এসডিজি অর্জনে প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা


হীরেন পন্ডিত
এটা মানতেই হবে যে, বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। সঠিক নীতি ও পরিকল্পনার মাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। বাংলাদেশ ২০২৬ সালে এলডিসি স্ট্যাটাস থেকে বেরিয়ে গেলে, বর্তমান শুল্ক এবং কোটামুক্ত সুবিধা শুধু ২০২৯ সাল পর্যন্ত ইইউ বাজারে পাওয়া যাবে। এ কারণে আগামী পাঁচ বছরের প্রস্তুতি বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজিতে) আমরা ভালো করেছি। এমডিজি থেকে এসেছে এসডিজি (টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট)। এসডিজি কোনো একটি দেশের জন্য নয়, এটি মানবসভ্যতার কল্যাণের জন্য। এসডিজি অর্জনের সময়সীমা ২০৩০ সাল পর্যন্ত। এমডিজির মতো সবাই যদি একসঙ্গে কাজ করি, তাহলে ২০৩০ সালের আগেই আমরা লক্ষ্যে পৌঁছে যাব। এসডিজিতে ১৭টি অভীষ্ট ১৬৯টি লক্ষ্য (টার্গেট) ২৩২ সূচক বাংলাদেশ গ্রহণ করেছে। এর প্রায় সব কটিই আমাদের সপ্তম ও অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত আছে। এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য সরকার থেকে ভালো পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। কোন টার্গেট নিয়ে কোন মন্ত্রণালয় কাজ করবে, কাজটি কারা সমন্বয় করবে এবং চূড়ান্তভাবে কাজটি হলো কিনা, এগুলো তদারকি করার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকার প্রতিটি কাজকেই গুরুত্বসহকারে নিয়েছে। এ কাজগুলো অর্জন করতে গেলে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রয়োজন হবে। এটি কোনো একক মন্ত্রণালয় বা ব্যক্তির কাজ নয়, এসডিজির লক্ষ্য অর্জন সবার কাজ। দেশের জনগণকে সম্পৃক্ত করেই এই কাজ করতে হবে।

এসডিজি বাস্তবায়নে যে কটি দেশ কাজ শুরু করেছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ এগিয়ে আছে। এ ক্ষেত্রে সরকার পরিকল্পনা করেছে। অর্থায়ন ও তথ্য-উপাত্ত পাওয়ার কাজ চলছে। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে এসডিজি নিয়ে দেশে কাজ শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলো প্রথমে অগ্রাধিকার দেয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিকের ওপর। পরিবেশের দিকটি সব সময় পেছনে পড়ে যায়। উন্নত বিশ্বের ভোগ কাঠামোর জন্যই কিন্তু পরিবেশ আজ হুমকির মুখে পড়েছে। আমাদের উৎপাদন প্রক্রিয়ার মধ্যে পরিবেশের বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না। বাংলাদেশের নীতিকাঠামোর মধ্যে এ বিষয়গুলো সম্পূর্ণভাবে আসেনি।

স্বাধীনতার ৫০ বছরে পূর্তির শুভক্ষণে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ ঘটেছে বাংলাদেশের। অজস্র বাধা অতিক্রম করে ক্রমশ সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে লাল-সবুজের এই দেশ। বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি আজ স্বমহিমায় উদ্ভাসিত। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে আজকের এই উত্তরণ যেখানে রয়েছে এক বন্ধুর পথ পাড়ি দেওয়ার গল্প। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে সাহসী ও গতিশীল উন্নয়ন কৌশল এর পেছনে কাজ করছে।

\হবৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তায় নতুন হুমকি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন সংকট শুধু এই দু’টি দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ইতোমধ্যেই এর প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে, যার আশঙ্কা করা হয়েছিল যুদ্ধের শুরুতেই। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধপরবর্তী সময়ে নিষেধাজ্ঞা, পাল্টা নিষেধাজ্ঞায় সারা বিশ্বে খাদ্য, সার, বিদু্যৎ, জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের উৎপাদন এবং সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে সবচেয়ে বেশি ধকল সইতে হচ্ছে। প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেশির ভাগ সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও বৈশ্বিক সংহতির ওপর জোর দিতে হবে। ইউক্রেনের যুদ্ধ এবং এ যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট সংকটগুলো আমাদের সমাজ ও অর্থনীতিতে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গভীর সমস্যা তৈরি করেছে। এটি কোভিড সৃষ্ট পরিস্থিতি থেকে উদ্ধারের প্রচেষ্টা এবং টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জনের পথে নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিচ্ছে।

সামষ্টিক-অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাংলাদেশে আমরা সুনির্দিষ্ট আর্থিক ব্যবস্থা অনুসরণ করছি। আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বহু গুণে প্রসারিত করা হয়েছে। কৃষি, ক্ষুদ্র কুটির ও মাঝারি শিল্প এবং অন্য দুর্বল খাতগুলো রক্ষায় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। জ্বালানি খাতে নবায়নযোগ্য অংশ বাড়াতে নেওয়া হয়েছে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা।

ব্যবসায়ীদের ব্যবসার জন্য এলএনজি কিনে নিয়ে সাপস্নাই দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু যে টাকা দিয়ে সরকার কিনছে, যে খরচ পড়ছে তার চেয়ে খুব কম টাকায় সরবরাহ করেছে। কোভিড-১৯ সময়কালে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছিল। কারণ অবৈধ হুন্ডি প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে বেশির ভাগ রেমিট্যান্স ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠানো হয়েছিল এবং রিজার্ভ থেকে ব্যয়ও সেই সময়ে কম হয়েছিল।

ব্যবসায়ীদের নতুন নতুন পণ্য উৎপাদনসহ এর বাজার খুঁজে বের করতে হবে। বর্তমান সরকার ব্যবসাবান্ধব। ব্যবসায়ীরা যেন সুষ্ঠুভাবে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন, সে জন্য সরকার কাজ করে যাচ্ছে। ২০২৩ সালের মধ্যে রপ্তানি আয় ৬০ বিলিয়ন ডলার বাড়ানোই সরকারের লক্ষ্য। বাংলাদেশ থেকে এখন অনেক কৃষি পণ্যই বিদেশে রপ্তানি হয়। আমাদের এখন আরও পণ্য বিদেশে রপ্তানির দিকে জোর দিতে হবে। তবে, এ জন্য এখনো আমাদের অনেক কিছু করা প্রয়োজন। এসব দিকে সরকার নজর দিচ্ছে।

আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে, আমরা কী কী রপ্তানিযোগ্য পণ্য উৎপাদন করতে পারি। এই ব্যবসাবান্ধব সরকার গত কয়েক বছরে বাংলাদেশকে অনেক এগিয়ে নিয়ে গেছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা উপেক্ষা করেও প্রবৃদ্ধি যেমন বেড়েছে, তেমনি ভালো হয়েছে আর্থসামাজিক অবস্থাও। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বেড়েছে মানুষের মাথাপিছু আয়ও, হ্রাস পেয়েছে দারিদ্র্যসীমা। এখন বাংলাদেশ এগিয়ে যাওয়া উন্নয়নশীল দেশগুলোর তালিকায় অন্যতম। এজন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সরকারের ধারাবাহিকতা একটি বিরাট বিষয়। আমাদের দেশর সংস্কৃতি হলো সরকার বদল হলে সরকারের সব কাজ পরিবর্তন করে দেয়া হয়।

বৈশ্বিক সংকটকে কাজে লাগিয়ে নানা ষড়যন্ত্র জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে চলছে সবই এখন দৃশ্যমান। আন্তর্জাতিক সংকট যেন কোনোভাবেই এ দেশে মাথাচাড়া দিয়ে না উঠতে পারে সে লক্ষ্যে বর্তমান মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তির সরকার ইতিবাচক ও গঠনমূলক কর্ম পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে আমরা এর সফলতা দেখতে পাব। এ দেশের আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এগুলো তুলে ধরতে হবে। ২০৪১ সালে আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে সবাইকে এগিয়ে এস কাজ করতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক আশাব্যঞ্জক মাইলফলক ছুঁয়েছে। নানা প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। সরকার বেশ কিছু মেগা প্রকল্প হাতে নিয়ছে। পদ্মা বহুমুখী সেতু উদ্বোধনের পর বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপস্নব ঘটেছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ সব নাগরিককে বিস্তৃত টেলিযোগাযোগ সেবা (সরাসরি ঘরে ঘরে টিভি, রেডিও, টেলিমেডিসিন, শিক্ষা এবং ইন্টারনেট ব্যবহার), রূপপুর পারমাণবিক বিদু্যৎকেন্দ্র, ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প, মাতারবাড়ী প্রকল্প দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে অবদান রাখছে। গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদু্যৎ প্রকল্প, বঙ্গবন্ধু টানেল নির্মাণ প্রকল্প, ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চলও ভূমিকা রাখছে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ৩৯টি হাইটেক পার্ক এবং আইটি গ্রাম নির্মাণ করা হচ্ছে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অনেক কিছুই গৃহীত হয়েছে। গ্রামগুলোকে সব ধরনের নাগরিক সুবিধা দিয়ে সজ্জিত করা হচ্ছে। আজ আমরা এমন একটি দেশে পরিণত হয়েছি যে, মাথা উঁচু করে রাখার সময় এসেছে।

সরকার ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, এমডিজি এবং প্রথম পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ৩,২০,০৭২টি পরিবারকে আশ্রয় দেয়া হয়েছে। মুজিব জন্মশতবর্ষে সরকার বছরের উপহার হিসেবে ৬৬ হাজার ১৮৯টি পরিবারকে একটি করে বাড়ি করে দিয়েছে। জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য প্রায় ১৪,৫০০টি কমিউনিটি ক্লিনিক জনগণের দোরগোড়ায় রয়েছে। সরকার তিন কোটির বেশি শিক্ষার্থীকে বৃত্তি ও উপবৃত্তি, ছয় লাখ মানুষকে বিভিন্ন ভাতা, ৫০ লাখ পরিবারকে ১০ লাখ টাকার চাল, কৃষি খাতে কৃষকদের ভর্তুকি প্রদান করেছে। কোভিড-১৯ মহামারি চলাকালীন সরকার ১,২১,০০০ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে- যা দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ২০ হাজার কোটি টাকা খরচ করে জনগণকে কোভিডের ভ্যাক্সিন দিয়েছে।

এখন বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ধান উৎপাদনকারী দেশ এবং মাছ, মাংস, ডিম ও শাকসবজিতেও স্বয়ংসম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ জলসীমায় মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির হারের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। আজ ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর সুফল শহর থেকে গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পডছে।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের ২৪তম বৃহত্তম অর্থনীতি। দ্বিতীয় পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩১ সালে, বাংলাদেশে এমন কেউ থাকবে না যাকে অত্যন্ত দরিদ্র বলা যাবে।

মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা- এই তিনটি সূচক উন্নয়নশীল দেশগুলোর যোগ্যতা নির্ধারণ করে। এই তিনটি সূচকে বাংলাদেশ প্রায় কাঙ্ক্ষিত যোগ্যতা অর্জন করেছে। কোভিড-১৯ এর মধ্যেও বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এখন ২২৮২৪ ডলার। অর্থনৈতিক ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সারা বিশ্বকে স্তম্ভিত করেছে। যা গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। নারী শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, স্বাস্থ্যসেবা, মা ও শিশুমৃতু্যর ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। নারীরা এখন সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিকসহ সব স্তরে অবদান রাখছে। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় গ্রামাঞ্চলের নারীরাও পিছিয়ে নেই। তারাও এগিয়ে চলেছেন পুরুষ মানুষের সঙ্গে সমানতালে। এতে বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে।

আজকের তরুণরাই আগামীর কর্ণধার। তরুণ প্রজন্মকে মানবসম্পদে পরিণত করতে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল, কলা ও গণিত (স্টিম) শিক্ষা ব্যাপকভাবে চালু করা হচ্ছে। সমসাময়িক বিশ্বে ক্যারিয়ারভিত্তিক শিক্ষা অপরিহার্য। রাষ্ট্রকে অবশ্যই তরুণদের জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, আকাঙ্ক্ষা এবং মতামতের যথাযথ মূল্য দিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী দেশের জন্য ও অর্জনের জন্য চারটি মাইলফলক নির্ধারণ করেছেন। প্রথমটি ২০২১ সালে ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকল্প- যা ইতোমধ্যেই অর্জিত হয়েছে, দ্বিতীয়টি ২০৩০ সালে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জন, তৃতীয়টি ২০৪১ সালে উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলা এবং চতুর্থটি ২১০০ সালের ডেল্টা পস্ন্যান।

সব নাগরিককে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত (এসডিজি-১ দারিদ্র্য অবসান এবং এসডিজি-২, জিরো হাঙ্গার অর্জন) একটি উন্নত বাংলাদেশের জন্য কাজ করতে হবে এবং বঙ্গবন্ধু যে স্বপ্ন দেখেছিলেন সেই মুক্তিযুদ্ধ ও ধর্মনিরপেক্ষতার চেতনাকে সমুন্নত রাখতে হবে। বাংলাদেশের সম্পদ সীমিত, ভূমির তুলনায় জনসংখ্যা বেশি। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশ আজ বিশ্বের কাছে উনয়নের রোল মডেল।

কোভিড-১৯ মহামারির কারণে বিশ্বের বেশির ভাগ অর্থনীতি গত বছরে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখেছে। এর মানে এই দেশগুলোর মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) আগের বছরের তুলনায় কম। এমনকি প্রতিবেশী ভারতের মতো উচ্চ-প্রবৃদ্ধির দেশগুলোতেও জিডিপির আকার প্রায় ৮ শতাংশ কমেছে। বাংলাদেশ এই ধারার অন্যতম ব্যতিক্রম ছিল। অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিন্তু আগের বছরের তুলনায় আকারে সঙ্কুচিত হয়নি। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা সত্ত্বেও বাংলাদেশের অর্থনীতি পিছিয়ে যায়নি।

আগামী অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি আরও বেশি হবে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য সংস্থার পূর্বাভাস ৭.৯ শতাংশ। রপ্তানি ও ভোগে ধারাবাহিকতা থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। অর্থনীতির পুনরুদ্ধার অব্যাহত থাকবে কিনা এবং দারিদ্র্য হ্রাস পাবে তা নির্ভর করবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও ব্যবসায়িদের সাহায্য করে অর্থনীতির ক্ষতি মোকাবেলার ওপর।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বু্যরো (বিবিএস) সম্প্রতি জন্ম, মৃতু্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ ২০২০ সালের ‘ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস’ এ দেখা যায় এ দেশের আয়ু বা গড় আয়ু এখন ৬৩ বছর। ত্রিশ বছর আগে, ১৯৯০ সালে, গড় আয়ু ছিল মাত্র ৫৬ বছর। পাকিস্তানি দুঃশাসনের কারণে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের গড় আয়ু গত ৩০ বছরে ১৫ বছর বেড়েছে। ভারতের গড় আয় বাংলাদেশের তুলনায় কম। ২০২০ সালে এটি ৭০ বছর ছিল। বাংলাদেশে গত বছর পাঁচ বছরের কম বয়সি প্রতি এক হাজার শিশুর মধ্যে ৩১ জন মারা গেছে। ১৯৯০ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৪৪। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ছাত্রছাত্রীদের ভর্তির হারেও অনেক উন্নতি হয়েছে। মাধ্যমিক স্তরের বয়স বিবেচনায় এখন ৬৩ শতাংশ শিশু স্কুলে যায়।

বিশ্বব্যাংকের মতে, ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল ৩২০ মার্কিন ডলার। ২০২০ সালে, এটি ২,১৩৯ ডলারে দাঁড়িয়েছে। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতি বা জিডিপির আকার ছিল মাত্র ৩২ বিলিয়ন ডলার। ২০২০ সালে, জিডিপি ৩২৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত এক দশকে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দ্রম্নত বর্ধনশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বিশ্ব অর্থনীতির গতিশীলতার ওপর তার সর্বশেষ বিশ্ব অর্থনৈতিক আউটলুকে বলেছে যে, বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি এ বছরও ভারতকে ছাড়িয়ে যাবে।

দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বু্যরোর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৩-৭৪ সালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৭২ শতাংশ। সর্বশেষ প্রকাশিত পারিবারিক আয় ও ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, ২০১৬ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ। এর ভিত্তিতে, ২০১৯ সালে আনুমানিক দারিদ্র্যের হার ২০.৫ শতাংশ। গত বছর কোভিড-১৯ মহামারির কারণে দারিদ্র্য পরিস্থিতির অবনতি হয়। সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপ অনুসারে, এর অনেকটাই এখন উদ্ধার করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলেছে, কোভিড-১৯ এর কারণে বাংলাদেশে দারিদ্র্য পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে, কিন্তু উত্তরণে কাজ করছে সরকার।

এটা মানতেই হবে যে বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। সঠিক নীতি ও পরিকল্পনার মাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। বাংলাদেশ ২০২৬ সালে এলডিসি স্ট্যাটাস থেকে বেরিয়ে গেলে, বর্তমান শুল্ক এবং কোটামুক্ত সুবিধা শুধু ২০২৯ সাল পর্যন্ত ইইউ বাজারে পাওয়া যাবে। এ কারণে আগামী পাঁচ বছরের প্রস্তুতি বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থনীতিবিদরা এসডিজি, অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং টেকসই ট্রানজিটের জন্য পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় করে শক্তিশালী ট্রানজিট কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের পরামর্শ দিচ্ছেন। আগামী দিনে অগ্রগতির জন্য স্থানীয় বাজার ও জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, অবকাঠামোর উন্নয়ন, দুর্নীতি হ্রাস, মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে বিশেষ মনোযোগ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। তাই জনগণকেই এই সিদ্ধান্ত নিতে হবে কীভাবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সরকারের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা যায়। কীভাবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *