাপন করা।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে লিখিত বই, মুক্তিযুদ্ধের ওপর নির্মিত বিভিন্ন ছবি, নাটক এগুলো আরো বেশি বেশি করে প্রচার করা দরকার, আজকের প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা দরকার যে মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি জাতিকে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধারা যে জীবনকে তুচ্ছ করে, নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে দেশমাতা ও মাতৃভূমিকে মুক্ত করে, স্বাধীন বাংলাদেশের বিজয়ের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছিল, তা নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে। নতুন প্রজন্মকে এগুলো নিয়ে ভাবতে হবে। কারা সেই চেতনা ধারণ করছে তা জানতে হবে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অর্জনকে তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় একটি জাতিকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করার জন্য যত ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া দরকার সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছিল পাকিস্তানিরা। ফলে তারা শ্রমজীবী, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকসহ এ দেশের সূর্য-সন্তানদের হত্যা করেছিল। বাঙালি জাতি কীভাবে তাদের পরাজিত করেছিল, তার যথাযথ ইতিহাস নতুন প্রজন্ম বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার দায়িত্ব ও কর্তব্য সবারই। কিন্তু আমরা সেটি কতটুকু করছি সেই প্রশ্ন আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তবে নতুন প্রজন্মের চোখণ্ডকান খোলা আছে।

বাংলার স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করেছেন বাঙালির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, ইতিহাসের মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসের গৌরবজনক ঘটনা বা অধ্যায় হচ্ছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। ৩০ লাখ শহীদের বুকের তাজা রক্ত, লাখ লাখ মা- বোনের সম্ভ্রমহানি এবং সীমাহীন আত্মত্যাগের বিনিময়ে একাত্তরের ৯ মাস যুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। ২৩ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম এবং ৯ মাস সশস্ত্রযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করেই বিজয় ছিনিয়ে আনা হয়েছে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে।

মুক্তিযুদ্ধ হলো বাঙালি জাতির শোষণের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হওয়ার যুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হলো আমাদের বাঙালি জাতির আজন্ম লালিত স্বপ্ন, একটি জাতির চেতনার স্বপ্ন। এই স্বপ্ন দোলা দিয়েছে আমাদের মনে, আমাদের স্বপ্নকে অনুপ্রাণিত করেছে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির লালন, শোষণমুক্ত সমাজ বিনির্মাণ এবং একটি উন্নতসমৃদ্ধ আধুনিক, প্রগতিশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা বিনির্মাণের লক্ষ্যে নিরন্তর কাজ করে চলেছেন। বাংলাদেশ জন্মের ৫২ বছর অতিক্রম করছে। বাংলাদেশ নানা দিক থেকেই এগিয়ে যাচ্ছে। আর এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, অগগ্রতির মধ্য দিয়েই একটি দেশ সমৃদ্ধ হয়। যদি বিশ্বের অন্যান্য দেশ বাংলাদেশের অগ্রগতির স্বীকৃতি দেয় এবং প্রশংসা করে, তবে তা অত্যন্ত ইতিবাচক এবং অনুপ্রেরণার।

স্বাধীনতাণ্ডপরবর্তী সময়ে একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দরিদ্র দেশ থেকে দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ হওয়ার পথে বাংলাদেশের গত পাঁচ দশকের যাত্রা ছিল অভাবনীয়। বাংলাদেশ নানা দিক থেকেই এগিয়ে যাচ্ছে, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই আলোচনায় এসেছে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ছিল ৯ বিলিয়ন ডলার। গত ৫ দশকে তা বেড়ে ৪৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। গড় আয়ু ৪৭ বছর থেকে বেড়ে হয়েছে ৭৩ বছর। শিক্ষার হারও ৭৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। আর এসব অর্জনকে অভাবনীয় বলা যায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে খাদ্য উৎপাদন, দুর্যোগ সহনশীলতা, দারিদ্র্য ৪০ ভাগ থেকে ১৮-তে নামিয়ে নিয়ে আসা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা খাতের উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন খাতে নজরকাড়া অগ্রগতি অর্জন করেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার কাজটি সহজ ছিল না। নানা ধরনের ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে দেশের অগ্রগতি অব্যাহত আছে। ফলে যে বিষয়গুলো সামনে আসছে তা প্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করে সংশ্লিষ্টদের কর্তব্য হওয়া দরকার আরো বেশি পদক্ষেপ গ্রহণ ও দেশের সামগ্রিক সমৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে উদ্যোগী হওয়া। আমলে নেওয়া দরকার, একটি উদারনৈতিক দেশ হিসেবে উগ্রবাদ মোকাবিলায় বাংলাদেশের অর্জন প্রশংসনীয়। জনগণ বরাবরই স্বৈরাচারী শাসন না মেনে গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের প্রতি সমর্থন বজায় রাখতে চেয়েছে। অন্যদিকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা এবং জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বাংলাদেশ সবার সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করছে।

অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া, মিয়ানমারে গণহত্যার মুখে থাকা ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ নেতৃত্বের আসনে থাকা করোনা মহামারি মোকাবিলায় যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। ফলে সামগ্রিক পরিস্থিতি আমলে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে এবং আরো সুদূরপ্রসারী উন্নয়ন নিয়ে ২০৩০ সালে এসডিজি অর্জন ও ২০৪১ সালে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে হবে।

শেখ হাসিনা সব সময়ই প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে সেসব সম্ভাবনাকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। সময়ে সময়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর, মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে, ফলে সম্ভাবনার নতুন নতুন খাত গড়ে উঠছে। সম্ভাবনাময় নতুন খাতগুলো সমৃদ্ধি অর্জনে অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা পালন করছে বাংলাদেশের গল্প এবং সম্ভাবনা চিত্তাকর্ষক। দেশ খাদ্য উৎপাদনে পর্যাপ্ততা অর্জন করেছে এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ নারীদের ক্ষমতায়ন করেছে এবং শিশুমৃত্যু কমিয়েছে। বাংলাদেশের গল্পটি হলো কীভাবে দেশটি সব সম্ভাবনাকে পরাজিত করেছে এবং শক্তিশালী পদ্মা নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের জন্য বিলিয়ন ডলার নিজস্ব-অর্থায়ন করেছে এবং সেতুটি চালু করেছে গত বছর ২৫ জুন। মেট্রোরেল চালু করেছে ২০২২-এর ডিসেম্বরে বিষয়গুলো অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য। গল্পটি এর মেগা-স্ট্রাকচারের ক্রমবর্ধমান পোর্টফোলিও এবং বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ এবং দ্বিতীয়টির কাজ চলছে। বাংলাদেশের গল্পটি ১ কোটি ২০ লাখ ৫৫ হাজার ৯০০ জন বাংলাদেশি অভিবাসন নিয়ে যারা বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে ভূমিকা রাখছেন।

বাংলাদেশের একটি ক্ল্যাসিক ঋণনির্ভর, ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে একটি সম্মানজনক প্রবৃদ্ধির হার এবং একটি আত্মবিশ্বাসী ভবিষ্যতের মধ্যে বিবর্তন কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়। এই বিবর্তন সম্ভব হয়েছে শেখ হাসিনার দূরদৃষ্টির কারণে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশটিকে বেশির ভাগ সাহায্যনির্ভর দেশ থেকে এমন একটি দেশে নিয়ে যাচ্ছেন নিজেদের সম্পদের ওপর নির্ভর করে। এককভাবে, তিনি বাংলাদেশকে ডিজিটাল যুগে, পারমাণবিক শক্তির যুগে, মহাকাশ প্রযুক্তির যুগে নিয়ে গেছেন। তার স্থির এবং বাস্তববাদী নেতৃত্বে, দেশ সফলভাবে সন্ত্রাসবাদ, চরমপন্থা মোকাবিলা করেছে এবং জলবায়ুর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। বিশ্ব পরিমণ্ডলে বাংলাদেশ একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধিশালী দেশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি তার আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা পালন করে, আন্তর্জাতিক চুক্তি পালন করে এবং সব মানুষের সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। সোনার বাংলা গড়ার জন্য বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়ে এগিয়ে চলছেন, আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি অর্জনের মাধ্যমে ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত স্মার্ট বাংলাদেশে পরিণত হবে।

গত সাড়ে ১৫ বছরে দেশ আর্থসামাজিক উন্নয়নের এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। আওয়ামী লীগ সরকার ধারাবাহিকভাবে সরকার পরিচালনায় আছে বলেই এসব অর্জন সম্ভব হয়েছে। আজকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হতে পেরেছে। অনেক বাধাবিপত্তি পেরিয়ে গত বছর জুন মাসে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন করা হয়েছে। এই সেতু দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলাকে রাজধানী ঢাকা এবং দেশের অন্য অংশের সঙ্গে সড়কপথে সরাসরি যুক্ত করেছে। গত অক্টোবর মাসে উদ্বোধন করা হয়েছে দক্ষিণাঞ্চলের সর্বববৃহৎ পায়রা সেতু। গত এক বছরে দেশের ২৫টি জেলায় ২০০টি সেতু যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। দেশের অনেকগুলো মহাসড়ক চার বা তদূর্ধ্ব লেনে উন্নীত করা হয়েছে। অন্যগুলোর কাজ চলছে। চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল উদ্বোধন করা হয়েছে, ঢাকায় মেট্রোরেল চালু হয়েছে এবং বিমানবন্দর-কুতুবখালী এক্সপ্রেসওয়ের একাংশ চালু হয়েছে।

মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করাই এ সরকারের মূল লক্ষ্য। মানুষের ভোগান্তি হোক, কষ্ট হোক- তা তা কারো কাম্য নয়। বৈশ্বিক কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পেয়েছিল। তা এখন অনেকটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। মূল্যস্ফীতিও হ্রাস পাচ্ছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলসহ কোনো জিনিসের দাম কমার সঙ্গে সঙ্গে সরকার তা সমন্বয় করবে। খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে দেশবাসীর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, আমাদের কৃষি উৎপাদন বাড়াতে হবে। আমাদের মাটি উর্বর। মাটিতে বীজ ফেললেই যেখানে গাছ জন্মে, ফল হয়, সেখানে বাইরে থেকে কৃষিপণ্য আমদানি করতে হবে কেন? আমাদের প্রতিটি ইঞ্চি জমি পতিত না রেখে কাজে লাগাতে হবে। সংকট আসবে। সংকটে ভয় পেলে চলবে না। সবার সহায়তায় আমরা করোনাভাইরাস মহামারি সফলভাবে মোকাবিলা করতে পেরেছে বাংলাদেশ। বর্তমান বৈশ্বিক মন্দাও বাংলাদেশ সফলভাবে মোকাবিলা করবে।

শেখ হাসিনার ১৫ বছরের দেশ পরিচালনায় বাংলাদেশ কী পেল? তবে সবকিছু ছাড়িয়ে এক নতুন উচ্চতায় উঠে এসেছে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এই অর্জনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *