Togel Online

Situs Bandar

Situs Togel Terpercaya

Togel Online Hadiah 4D 10 Juta

Bandar Togel

তথ্য-প্রযুক্তিতে বাংলাদেশের বৈশ্বিক স্বীকৃতি


হীরেন পণ্ডিত
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দর্শন; অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সমৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলার মানুষের জীবনমান উন্নয়ন। স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পেরিয়ে নানা পরিবর্তন ও ক্রান্তিলগ্নের শেষে বর্তমান বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের দেশ গড়ার প্রত্যয়ে। যার বিনির্মাণ ঘটছে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে। ২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষণা করে, বাংলাদেশ ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ এ পরিণত হবে। এই ইশতেহারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বপ্ন দেখিয়েছেন ‘একটি উন্নত, ডিজিটাল প্রযুক্তিতে দক্ষ জনগোষ্ঠী, উৎপাদন ব্যবস্থার সমৃদ্ধি ও সেবার মান বৃদ্ধি এবং জ্ঞান ভিত্তিক সমাজের’। বাংলাদেশ সাম্প্রতিক ‘জনসংখ্যা জনসমিতি’র বিচারে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট’ এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশে মোট জনসংখ্যার ৬০ ভাগ মানুষ তরুণ। দেশের মোট জনসংখ্যায় নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর চেয়ে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী বেশি।
জনসংখ্যাতাত্তি¡ক দিক থেকে বাংলাদেশ এক বিরল সম্ভাবনাময় সময় পার করছে। এ এক অপার সম্ভাবনা যা কোনো জাতির জীবনে একবার কিংবা কয়েকশত বছরে একবার আসে। আজকের চীন, জাপান, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া- এসব দেশ সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে উন্নত দেশের তালিকায় নাম লিখিয়েছে। ২০০৭ সাল থেকে শুরু হওয়া সেই স্বর্ণালি ক্ষণটি প্রায় ২০৩৮ সাল পর্যন্ত থাকবে। ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার যে স্বপ্ন তা অনেকটাই নির্ভর করছে এই সময়টিকে কাজে লাগানোর জন্য আমাদের পরিকল্পনা আর তার বাস্তবায়নের ওপর। এই সম্ভাবনার নাম ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট বা জনমিতিক লভ্যাংশ। স্বাধীনতার প্রায় ৩৬ বছর পরে ২০০৭ সালে আমরা এমন একটি যুগে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছি যা আমাদের জন্য প্রকৃতির এক আশীর্বাদ হয়ে এসেছে।
ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট বা জনমিতিক লভ্যাংশ হলো একটি দেশের মোট কর্মক্ষম জনসংখ্যার পরিমাণ যদি কর্মক্ষমহীন জনসংখ্যার তুলনায় বেশি হয় তাহলে এই অবস্থাটাকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট বা জনমিতিক লভ্যাংশ বলে। আরো সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে একটি দেশের জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ যদি কর্মক্ষম হয় তাহলে দেশটি ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট পাচ্ছে বলে ধরে নেয়া হয়। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল(ইউএনেফপি)-এর ওয়ার্ল্ড পপুলেশন স্টেট অনুসারে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের কর্মক্ষম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০০৭ সালে আমাদেও মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬১ শতাংশের বয়স এই সীমার মধ্যে ছিল যা বর্তমানে প্রায় ৬৮ শতাংশ। কর্মক্ষম মানুষের এই আধিক্য ২০৩৮ সাল পর্যন্ত বজায় থেকে এর পর কমতে থাকবে।
তাই ২০৩৮ সাল পর্যন্ত সময়কালটিকেই জনমিতিক লভ্যাংশ পাওয়ার সময় হিসেবে ধরে নেয়া হচ্ছে। আমাদের বয়সী কিংবা আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রায় সবাই ছোটবেলায় বাংলাদেশ বিষয়ক রচনায় জনসংখ্যার আধিক্যকে দেশের এক নম্বর সমস্যা হিসেবে লিখেছি অথচ সেই জনসংখ্যাই আজ আমাদের জন্য অপার সম্ভাবনা নিয়ে হাজির হয়েছে। এই এক জাদুমন্ত্রের মতো! ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থাটি সাধারণত ৩০/৩৫ বছর স্থায়ী হয়। কারণ এর পর প্রাকৃতিকভাবেই কর্মক্ষম লোকের সংখ্যা কমতে থাকে। যেমন জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই জনমিতিক লভ্যাংশকে কাজে লাগিয়েই বিশ্বের অন্যতম সেরা অর্থনীতির দেশ হিসেবে নিজেদের তৈরি করতে পেরেছিল।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ইশতেহার এই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট এর যথাযথ ব্যবহারের একটি কার্যকরি পদক্ষেপ। বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনে উৎসাহ এবং তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরি, নতুন কর্মপরিবেশ সৃষ্টি এবং ব্যক্তিগত ও দাপ্তরিক কাজের সহজলভ্যতার জন্য ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ দেশের জনগণের কাছে এখন একটি প্রিয় শব্দযুগল।
এ উদ্দেশ্যে ২২টি লক্ষ্য অর্জনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য: বিকাশমান অর্থনীতি, অংশীদারিত্বমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, নারীর সমঅধিকার, সুশাসন ও দূষণমুক্ত পরিবেশ। বর্তমান সরকারের দীর্ঘ সময়ের কর্মযাত্রায় ডিজিটাল প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে এ লক্ষ্যমাত্রাগুলোর অধিকাংশই সফলভাবে অর্জিত হচ্ছে। সাধারণত যেসব তথ্য বা সেবার জন্য জনগণের যাতায়াত খরচ ও সময় নষ্ট হত, ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় তা অনলাইনেই হয়ে যাচ্ছে। সরকারও এর ফলে বেশি রাজস্ব আয় করছে। শুধুমাত্র সরকারি নয়, বেসরকারি খাতের সেবা ও উৎপাদনেও এসেছে নতুন মাত্রা।
অনলাইন শ্রমবাজার বা ফ্রিল্যান্সিং খাতে বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। মোট অনলাইন শ্রমবাজার বাংলাদেশের অংশ প্রায় ১৬ শতাংশ। গত এক বছরে দেশে ই-কমার্স খাতেও প্রায় এক লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত সভায় এ তথ্য জানানো হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে ইন্টারনেট প্রাপ্তি সহজ হওয়ায় ডিজিটাল অর্থনীতি দ্রæত এগিয়ে যাচ্ছে। গত এক বছরে দেশে ইকমার্স খাতে প্রায় এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। আগামী এক বছরে আরও পাঁচ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। ভারতের পর বর্তমানে অনলাইন কর্মসংস্থানে বাংলাদেশের অবস্থান এবং বিশ্বে দ্বিতীয়। বিশ্ব অনলাইন ওয়ার্কার্সের (ফ্রিল্যান্সার) ১৬ শতাংশ বাংলাদেশের। করোনার কারণে যারা চাকরি হারিয়ে ছিলেন, তাদের অনেকেই উদ্যোক্তা হিসাবে ই-কমার্সে প্রবেশ করেছেন।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রধান হাতিয়ার তথ্যপ্রযুক্তি। এখন যারা বিশ্ব্যব্যাপী সবচেয়ে বেশি পরিবহণ সুবিধা দিচ্ছে, তাদের নিজস্ব কোনো যানবাহন নেই। যারা সবচেয়ে বড় হোটেল নেটওয়ার্ক সুবিধা দিচ্ছে, তাদের নিজস্ব কোনো হোটেল নেই। প্রতিদিন নিত্যনতুন প্ল্যাটফরম তৈরি হচ্ছে। নতুন নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে। একই অবস্থা বাংলাদেশেও। দিনে দিনে অনলাইন লেনদেনও ব্যাপক বেড়েছে। ২০১৬ সালে যেখানে অনলাইন পেমেন্টের পরিমাণ ছিল ১৬৮ কোটি টাকা, তা ২০২০ সালে এক হাজার ৯৭৮ কোটিতে দাঁড়ায়। ২০২১ সালে এটা প্রায় চার হাজার কোটি টাকা পৌঁছেছে। গবেষণার তথ্যে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশের ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ই-ক্যাব) সদস্য আছে এক হাজার ৩০০ জন। এর বাইরেও অসংখ্য উদ্যোক্তা রয়েছে। দেশের বর্তমানে প্রায় চার কোটি মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করছে। এ খাতেও বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। ফেসবুককেন্দ্রিক উদ্যোক্তা ৫০ হাজার, ওয়েবসাইটভিত্তিক উদ্যোক্তার সংখ্যা দুই হাজার। দেশে এখন ক্রিয়েটিভ ও মালটিমিডিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত আছেন ১৯ হাজার ৫৫২ জন।
এ খাতে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যে ডিজিটাল ফ্ল্যাটফরমগুলো তৈরি হচ্ছে, তার জন্য রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক আছে কিনা; এখাতের জন্য ইনটেনসিভ আছে কি না; নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য কোনো রাজস্ব ছাড় আছে কি না; এরা করজালে আসছেন কি না-তা দেখতে হবে। এটাকে এটা সুষ্ঠু প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। ই-কমার্স একটি উদীয়মান খাত। এ খাতে শুধু ভোক্তার স্বার্থই নয়, উদ্যোক্তার সুবিধা নিশ্চিতেও একটি নীতিমালা অপরিহার্য। এ ছাড়া এলডিসি উত্তরণে ডিজিটাল প্ল্যাটফরম ইকোনমি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সেজন্য বিদ্যমান বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সম্মিলিতিভাবে কাজ করতে হবে।’
সিপিডির প্রতিবেদনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের কথাও তুলে ধরা হয়। যেমন-ডিজিটাল অর্থনীতিতে পণ্যের গুণগতমান নিশ্চিত করা। সময়মতো সঠিক পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা। রিটার্ন পলিসি এবং ব্যবস্থাপনা এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাও বড় চ্যালেঞ্জের।
আর উদ্যোক্তাদের জন্য চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে-ডিজিটাল ডিভাইসের অভাব। দেশে গরিব জনসংখ্যার প্রতি এক হাজার জনের মধ্যে চারজনের কম্পিউটার রয়েছে। এ ছাড়া, নীতি সহায়তার অভাব, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধার অভাব, ইন্টারনেটের ধীর গতি, বিনিয়োগ, ইংরেজি ভাষার দক্ষতার অভাব, কারিগরি জ্ঞানের অভাব। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব মোকাবিলা করতে হলে দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে। প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আরও সহজভাবে সেবা দিতে হবে। একই সঙ্গে একটি জাতীয় নীতিমালাও তৈরি করতে হবে। এ খাতকে এগিয়ে নিতে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কর অব্যাহতি দিতে হবে।
বাংলাদেশের প্রযুক্তির অবস্থান
উন্নত প্রযুক্তির প্রভাবে আমাদের চারপাশে প্রায় সবকিছুই দ্রæত পরিবর্তিত হচ্ছে। শিল্প, কৃষি, স্বাস্থ্য, আর্থিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষা খাতে বিগ ডাটা, ক্লাউড কম্পিউটিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মেলবন্ধন ঘটানো হচ্ছে। ফলে এসব খাতে পরিবর্তন ঘটছে অত্যন্ত দ্রæত। শিক্ষিত-অশিক্ষিত, নারী-পুরুষ আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে নিজ, সমাজ ও রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সমৃদ্ধির দিকে। প্রাযুক্তিক উৎকর্ষ ও পরিবর্তনের সঙ্গে যেসব দেশ তাল মিলিয়ে চলছে তারা দ্রæত এগিয়ে যাচ্ছে। চার দশক ধরে প্রযুক্তির প্রবণতা ও উন্নয়ন পর্যবেক্ষণ করে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডবিøউইএফ) প্রতিষ্ঠাতা ক্লাউস শোয়াব বলেন, অগ্রসর প্রযুক্তির আবির্ভাবে বিশ্ব সমাজ উন্নয়নের এক নতুন যুগে প্রবেশ করছে। সর্বব্যাপী মোবাইল সুপার কম্পিউটিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবোটিকস, ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), ভার্চুয়াল রিয়েলিটি, থ্রিডি প্রিন্টার, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং আমাদের চারপাশের প্রায় সবকিছুতেই প্রভাব ফেলছে। রাজনীতি, ব্যবসায় এবং সামাজিক পরিবেশ বিবর্তিত হয়ে সুযোগ এবং বিপদ দুই-ই সৃষ্টি করবে।’
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে অগ্রসর প্রযুক্তি ব্যবহার ও প্রভাবে ভবিষ্যতে বিপুলসংখ্যক অদক্ষ মানুষের চাকরি হারানোর আশঙ্কা করছেন। বিশ্বব্যাংক অবশ্য তেমনটি মনে করে না। তারা মনে করে, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে কিছু অদক্ষ মানুষ চাকরি হারাবে ঠিকই কিন্তু তা শ্রমবাজারে সংকট সৃষ্টি করবে না। পূর্ববর্তী তিনটি শিল্পবিপ্লবের কারণে কোনো ব্যাপক বেকারত্ব দেখা দেয়নি। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবেও তেমনটির আশঙ্কা নেই। অগ্রসর প্রযুক্তির ব্যবহার ও প্রভাব নিয়ে যখন চাকরি হারানার ঝুঁকি এবং অমিত সম্ভাবনা ও সুযোগ সৃষ্টির কথা বলা হচ্ছে তখন বাংলাদেশেও এসব প্রযুক্তির আবির্ভাব ঘটছে। একটি প্রযুক্তিবান্ধব ইকোসিস্টেম গড়ে ওঠার কারণেই তা সম্ভব হচ্ছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এইচএফএস রিসার্চ-এর ‘বাংলাদেশ ইমার্জেস অ্যাজ এ ডিসটিনক্টিভ ডিজিটাল হাব ফর ইমার্জিং টেকনোলজিস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে একটি গতিশীল ইকোসিস্টেম গড়ে উঠেছে। যারা ডিজিটাল পণ্য ও সেবা নিয়ে কাজ করছে এরূপ অন্তত ১০টি প্রতিষ্ঠান অত্যাধুনিক প্রযুক্তির পরীক্ষা নিরীক্ষা করছে। বিকাশ, পাঠাও, সেবাএক্সওয়াইজেড, ডেটা সফট, বিজেআইটির মতো প্রতিষ্ঠানের রোবোটিক প্রসেস অটোমেশন (আরপিএ), বøকচেইন, স্মার্ট অ্যানালাইটিকস, অগমেন্টেড রিয়েলিটি, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি, আইওটির ওপর একাধিক উদ্যোগের পাইলটিং ও পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে। অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের ব্যবসায়ে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য কাস্টমার অভিজ্ঞতা, বিক্রি ও বিপণন, রিয়েল টাইম সিদ্ধান্ত গ্রহণ, উদ্ভাবনী ব্যবসায় এবং বিজনেস মডেল তৈরিতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করছে।
আগামীর প্রযুক্তির প্রবণতা, ব্যবহার ও প্রভাব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা। তারা আগাম প্রস্তুতিও গ্রহণ করছেন। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে বাংলাদেশ। কারণ দ্রæত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন আনছে। ফলে অর্থনৈতিক বিকাশ এবং শিল্পায়ন ঘটছে দ্রæত।
অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ওপর নীতিমালা ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। এ ব্যাপারে ত্বরিত পদক্ষেপ নেয়া হয়। এটুআই প্রোগাম ও বিসিসির এলআইসিটি প্রকল্প বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে আলোচনা করে আইওটি, বøকচেইন, রোবোটিকস স্ট্র্যাটেজির খসড়া প্রণয়ন করা হয়, যা ইতিমধ্যে মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদিতও হয়। এলআইসিটির প্রকল্পের আওতায় ফাস্ট ট্রাক ফিউচার লিডার (এফটিএফএল) কর্মসূচিতে কয়েক বছর আগে থেকেই এআই, আইওটি, বøকচেইন, রোবোটিকসসহ অগ্রসর প্রযুক্তিতে দক্ষ মানুষ তৈরির প্রশিক্ষণ চলছে। বিসিসির সব প্রশিক্ষণের সার্টিফিকেট সংরক্ষণ করা হচ্ছে বøকচেইন প্রযুক্তিতে।
প্রযুক্তি কখনো থেমে থাকার জন্য আসে না। সব সময় এর রূপান্তর ঘটছে। প্রযুক্তির এ অগ্রগতির সঙ্গে আমাদের তাল মিলিয়ে চলতে হবে। আগামী দিনে যে ১০টি অগ্রসর প্রযুক্তি বড় পরিবর্তন ঘটাবে তা চিহ্নিত করে করণীয় নির্ধারণ করেছে সরকার। এই ১০টি প্রযুক্তি হচ্ছে অ্যাডভান্সড ম্যাটেরিয়ালস, ক্লাউড টেকনোলজি, অটোনোমাস ভেহিকলস, সিনথেটিক বায়োলজি, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি, অগমেন্টেড রিয়েলিটি, এআই, রোবট, বøকচেইন, থ্রিডি প্রিন্টিং ও আইওটি।
অগ্রসর প্রযুক্তি কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা। পৃষ্ঠপোষকতা পেলে দেশের তরুণরাই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে সেরা উদ্ভাবনী তৈরি করতে পারে তার উদাহরণ তো রয়েছে। হংকংয়ে আন্তর্জাতিক বøকচেইন অলিম্পিয়াড ২০২০-এ অংশ গ্রহণের দেশে বøকচেইন অলিম্পিয়াড অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দল বাছাইয়ে বøকচেইন অলিম্পিয়াড বাংলাদেশকে সহযোগিতা করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ ও কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা। ২০২০ সালের জুলাইয়ে হংকংয়ে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বøকচেইন অলিম্পিয়াড অ্যাওয়ার্ড ২০২০-এর ছয়টি পুরস্কারের মধ্যে বাংলাদেশ দু’টি পুরস্কার অর্জন করে আর ১২টি দলের ১২টি প্রকল্পই পায় অ্যাওয়ার্ড অব মেরিট। টেক একাডেমি নামে একটি সংস্থার তত্ত¡বাবধানে বাংলাদেশের তরুণদের একটি দল যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ফার্স্ট গেøাবাল নামের একটি সংস্থার আয়োজনে স্কুল পর্যায়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক রোবোটিকস অলিম্পিয়াডে ভার্চুয়ালি অংশ নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়। বাংলাদেশের তরুণদের এই সাফল্য এবং অগ্রসর প্রযুক্তির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ব্যাপারে সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগ আমাদের আশাবাদী করছে।

তথ্যপ্রযুক্তিতে কতটা এগিয়েছে দেশ
বাংলাদেশ ৫২ বছর পূর্ণ করল। বাংলাদেশের জন্মের সঙ্গে যাদের জন্ম হয়েছে, তাদের হয়তো ১০০ বছর পূর্তি দেখার সৌভাগ্য হবে না, তবে যদি কারও জীবনে সেটি হয়ে যায়, তাহলে চমৎকার একটি বিষয় ঘটবে। কিংবা এখন যার জন্ম হলো, সে যখন বাংলাদেশের ১০০ বছর নিয়ে লিখবে, তখন পেছনের ৫২ বছর, আর তার নিজের ৫২ বছর নিয়ে দুই জীবন লিখতে পারবে।

ইতিহাসের পরিক্রমায় আমি আমার দেখা গত ৫২ বছরে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তির পরিবর্তনটুকু লিখে যাচ্ছি। বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে মোট তিনটি ভাগ করে দেখা যেতে পারে। তাহলে ইতিহাসের কাঠগড়ায় আমাদের অবস্থান বুঝতে সহজ হবে।
বাংলাদেশ মূলত তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রবেশ করে নব্বইয়ের দশকে। এর আগে বাংলাদেশে আইবিএম মেইনফ্রেম কম্পিউটার ছিল বিশেষ গবেষণার কাজে ব্যবহারের জন্য। সাধারণ মানুষের কিংবা সরকারের বড় কোনো কাজে সেগুলো ব্যবহৃত হতো না। সারা পৃথিবীতে তখন পার্সোনাল কম্পিউটারের ব্যবহার বাড়তে থাকে। বাংলাদেশেও এর ছোঁয়া লাগতে শুরু করে। আশির দশকে বাংলাদেশে কম্পিউটার কাউন্সিল গঠিত হলেও এর কাজে কিছুটা গতি আসে নব্বইয়ের দশকে এসে।
বাংলাদেশের মানুষ চড়া দামে খুব স্বল্পমাত্রায় অনলাইন ইন্টারনেট পেতে টেলিফোন লাইনের মাধ্যমে ডায়াল করে ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত হওয়া। পাশাপাশি পুরো পৃথিবীতে ডাটা এন্ট্রির বিশাল একটি বাজার তৈরি হলো- যা ভারত নিয়ে নিল। বাংলাদেশ ওই বাজারে প্রবেশ করতে পারল না। এর মূল কারণ ছিল- বাংলাদেশ তখনো ওই বাজার ধরার জন্য প্রস্তুত ছিল না। ভারত আশির দশকেই যেভাবে তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে গুরুত্ব দিয়ে প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছিল, সেটি বাংলাদেশ পারেনি। ফলে বিলিয়ন ডলারের পুরো ব্যবসাটাই চলে যায় ভারতে।
ওই দশকে বাংলাদেশ বিনামূল্য সাবমেরিন ক্যাবলে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল, যা তখনকার সরকার নেয়নি। তারা মনে করেছিল, সাবমেরিন ক্যাবলে যুক্ত হলে সব তথ্য পাচার হয়ে যাবে। আমরা যে এভাবে ভাবতে পেরেছিলাম, সেটি একটি জাতির অনেক কিছু বলে দেয়। তথ্যপ্রযুক্তিতে যে দেশগুলো ভালো করেছে, তাদের মনস্তত্ত¡ ভিন্ন। তার সঙ্গে আমাদের ফারাক অনেক। এতটাই ফারাক যে, আমরা সেটি বুঝতেই পারব না।

এ দশকে বাংলাদেশে ইন্টারনেটের ব্যবহার কিছুটা বেড়েছিল। পুরো বিশ্বেই তখন ইন্টারনেটের ব্যবহার বাড়ছে এবং ইন্টারনেটের উত্থান ওই সময়টাতেই। সিসকোর মতো বিশাল প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছিল শুধু ইন্টারনেটের গ্রোথকে সামনে রেখে। ওই প্রতিষ্ঠানটি তখনই ট্রিলিয়ন ডলারের কোম্পানি হবে বলে প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
এ দশকের সবচে বড় প্রযুক্তি ছিল ভয়েস ওভার আইপি (ভিওআইপি)। পুরো বিশ্ব যখন এ প্রযুক্তিকে বুকে জড়িয়ে নিচ্ছে, তখন বাংলাদেশ এ প্রযুক্তিকে নিষিদ্ধ করে দিল। তারা মনে করল, এর ফলে আন্তর্জাতিক ভয়েস কলের মুনাফা কমে যাবে। এ প্রযুক্তিটিকে আটকে দিল বাংলাদেশ এবং এখনো নিষিদ্ধ হয়ে আছে।

ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলো এ প্রযুক্তিকে কাছে টেনে নিল; তখন এ প্রযুক্তির ব্যবহারে বাংলাদেশ যুক্ত হলো না। দেশের মানুষকেও যুক্ত করল না। ইউরোপের একটি ছোট্ট দেশ এস্টোনিয়ার চারজন প্রোগ্রামার মিলে তৈরি করে ফেলল স্কাইপ। প্রযুক্তিকে উন্মুক্ত রাখলে মানুষ কতটা ক্রিয়েটিভ হতে পারে, মানুষ কতটা জ্ঞানের দিক থেকে এগিয়ে যেতে পারে- এটি একটি বড় উদাহরণ। সেই স্কাইপ আমরা এখনো ব্যবহার করছি। স্কাইপ হলো একটি উদাহরণ মাত্র। কিন্তু স্কাইপের মতো এমন অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়েছিল, যেগুলো পরবর্তী সময়ে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিশাল অবদান রেখেছে। আমরা এখন যেমন হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, ইমো, ম্যাসেঞ্জার, সিগন্যাল ইত্যাদি কমিউনিকেশন প্ল্যাটফর্ম দেখি, তার গোড়াপত্তন হয়েছিল এ দশকে ভিওআইপি প্রযুক্তির মাধ্যমে। একটি প্রযুক্তিকে আটকে দিলে কী হয়, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো এটি।

বিশ্বের অনেক দেশ তার জনসংখ্যাকে তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করে ফেলেছিল, যার সুবিধা তারা এখনো পাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ সেটি পারেনি। তথ্যপ্রযুক্তিকে বাধা এসেেছ বারবার। একটি জাতিকে কীভাবে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রস্তুত করতে হয়, সেটি নীতিনির্ধারকবৃন্দ বুঝতে চাননি। প্রযুক্তি উন্মুক্ত করে রাখলে, বাংলাদেশের জনগণ এখন অনেক বেশি প্রস্তুত থাকত। অনেক বেশি আউটপুট দিতে পারত। বাংলাদেশ সেই ভিশন দেখাতে পারেনি।

গত দশক থেকেই আসলে বাংলাদেশ তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করেছে। সরকার তার অনেক সেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে চেষ্টা করেছে। পাশাপাশি এ খাতটি একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। গত দশকের শুরুতে ইন্টারনেটের ব্যবহার যতটা ছিল, সেটি অনেকাংশে বেড়েছে দশকটির শেষ ভাগে এসে। তবে বাংলাদেশ এ ব্যবহারকারী আগের দশকেই পেতে পারত, যদি সে সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে পারত।

এ দশকে বাংলাদেশের মানুষ প্রাইভেট সেক্টরেও সেবা পেতে শুরু করেছে। ইন্টারনেটভিত্তিক সেবা, ডিজিটাল পেমেন্ট, ই-কমার্সগুলো আসতে শুরু করে- যেগুলো পৃথিবীর অনেক দেশ আরও ২০ বছর আগেই করে ফেলেছে। অর্থাৎ আমরা অন্তত ২০ বছরে পিছিয়ে থাকলাম।

আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা নিজেদের চেষ্টায় ফ্রিল্যান্সিং কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বাংলাদেশে বসে বিশ্বের উন্নত দেশের কাজ করতে শুরু করে। তবে বিদেশ থেকে টাকা আনা নিয়ে হাজারও ঝক্কি পোহাতে হয়েছিল, যেগুলো এখন অনেকটাই ঠিক হয়ে এসেছে। কিন্তু এগুলো আরও ১০ বছর আগেই ঠিক হয়ে যেতে পারত। শুধু নীতিগত কারণে পিছিয়ে যাওয়া। বাংলাদেশ ফ্রিল্যান্সিং ক্ষেত্রে বেশ ভালো একটি জায়গা করে নিয়েছে। এ কাজটিতে বাংলাদেশ আরও ভালো করতে পারত, যদি সে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেটের ভালো গতি পৌঁছে দিতে পারত এবং ডিজিটাল পেমেন্টটাকে সহজতর করতে পারত।
এ দশকেও বাংলাদেশ তার ইন্টারেনেটের গতি ঠিক করতে পারেনি। বাংলাদেশের মানুষ দুই উপায়ে ইন্টারনেট পেয়ে থাকে। একটি হলো ফাইবার অপটিক ব্রডব্যান্ড, আরেকটি হলো মোবাইল ইন্টারনেট। বাংলাদেশে পরিকল্পিত উপায়ে ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠেনি। ঢাকার চেয়ে জেলা শহরগুলোতে ইন্টারনেটের গতি কম এবং মূল্য বেশি। সরকারের ঘোষিত এক দেশ এক রেট এর সফল বাস্তবায়ন। বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাত এখনো ঢাকাকেন্দ্রিক। ঢাকায় কিছু কিছু এলাকা ফাইবারের আওতায় এসেছে। কিন্তু সেগুলো আন্তর্জাতিক মানের নয়।

আর মোবাইল ইন্টারনেটের অবস্থা পয ভয়াবহ খারাপ, সেটি তো আমরা সবাই জানি। ঢাকা শহরের মানুষ কিছুটা গতি পেলেও ঢাকার বাইরের অবস্থা খুবই নাজুক। এটি মূলত হয়েছে মোবাইল অপারেটররা ঢাকার বাইরে তেমন বিনিয়োগ করেনি, যা তাদের লাইসেন্সের আওতায় করার কথা এবং বাংলাদেশ যেহেতু এটি নিশ্চিত করতে পারেনি, তাই দেশ আরও দশ বছরের বেশি সময় পিছিয়ে গেল। ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসে মানুষ যেভাবে লাইভ করতে পারে, বাংলাদেশের মানুষ সেটি জেলা শহরেই পারে না।
তথ্যপ্রযুক্তি খাত প্রাইভেট সেক্টরে প্রসারিত হওয়ার জন্য যেই অবকাঠামোর প্রয়োজন ছিল, তা তৈরি হয়নি। ফলে দেশে বড় কোনো সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। বাংলাদেশ এখনো তথ্যপ্রযুক্তি খাতে হাঁটি হাঁটি পা পা করছে। আমাদের কোটি কোটি মোবাইল গ্রাহক আছে বটে; কিন্তু তারা মূলত ভয়েস কল করার জন্যই এটি ব্যবহার করে থাকে। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত এমন একটি সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়নি, যেখানে বেশ কয়েকজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার আছে। এ সামান্য একটি তথ্যই অনেক কিছু বলে দেয়।
বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের তিনটি চ্যালেঞ্জের মধ্যে প্রথমটি হলো উন্নত মানের ইন্টারনেট সমস্যা, যার সমাধান আরও ২০ বছর আগেই হওয়া দরকার ছিল। দ্বিতীয়টি হলো উন্নত বুদ্ধির মানুষ। তথ্যপ্রযুক্তি হলো এমন একটি খাত, যেখানে বুদ্ধির প্রয়োজন হয়। এর জন্য চাই প্রকৃত বুদ্ধিমান মানুষ। কিন্তু বাংলাদেশ এখন বড় ধরনের ‘ব্রেইন-ড্রেইন’-এর ভেতর পড়ে গেছে। পৃথিবীর বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশ থেকে সরাসরি ভালো লোকগুলোকে নিয়ে যাচ্ছে। ফলে, সেবা তৈরি করার মতো মানুষ এ দেশে থাকছে না। আমরা মূলত কনজ্যুমার হচ্ছি। আমাদের যদি প্রস্তুতকারকের ভূমিকায় আসতে হয়, তাহলে আরও বুদ্ধি লাগবে। আর তৃতীয়টি হলো ইন্টিলেকচুয়াল কপিরাইট প্রটেকশন, যা বাংলাদেশে এখনো বেশ দুর্বল। মেধাস্বত্ব যদি সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা না যায়, তাহলে মেধাবীরা এখানে থাকবে না। আর এ শিল্পে মেধার কোনো বিকল্প নেই।
ডিজিটাল বাংলাদেশকে আরো বেগবান করতে হবে
আমরা জানি, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব হচ্ছে ফিউশন অব ফিজিক্যাল, ডিজিটাল এবং বায়োলজিকাল স্ফেয়ার। এখানে ফিজিক্যাল হচ্ছে হিউম্যান, বায়োলজিকাল হচ্ছে প্রকৃতি এবং ডিজিটাল হচ্ছে টেকনোলজি। এই তিনটিকে আলাদা করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে কী হচ্ছে? সমাজে কী ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে? এর ফলে ইন্টেলেকচুয়ালাইজেশন হচ্ছে, হিউম্যান মেশিন ইন্টারফেস হচ্ছে এবং রিয়েলটি এবং ভার্চুয়ালিটি এক হয়ে যাচ্ছে। এখন যদি আমরা আমাদের চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের জন্য প্রস্তুত করতে হলে ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সি, ফিজিক্যাল ইন্টেলিজেন্সি, সোশ্যাল ইন্টেলিজেন্সি, কনটেস্ট ইন্টেলিজেন্সির মতো বিষয়গুলো তাদের মাথায় প্রবেশ করিয়ে দিতে হবে। তাহলে ভবিষ্যতে আমরা সবাইকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত করতে পারব। তবে ভবিষ্যতে কী কী কাজ তৈরি হবে সেটা অজানা। এই অজানা ভবিষ্যতের জন্য প্রজন্মকে তৈরি করতে আমরা আমাদের কয়েকটা বিষয়ে কাজ পারি। সভ্যতা পরিবর্তনের শক্তিশালী উপাদান হলো তথ্য। সভ্যতার শুরু থেকেই মানুষ তার অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে উদগ্রীব ছিল।
বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কার, বিদ্যুতের ব্যবহার এবং ট্রানজিস্টর আবিষ্কার ব্যাপক শিল্পায়ন সৃষ্টির মাধ্যমে মানব সভ্যতার গতিপথ বদলে দিয়েছিল বলে ওই তিন ঘটনাকে তিনটি শিল্পবিপ্লব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এখন বলা হচ্ছে, ডিজিটাল প্রযুক্তির নিত্যনতুন উদ্ভাবনের পথ ধরে আসছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, যেখানে বহু প্রযুক্তির এক ফিউশনে ভৌতজগৎ, ডিজিটাল-জগৎ আর জীবজগৎ পরস্পরের মধ্যে লীন হয়ে যাচ্ছে।
২০১৫ সালে কম্পিউটার আমদানিতে শুল্ক হ্রাস, হার্ডওয়ার, সফটওয়্যার শিল্প উৎপাদনকারীদের ভর্তুকি, প্রণোদনা প্রদানসহ বিভিন্ন কার্যকরী পদক্ষেণ গ্রহণ করেন। সরকারের বিভিন্ন নীতি সহায়তার ফলে বর্তমানে দেশে হাই-টেক পার্কসহ দেশি-বিদেশি ১৪টি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ তৈরি করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রপ্তানিসহ দেশের মোবাইল ফোন চাহিদার ৭০ শতাংশ পূরণ করছে।
বর্তমানে সারা দেশে ৮ হাজার ২৮০টি ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে ৩০০-এর অধিক ধরনের সরকারি-বেসরকারি সেবা জনগণ পাচ্ছেন। একসময় প্রতি এমবিপিএস ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের দাম ছিল ৭৮ হাজার টাকা। বর্তমানে প্রতি এমবিপিএস ৩০০ টাকার নিচে। দেশের ১৮ হাজার ৫০০ সরকারি অফিস একই নেটওয়ার্কের আওতায়। ৩ হাজার ৮০০ ইউনিয়নে পৌঁছেছে উচ্চগতির (ব্রডব্যান্ড) ইন্টারনেট।
দেশে মোবাইল সংযোগের সংখ্যা ১৮ কোটি ৩৮ লাখ। ইন্টারনেট ব্যবহারকারী প্রায় ১৩ কোটি। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম-এর প্রতিবেদনে যথার্থভাবেই মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে গ্রামীণ এলাকায় আর্থসামাজিক ব্যবধান কমিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার করে আর্থিক সেবায় মানুষের অন্তর্ভুক্তি রীতিমতো বিস্ময়কর। অনলাইন ব্যাংকিং, ইলেকট্রনিক মানি ট্রান্সফার, এটিএম কার্ড ব্যবহার শুধু ক্যাশলেস সোসাইটি গড়াসহ ই-গভর্মেন্ট প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখছে তা নয়, ই-কমার্সেরও ব্যাপক প্রসার ঘটাচ্ছে। বিশ্বের ১৯৪টি দেশের সাইবার নিরাপত্তায় গৃহিত আইনি ব্যবস্থা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, সাংগঠনিক ব্যবস্থা, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পারস্পরিক সহযোগিতার উপর ভিত্তি করে তৈরি করা সূচকে আইটিইউ-তে ৫৩তম স্থানে এবং জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা (এনসিএসআই) সূচকে ৩৭তম স্থানে অবস্থান করছে। দক্ষিণ এশিয়া ও সার্ক দেশের মধ্যে প্রথম।
স্টার্টআপ সংস্কৃতির বিকাশে আইডিয়া প্রকল্প ও স্টার্টআপ বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেডসহ সরকারের নানা উদ্যোগে ভালো সুফল হিচ্ছে। দেশে স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে উঠেছে। ই-গভর্নমেন্ট কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশন করা হয়েছে। ৫২ হাজারেরও বেশি ওয়েবসাইটের জাতীয় তথ্য বাতায়নে যুক্ত রয়েছে।
২০২৫ সাল নাগাদ যখন শতভাগ সরকারি সেবা অনলাইনে পাওয়া যাবে তখন নাগরিকদের সময়, খরচ ও যাতায়াত সাশ্রয় হবে। বর্তমানে আইসিটি খাতে রপ্তানি ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অনলাইন শ্রমশক্তিতে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। প্রায় সাড়ে ৬ লাখ ফ্রিল্যান্সারের আউটসোর্সিং খাত থেকে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হচ্ছে। ৩৯টি হাই-টেক ও আইটি পার্কের মধ্যে এরই মধ্যে নির্মিত ৯টিতে দেশি-বিদেশি ১৬৬টি প্রতিষ্ঠান ব্যাবসায়িক কার্যক্রম শুরু করেছে। এতে বিনিয়োগ ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং কর্মসংস্থান হয়েছে ২১ হাজার, মানবসম্পদ উন্নয়ন হয়েছে ৩২ হাজার। ১০ হাজার ৫০০ নারীকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ২০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
করোনা মহামারিতে সরকারের বিভিন্ন ডিজিটাল উদ্যোগ মানুষকে সহায়তা করেছে। দেশব্যাপী লকডাউনে শিক্ষার্থীদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সহযোগিতায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, মাদ্রাসা ও কারিগরি পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করা হয়।

করোনা মহামারি থেকে দেশের জনগণকে সুরক্ষিত রাখতে তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের উদ্যোগে টিকা কার্যক্রম, টিকার তথ্য সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা এবং সনদ প্রদানের লক্ষ্যে টিকা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ‘সুরক্ষা’ ওয়েবসাইট চালু করা হয় এবং দেশের জনগণ এর সুবিধা পাচ্ছে। ২০২৫ সালে আইসিটি রপ্তানি ৫ বিলিয়ন ডলার ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান ৩০ লাখে উন্নীত করা এবং সরকারি সেবার শতভাগ অনলাইনে পাওয়া নিশ্চিত করা, আরো ৩০০ স্কুল অব ফিউচার ও ১ লাখ ৯ হাজার ওয়াইফাই কানেক্টিভিটি, ভিলেজ ডিজিটাল সেন্টার এবং ২৫ হাজার শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির যে প্রসার ঘটেছে তাকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে ২০৪১ সালের মধ্যেই সরকার বাংলার আধুনিক রূপ জ্ঞানভিত্তিক উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
২০১৮ সালের ১২ মে যুক্তরাষ্ট্রের কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ করা হয়। নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপকারী দেশ হিসেবে বিশ্বের ৫৭তম দেশ হয় বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটে-১ এ ২৬টি কে-ইউ ব্যান্ড এবং ১৪টি সি ব্যান্ড ট্রান্সপন্ডার রয়েছে। দেশের সব অঞ্চল, বঙ্গোপসাগরের জলসীমা, ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া এর কভারেজের আওতায় রয়েছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ ও নাগরিক সেবা
জ্ঞানভিত্তিক ডিজিটাল বাংলাদেশের গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্যোগে ডিজিটাল বাংলাদেশের যাত্রা শুরু। এখন দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে দেশের মানুষ ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফল ভোগ করছেন। ডিজিটাল বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য হলো- সমাজের শ্রেণি, বর্ণ, পেশা ও গ্রাম-শহর নির্বিশেষে সকল মানুষের দোরগোড়ায় সহজে এবং দ্রæততার সাথে সরকারি সেবা পৌঁছে দেয়া। এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার ইউনিয়ন পর্যায় থেকে শুরু করে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত সর্বত্র সমন্বিত ই-সেবা কাঠামো গড়ে তুলেছে। এ লক্ষ্যে এটুআই এর সহযোগিতায় বর্তমানে প্রায় সকল মন্ত্রণালয় ও বিভাগে বৃহৎ পরিসরে ই-সেবা প্রদান করে আসছে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য সামনে রেখে এটুআই এর উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে কিশোর বাতায়ন, ডিজিটাল সেন্টার, জাতীয় তথ্য বাতায়ন, ই-নথি, একশপ, এক পে, জাতীয় হেল্পলাইন-৩৩৩, মুক্তপাঠ, শিক্ষক বাতায়ন, এসডিজি ট্র্যাকার, ই-মিউটেশন, উত্তরাধিকার বাংলা, ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড রুম, মাইগভ অ্যাপ, ডিজিটাল সার্ভিস ডিজাইন ল্যাব ও আই ল্যাব এবং ইনোভেশন ল্যাব ইত্যাদি।
জনগণের তথ্য প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং সরকারি দপ্তর থেকে প্রদেয় সেবাসমূহ প্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিধানের লক্ষ্যে দেশের সকল ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, বিভাগ, অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়সহ ৫২ হাজারেরও অধিক সরকারি দপ্তরে ওয়েবসাইটের একটি সমন্বিত রূপ বা ওয়েব পোর্টাল হলো জাতীয় তথ্য বাতায়ন। এখানে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের এ পর্যন্ত ৬৫৭ টি ই-সেবা এবং ৮৬ লাখ ৪৪ হাজারেরও বেশি বিষয়ভিত্তিক কনটেন্ট যুক্ত করা হয়েছে। এই বাতায়নে প্রতিদিন গড়ে এক লাখেরও বেশি নাগরিক তথ্য সেবা গ্রহণ করছে।

বাংলাদেশের জাতীয় তথ্য বাতায়ন এর জনপ্রিয় সেবা এর মধ্যে রয়েছে-অর্থ ও বাণিজ্য সেবা, অনলাইন আবেদন, শিক্ষা বিষয়ক সেবা, অনলাইন নিবন্ধন, পাসপোর্ট, ভিসা ও ইমিগ্রেশন, নিয়োগ সংক্রান্ত সেবা, পরীক্ষার ফলাফল, কৃষি, ইউটিলিটি বিল, টিকিট বুকিং ও ক্রয়, তথ্য ভান্ডার, ভর্তির আবেদন, আয়কর, যানবাহন সেবা, প্রশিক্ষণ এ স্বাস্থ্য বিষয়ক পোর্টাল কুরিয়ার, ফরমস, ট্রেজারি চালানসহ ডিজিটাল সেন্টার। এখানে রয়েছে ৬শ’ এরও বেশি ই-সেবা, ১ হাজার ৬০০ এরও বেশি বিভিন্ন সরকারি ফরম অর্থাৎ সকল সেবার ফরম এক ঠিকানায়। রয়েছে কিশোর বাতায়ন-কানেক্ট, ইমাম বাতায়ন, মুক্তপাঠ, সকল সেবা এক ঠিকানায় সেবাকুঞ্জ, জাতীয় ই-তথ্যকোষ যে কোনো স্থানে, যে কোনো সময় পাঠ্যপুস্তকের সহজলভ্যতার জন্য তৈরী করা হয়েছে ই-বুক।

জাতীয় তথ্য বাতায়নের মাধ্যমে জনগণ ঘরে বসে অনলাইনে পাসপোর্টের আবেদন করেতে পারেন। করোনা মহামারীর সময় মানুষ তাঁর প্রয়োজনীয় কাজ ঘরে বসেই ঝুঁকিমুক্তভাবে করে ফেলতে পারছেন। যে কোনো পাবলিক পরীক্ষা যেমন: প্রাথমিক সমাপনী, এসএসসি, দাখিল ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল শিক্ষার্থীরা ঘরে বসে মুঠোফোনের মাধ্যমে জানতে পারছে। জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য হালনাগাদ করার জন্য এখন আর নির্বাচন কমিশনের অফিসে ঘোরাঘুরি করতে হয় না। জাতীয় তথ্য বাতায়নের মাধ্যমে সকল তথ্য হালনাগাদ করা যায়। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন এবং নতুন ভোটার নিবন্ধনের মত কাজও এই তথ্য বাতায়ন থেকে করা সম্ভব। দেশব্যাপী কৃষকের দোরগোড়ায় দ্রæত ও সহজলভ্য কার্যকারী ই-কৃষি সেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম “কৃষি বাতায়ন” এর মাধ্যমে কৃষিবিষয়ক যে কোনো পরামর্শ ও সেবা সহজলভ্য করা হয়েছে। বর্তমানে কৃষি বাতায়নে ৮১ লাখ কৃষকের তথ্য মাঠ পর্যায়ে কর্মরত ১৮ হাজার কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা এবং ৬১টি উপজেলার কৃষি বিষয়ক তথ্য এই বাতায়নে সংযুক্ত রয়েছে।

ইমাম বাতায়নের মাধ্যমে দেশের ৩ লাখ ইমাম-মুয়াজ্জিনদের মধ্যে ধর্মীয় সচেতনতা তৈরীর পাশাপাশি তাদের কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইমাম বাতায়নে বর্তমানে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৮৬১ জন সদস্য ও ১৩ হাজার ৭২৪ কন্টেন্ট রয়েছে। কিশোর বাতায়ন কিশোর-কিশোরীদের জন্য নির্মিত একটি শিক্ষামূলক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যেখানে প্রায় ৩৫ লাখের বেশি শিক্ষার্থী যুক্ত হয়েছে এবং ৩১ হাজার ৩৮৩ টিরও বেশি মানসম্মত কনটেন্ট রয়েছে। এর মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জ্ঞানার্জনের সুযোগ পাচ্ছে।

শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের জন্য শিক্ষক বাতায়ন একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। এতে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষার বিভিন্ন বিষয়ে অডিও, ভিডিও, অ্যানিমেশন, চিত্র, ডকুমেন্ট, প্রকাশনা ইত্যাদি কনটেন্ট সংরক্ষিত রয়েছে। এসব কনটেন্ট ব্যবহার করে শিক্ষকগণ মাল্টিমিডিয়ায় ক্লাসরুমে শিক্ষা প্রদান করতে পারেন। শিক্ষক বাতায়নের নিবন্ধিত সদস্য প্রায় ৪ লাখ ৪৯ হাজার জন। দেশে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে উচ্চ ও নিম্ন আদালতসহ বিচার বিভাগের তথ্য নিয়ে চালু আছে বিচার বিভাগীয় তথ্য বাতায়ন। স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনমুখী বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা এবং আদালত ও নাগরিকের মধ্যকার দূরত্ব কমানোর লক্ষ্যে এ উদ্যোগের যাত্রা। বর্তমানে ৬৪টি জেলা আদালত, ৫টি দায়রা আদালত এবং ৮টি ট্রাইব্যুনালে বিচার বিভাগীয় বাতায়ন সক্রিয় রয়েছে।

উত্তরাধিকার ক্যালকুলেটর একটি স্বয়ংক্রিয় ক্যালকুলেটর। এর মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি উত্তরাধিকারদের মধ্যে প্রাপ্যতা হিসাব করা যায়। মৃত ব্যক্তির সম্পদ বন্টন ব্যবস্থার জটিলতা থেকে সহজে মুক্তি পাওয়ার চিন্তা থেকেই উত্তরাধিকার বাতায়ন এবং অ্যাপের যাত্রা। এখন পর্যন্ত ২ লাখের বেশি নাগরিক উত্তরাধিকার ক্যালকুলেটর ব্যবহার করছেন। প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবার আওতার বাইরে ব্যাপক জনগোষ্ঠী ডিজিটাল সেন্টার থেকে অ্যাকাউন্ট খোলা, টাকা পাঠানো, সঞ্চয় করা, ঋণ গ্রহণ, বিদেশ থেকে পাঠানো রেমিট্যান্স উত্তোলন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির টাকা উত্তোলন, বিভিন্ন ধরনের ফি প্রদান ইত্যাদি আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে।

জিটুপি সিস্টেমের মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক একক আইডি ব্যবহার করে ডিজিটাল সেবা প্রদান ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বয়স্ক, স্বামী পরিত্যক্তা, বিধবা ও ল্যাকটেটিং মাদার ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। ই-অফিসে কার্যক্রম অংশ হিসেবে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/সরকারি দপ্তরে কাজের গতিশীলতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি আনয়নে ই-নথি বাস্তবায়ন চালু করা হয়েছে। বর্তমানে ৮ হাজারেরও বেশি অফিসের প্রায় ১ লাখের অধিক কর্মকর্তা এর সাথে যুক্ত রয়েছে। এ পর্যন্ত দেড় কোটির বেশি ফাইল ই-নথি সিস্টেমের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে।
সকল সেবা একটিমাত্র প্ল্যাটফর্ম সংযুক্ত করার লক্ষ্যে একসেবা প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ৮ হাজার ১৫১ টি দপ্তরকে একসেবার সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে এবং ৩৩৪টি সেবা সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে একসেবায় নিবন্ধিত ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৭৪ হাজারের বেশি ।
সরকারি সব সেবা এক প্ল্যাটফর্মে আনার অঙ্গীকার নিয়ে ‘আমার সরকার বা মাই গভ’ প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়েছে। কেউ বিপদে পড়লে অ্যাপটি খুলে মোবাইল ফোন ঝাঁকালে সরাসরি ৯৯৯ নম্বরে চলে যাবে ফোন। একই সঙ্গে ব্যবহারকারীরা ৩৩৩ নম্বরে কল করেও নানা ধরনের তথ্য ও সেবা নিতে পারবেন । প্রয়োজনীয় তথ্যের মাধ্যমে আবেদন, কাগজপত্র দাখিল, আবেদনের ফি পরিশোধ এবং আবেদন-পরবর্তী আপডেটসহ অন্যান্য বিষয় জানা যাবে। আর আবেদনকারীর পরিচয় নিশ্চিত করা হবে জাতীয় পরিচয়পত্রের সাহায্যে। প্ল্যাটফর্মটিতে বর্তমানে ৩৩৪টি সেবা জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ওই প্ল্যাটফর্মটি রেপিড ডিজিটাইজেশনের আওতায় প্রায় ৬৪১টি সেবা ডিজিটাইজেশন করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ বির্নিমাণের ঘোষণা এখন এটি প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা। তথ্য ও প্রযুক্তির ব্যবহারে বাঙ্গালি জাতির অগ্রগতি বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি কেড়েছে। নাগরিক সেবায় মানোন্নয়নে বর্তমানে সরকার গৃহিত সামগ্রিক সেবাদান প্রক্রিয়া গতি এনেছে। সেদিন আর বেশি দূরে নয়, যেদিন বাংলাদেশ সত্যিকারের ডিজিটাল রাষ্ট্র হিসেবে উন্নয়নশীল দেশের কাতার থেকে একধাপ এগিয়ে উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে, আমরা হবো সেই গর্বিত রাষ্ট্রের নাগরিক।

বিভিন্ন কার্যকরী পদক্ষেপ ও যথোপযুক্ত সিদ্ধান্তের ফলে সাম্প্রতিক সময়গুলোতে বৈশ্বিক তথ্যপ্রযুক্তি অঙ্গনে স্বীকৃতি পেতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। ডবিøউএসআইএস অ্যাওয়ার্ড, আইটিইউ অ্যাওয়ার্ড, সাউথ-সাউথ অ্যাওয়ার্ড এবং অ্যাপিকটা অ্যাওয়ার্ডসহ বেশ কিছু সম্মানজনক স্বীকৃতি এর উদাহরণ। তরুণ প্রজন্ম কেবল চাকুরিমুখী না হয়ে তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় নিজেরাই গড়ে তুলছে ছোট-বড় আইটি প্রতিষ্ঠান, ই-কমার্স ব্যবসা, অ্যাপভিত্তিক সেবাসহ নানা প্রতিষ্ঠান। এছাড়া মহাকাশে বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইটসহ কয়েকটি বড় প্রাপ্তি বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশকে নিয়ে গেছে অনন্য উচ্চতায়। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মোকাবিলায় বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাত দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়নে জোর দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় রাজধানীর আইসিটি টাওয়ারে ই-গভর্নমেন্ট মাস্টার প্ল্যান রিপোর্ট প্রকাশ অনুষ্ঠানে বলেন, “ডিজিটাল সেবার বিস্তৃৃতি ও উন্নতি ঘটিয়ে বাংলাদেশ আগামী পাঁচ বছরে জাতিসংঘের ই-গভর্নমেন্ট উন্নয়ন সূচকে সেরা ৫০টি দেশের তালিকায় থাকবে। জাতিসংঘের ই-গভর্নমেন্ট উন্নয়ন সূচকে জাতীয় ইনডেক্সে আমরা এখন ১১৯ নম্বরে আছি। আগামী পাঁচ বছরে আমরা আরও ৫০ ধাপ উন্নতি করে দুই অঙ্কের সংখ্যায় আসব, এমন লক্ষ্যমাত্রা আমাদের”।
বৈশ্বিক করোনা সংকট মোকাবেলায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের নানা উদ্যোগের ফলে মানুষ দেখেছে নতুন সম্ভাবনা। শুরুতেই নাগরিকদের জন্য করোনাভাইরাস সংক্রান্ত যেকোনো প্রয়োজনীয় পরামর্শ, করোনা সম্পর্কিত সকল সেবার হালনাগাদ তথ্যের জন্য করোনা পোর্টাল সুরক্ষা চালু করা হয়। এ বিভাগের আওতাধীন এটুআই-এর উদ্যোগ করোনা বিষয়ক তথ্যসেবা, টেলিমেডিসিন সেবা, সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য জরুরি খাদ্য সহায়তা, সেলফ করোনা টেস্টিংসহ অনেকগুলো নতুন সেবা যুক্ত করা হয় হেল্পলাইন ৩৩৩ নম্বরে। এছাড়া প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে করোনা বিডি অ্যাপ এবং কন্টাক্ট ট্র্যাসিং অ্যাপ, ভলান্টিয়ার ডক্টরস পুল অ্যাপ, প্লাজমা ডোনেশন প্ল্যাটফর্ম, সেল্ফ টেস্টিং টুল, প্রবাস বন্ধু কলসেন্টার, ডিজিটাল ক্লাসরুম, ফুড ফর নেশন ও এডুকেশন ফর নেশনসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়। তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় ‘হোম অফিস’ এর মাধ্যমে সচল ছিলো সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দাপ্তরিক কার্যক্রম। এমনকি বিচার বিভাগও এটুআই-এর সহযোগিতায় ‘ভার্চুয়াল কোর্ট’ এর মাধ্যমে সম্পন্ন করেছে বিচারিক কার্যক্রম। ঘরবন্দী জীবনেও নিশ্চিন্তে জনগণ নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী পেয়েছে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে চালুকৃত বিভিন্ন অনলাইন শপগুলোর মাধ্যমে। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ যেমন অনলাইনে কেনাকাটায় অভ্যস্ত হয়েছে, একই সাথে দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও অনলাইনের উপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে অনেক বেশি।
তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং দপ্তরের সেবা সহজিকরণের মাধ্যমে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়ে সরকারি সেবা হয়ে উঠছে সহজ এবং নিরাপদ। ঘরে বসে দেশ-বিদেশে চাকরির নিবন্ধন, হজযাত্রার নিবন্ধন, বিভিন্ন ধরনের দাপ্তরিক ফরম, ট্যাক্স, জাতীয় পরিচয়পত্র, ভূমি রেকর্ড ডিজিটালকরণ, ই-গভর্ন্যান্স ও ই-সেবা, টেন্ডার বা দরপত্রে অংশগ্রহণ ইত্যাদি কাজকর্ম অনলাইনেই সম্পন্ন করা যাচ্ছে এখন। এছাড়া এটুআই এর সহায়তায় ই-নথি, জাতীয় তথ্য বাতায়ন, মাইগভ অ্যাপ, একসেবা, একপে, ডিজিটাল সেন্টার, ই-নামজারি, আরএস খতিয়ান সিস্টেম, অনলাইন গ্রিভেন্স রিড্রেস সিস্টেম, জিটুপি পদ্ধতিতে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভাতা প্রদান ইত্যাদি প্ল্যাটফর্মগুলো সরকারি বিভিন্ন সেবাকে নাগরিকদের জন্য আরো সহজ করে তুলেছে।
সরকারের সকল দপ্তরকে একীভূত নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে ৫৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগসহ গুরুত্বপূর্ণ ২৪০টি সরকারি দপ্তর এবং ৬৪ জেলা ও নির্বাচিত ৬৪টি উপজেলায় নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া ১৮,৪৩৪টি সরকারি অফিসকে একীভূত নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হয়েছে ও ৮০০+ গুরত্বপূর্ণ দপ্তরে ভিডিও কনফারেন্সিং সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। উপজেলা পর্যন্ত সরকারি দপ্তরসমূহে অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল দ্বারা সংযুক্ত করা হয়েছে। দেশের প্রান্তিক জনপদে দ্রæতগতির ইন্টারনেট সেবা সরবরাহের লক্ষ্যে ২,৬০০ ইউনিয়ন পরিষদ এবং ১,০০০ পুলিশ স্টেশনে উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ প্রদানের প্রক্রিয়া চলছে। তাছাড়াও, ৫০০৪টি ইউনিয়ন পরিষদে ওয়াইফাই জোন স্থাপন করে জনগণকে ইন্টারনেট সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। দেশব্যাপী ইউনিয়ন পরিষদসমূহকে সংযুক্ত করতে ১৯,৫০০ কি.মি. অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। দুর্গম এলাকায় তথ্যপ্রযুক্তি নেটওয়ার্ক স্থাপন (কানেক্টেড বাংলাদেশ) প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের ৭৭২টি দুর্গম ইউনিয়নকে এই নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশের সকল ইউনিয়ন দ্রæতগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট কানেক্টিভিটির আওতায় আসবে।
ই-গভর্মেন্ট বাস্তবায়নে বিদ্যমান ডাটা সেন্টারের হোস্টিং ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। ইলেক্ট্রনিক পদ্ধতিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানের ডাটা সংরক্ষণের জন্য বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলে স্থাপিত ডাটা সেন্টারের সম্প্রসারণ করে ২০৬টি রেক স্পেসের ক্ষমতায় উন্নীত করা হয়েছে। এতে সরকারি ওয়েব সাইট (৬২৭টি), ই-মেইল হোস্টিং সার্ভিস (৭৭৩৪৯টি ই-মেইল একাউন্ট), বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভোটার তালিকার তথ্যভান্ডার, ই-সেবা সংক্রান্ত কার্যক্রম, জাতীয় তথ্য বাতায়ন (৫১ হাজারের অধিক সরকারি দপ্তরের তথ্য বাতায়ন), জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ই-ভ্যাট, ই-ট্যাক্স ইত্যাদি সিস্টেম, অর্থ বিভাগের অনলাইন বেতন ও পেনশন নির্ধারণী সিস্টেম হোস্টিং করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল কর্তৃক স্থাপিত টায়ার থ্রি ডাটা সেন্টারটি আইএসও-২৭০০১; আইএসও-২০০০০ আন্তর্জাতিক মান অর্জন করেছে। দুর্যোগকালীন সময়ে জাতীয় ডাটা সেন্টারের গুরুত্বপূর্ণ সেবা ও তথ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার জন্য শেখ হাসিনা সফ্টওয়্যার টেকনোলজি পার্ক, যশোর-এ ৩ পেটাবাইট স্টোরেজ ক্ষমতাসম্পন্ন ডিজাস্টার রিকভারি ডাটা সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের আরেকটি বড় অর্জনের তালিকায় যোগ হচ্ছে টিয়ার ফোর জাতীয় ডাটা সেন্টার, টায়ার-৪ ন্যাশনাল ডাটা সেন্টার। তথ্য সুরক্ষা ও অধিক হোস্টিং ক্ষমতার এই ডাটা সেন্টারটি আন্তর্জাতিক মানের এবং যুক্তরাষ্ট্রের আপটাইম ইনস্টিটিউট থেকে এর ডিজাইন অনুমোদিত হয়। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বঙ্গবন্ধু হাইটেক সিটিতে এই ডাটা সেন্টারটি স্থাপিত হয়েছে। ইতোমধ্যে জাতীয় ডাটা সেন্টার দু’টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেছে।
সরকারের তথ্যপ্রযুক্তির নানা উদ্যোগের ফলে শিক্ষা কার্যক্রম এখন অনেকাংশেই সহজতর হয়েছে, পেয়েছে বৈশ্বিক মান। প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি বিভিন্ন কারিগরি ও অনলাইন প্রযুক্তিগত ডিজিটাল জ্ঞান তৈরি করছে নানা কর্মসংস্থান। ‘তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা নয়, শিক্ষায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার’-এই শ্লোগানকে সামনে নিয়ে দেশের সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম চালু করা হয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রমকে আরো সহজ করে তুলতে এটুআই-এর সহযোগিতায় তৈরি করা হয়েছে ‘কিশোর বাতায়ন’ ও ‘শিক্ষক বাতায়ন’ এর মত প্ল্যাটফর্ম। এ প্ল্যাটফর্মগুলোর ফলে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা বিভিন্ন অনলাইন কন্টেন্ট থেকে নিত্য নতুন জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি একটি সমৃদ্ধ জাতি গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। এছাড়া রয়েছে ‘মুক্তপাঠ’ নামক বাংলা ভাষায় সর্ব বৃহৎ ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম। যেখানে অনলাইনে সাধারণ, কারিগরি, বৃত্তিমূলক ও জীবনমুখী শিক্ষার সুযোগ রয়েছে।
কৃষি প্রধান বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকের মাঝে সহজ ও দ্রæত সময়ে সেবা প্রদানের লক্ষ্যে উদ্ভাবন করা হয়েছে তথ্য ও প্রযুক্তিগত সেবা ‘কৃষি বাতায়ন’ এবং ‘কৃষক বন্ধু কলসেন্টার’। সরকারের বিভিন্ন কৃষি বিষয়ক সেবাগুলোর জন্য কলসেন্টার হিসেবে কাজ করছে ‘কৃষক বন্ধু কলসেন্টার’ (৩৩৩১ কলসেন্টার)। ফলে সহজেই কৃষকেরা ঘরে বসে বিভিন্ন সেবা গ্রহণ করতে পারছেন। এছাড়া সরকারের বিভিন্ন সেবা ও তথ্য সম্পর্কে জানতে পারছে ‘কৃষি বাতায়নে’। কৃষি পণ্য বিপণন এবং আর্থিক লেনদেনে মোবাইল ব্যাংকিং কৃষকবান্ধব হিসেবে কাজ করে চলেছে।
প্রযুক্তি চিকিৎসা সেবাকে এনে দিয়েছে ভিন্নমাত্রা। টেলিমেডিসিন সেবা দ্রæত ও জরুরি চিকিৎসা সেবাকে সহজ করে দিয়েছে। ফলে, সিরিয়াল নেয়া বা সময়ক্ষেপণ না কওে রোগী মোবাইলে ঘরে বসেই জরুরি চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করতে পারছেন। করোনার প্রকোপের সময়ে এ পদ্ধতিতেই সাধারণ মানুষ জরুরী চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করেছে। এটুআই-এর সহযোগিতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় চালু করেছে স্পেশালাইড টেলিহেলথ সেন্টার। প্রবাসীদের জন্য চালু করা হয়েছে প্রবাস বন্ধু কলসেন্টার। এটুআই, আইসিটি বিভাগের সহযোগিতায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নাগরিকদের স্বল্পমূল্যে টেলিমেডিসিন সেবা প্রদানে চালু হয়েছে ই-হেলথ্ সার্ভিস কোঅর্ডিনেশন ইউনিট।
তথ্যপ্রযুক্তির ফলে নতুন কর্মসংস্থান এবং দক্ষ জনবল তৈরি হচ্ছে। কেবল স্থানীয় সেবাই নয়, এর ফলে আন্তর্জাতিক পরিসরে ফ্রিল্যান্সিং করেও কর্মঠ প্রজন্ম উপার্জন করছে বৈদেশিক মুদ্রা। বর্তমানে বাংলাদেশ আইসিটি খাতে রপ্তানি আয় ১০০ কোটি মার্কিন ডলার। ২০২৫ সাল নাগাদ এ আয় ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উত্তীর্ণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রযুক্তির বিকেন্দ্রীকরণ করা হচ্ছে। এ জন্য দেশব্যাপী ৩৯টি হাইটেক পার্ক স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ৩১টি বিশেষায়িত ল্যাব স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। ২০১৫ সাল হতে শুরু করে এ পর্যন্ত বিভিন্ন পার্কে প্রায় ১০ লক্ষ বর্গফুট স্পেস তৈরি করা হয়েছে। গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈরে হাই টেক পার্কে বর্তমানে শতাধিক কোম্পানি কাজ করছে। এখানে মোবাইল ফোন সংযোজন, অপটিক্যাল ফাইবার, কিয়স্ক মেশিন, ডায়ালাইসিসি মেশিন সংযোজনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি ও পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে। বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ-এর বিভিন্ন প্রকল্প ও কর্মসূচির আওতায় ইতোমধ্যে ১২ হাজারের অধিক জনের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে। ২০২৩ সালের মধ্যে ৪০ হাজার জনকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। এছাড়া হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ হতে আইওটি, বøকচেইন, রবোটিক্স ইত্যাদি বিষয়েও প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারিভাবে গড়ে উঠা ১২টি সফটওয়ার টেকনোলজি পার্কে এখন পর্যন্ত প্রায় ২৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এ পর্যন্ত ১৫০টি প্রতিষ্ঠান হাই-টেক পার্কে ৮৮.৫২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এখানে সবার একটাই ইচ্ছা, তা হলো অর্থনৈতিক-সামাজিক উন্নয়নে প্রযুক্তি ব্যবহার করা। দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে হাই-টেক পার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করবে। যার মধ্যে যশোরে শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক নির্মাণের কাজ সমাপ্তির পথে। এ পার্ক সংলগ্ন স্থানে গড়ে তোলা হয়েছে কন্টেইনার ভিত্তিক ডিজাস্টর রিকভারি সেন্টার যা এশিয়ায় প্রথম। এছাড়াও, পর্যায়ক্রমে জেলা শহরগুলোতেও হাই-টেক পার্ক স্থাপনের কার্যক্রম চলছে। প্রতিটি হাই-টেক পার্ক ও সফটওয়ার টেকনোলজি পার্কে স্টার্ট আপদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ সুবিধাসহ বিনা ভাড়ায় স্পেস দেয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে দেশে স্টার্ট আপ তথা ইনোভেশন কালচার গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে। এছাড়াও তাদের মেনটরশিপ প্রদান করা হচ্ছে। স্টার্টআপসহ বিভিন্ন ছোট ছোট কোম্পানীগুলোকে বিশ্বে আইটি ব্যবসার গতি প্রকৃতি সম্পর্কে অবহিত হওয়ার জন্য বিভিন্ন ইভেন্টে যোগদানের সুযোগ দেয়া হচ্ছে।
তথ্যপ্রযুক্তি দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে যুক্ত করেছে মোবাইল ব্যাংকিং। এর ফলে দ্রæত দেশের যে কোন প্রান্তে অর্থনৈতিক লেনদেনের সুবিধা সাধারণ মানুষের জীবনে এনে দিয়েছে স্বস্তি। এছাড়া এটুআই-এর সহায়তায় ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে এজেন্ট ব্যাংকিং এর ফলে ব্যাংকিং কার্যক্রম পৌঁছে গেছে শহর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত। দেশের ই-কমার্স ব্যবসাকে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে গ্রামীণ ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ‘একশপ’। যেখানে গ্রামীণ উৎপাদনকারীরা নিজেদের পণ্য বিক্রি করতে পারছেন কোন মধ্যস্বত্ত¡ভোগী ছাড়াই।
২০০ বছরেরও অধিককাল ধরে বিদ্যমান বিচারিক কার্যক্রমকে ডিজিটাইজের ছোঁয়া দিতে তৈরি করা হয়েছে বিচার বিভাগীয় বাতায়ন। যার মাধ্যমে উচ্চ ও অধস্তন আদালতের বিচার বিভাগের সকল কার্যক্রম নথিভুক্ত থাকবে। এছাড়া করোনার প্রকোপের সময়ে ‘ভার্চুয়াল কোর্ট’ বিচারিক কার্যক্রমের স্থবিরতা নিরসনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে।
‘স্টার্টআপ বাংলাদেশ’ এর মাধ্যমে সরকারি সহায়তা লাভের পথও সুগম হচ্ছে। কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠার পর স্টার্টআপ মূল্যায়নের পরিপ্রেক্ষিতে সিড স্টেজে সর্বোচ্চ এক কোটি এবং গ্রোথ গাইডেড স্টার্টআপ রাউন্ডে সর্বোচ্চ পাঁচ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা যাবে। ইতোমধ্যে শতাধিক স্টার্টআপ-কে সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক এফ-কমার্স এর ব্যাপক বিস্তৃৃতিতে মূল ধারার ব্যবসায়ীরাও প্রযুক্তির সহায়তা নিতে এফ-কমার্সমুখী হচ্ছেন। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে অন্য বড় অগ্রগতি হয়েছে নারীদের তথ্যপ্রযুক্তিতে যুক্ত করার বিষয়টি। এছাড়া ই-কমার্স ও এফ-কমার্স খাত প্রসারের ফলে নারী উদ্যোক্তাদের উপস্থিতি বাড়ছে। ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) তথ্য বলছে, এখন দেশে প্রায় ২৫ হাজার ফেসবুক পেজে কেনাকাটা চলছে। এর মধ্যে ২০ হাজার পেজ চালাচ্ছেন নারীরা। ফেসবুককে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে স্বল্প পুঁজিতেই উদ্যোক্তা হয়ে উঠছেন নারীরা।
আইসিটি বিভাগ তথ্যপ্রযুক্তি উন্নয়নে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য সম্ভাবনার নতুন দুয়ার তৈরি করে আসছে। বর্তমান বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীকে কর্মদক্ষ করে গড়ে তুলে তথ্য ও প্রযুক্তি খাতে কাজে লাগাতে পারলে অচিরেই বাংলাদেশে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হবে। যার ফলে স্থিতিশীলতা আসবে সামাজিক, সাংস্কৃতিকসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও। স্বাধীনতা পেরিয়ে ৫২ বছর অতিবাহিত করছে বাঙালি জাতি। বর্তমান সরকার ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’র যে স্বপ্ন নিয়ে দেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে, তা শুধু স্বপ্ন বা শ্লোগানই নয়, বরং তা আজ দৃশ্যমান। যার সুফল ভোগ করছে দেশের প্রতিটি মানুষ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা অনুযায়ী বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যের অন্যতম মাধ্যম তথ্য-প্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ। সরকারের এ কর্মযজ্ঞে আরো সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। গড়ে উঠবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের স্বনির্ভর ও আত্মপ্রত্যয়ী বাংলাদেশ।
সত্যিকার অর্থে যেহেতু তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের সুফলই আমরা সবার কাছে পৌঁছতে পারিনি, চতুর্থ বিপ্লব মোকাবেলার জন্য আমাদের প্রস্তুতি কতটকু তা আরো গভীরভাবে ভাবতে হবে। ব্যাপক সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো স্থাপনের মাধ্যমে তা করা সম্ভব। উল্লেখ্য, শুধু আমাদের দক্ষ জনগোষ্ঠী নেই বলে পোশাক শিল্পের প্রযুক্তিগত খাতে কম-বেশি তিন লাখ বিদেশী নাগরিক কাজ করেন। অবাক হতে হয় যখন দেখা যায় প্রায় এক কোটি শ্রমিক বিদেশে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে আমাদের দেশে যে রেমিট্যান্স পাঠান, আমরা তার প্রায় অর্ধেকই তুলে দিই মাত্র ৩ লাখ বিদেশীর হাতে। তাই শুধু শিক্ষিত নয়, দেশে দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। শুধু দেশেই নয়, যারা বিদেশে কাজ করছেন তাদেরকেও যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশে পাঠাতে হবে। বিদেশে আমাদের এক কোটি শ্রমিক আয় করেন ১৫ বিলিয়ন ডলার।

অন্যদিকে ভারতের ১ কোটি ৩০ লাখ শ্রমিক আয় করেন ৬৮ বিলিয়ন ডলার। কর্মক্ষেত্রে আমাদের শ্রমিকদের অদক্ষতাই তাদের আয়ের ক্ষেত্রে এ বিরাট ব্যবধানের কারণ। সংগত কারণেই আমাদের উচিত কারিগরি দক্ষতার ওপর আরো জোর দেয়া। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনাটাও একান্ত জরুরি। আগামী দিনের সৃজনশীল, সুচিন্তার অধিকারী, সমস্যা সমাধানে পটু জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার উপায় হলো শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজানো, যাতে এ দক্ষতাগুলো শিক্ষার্থীর মধ্যে সঞ্চারিত হয় এবং কাজটি করতে হবে প্রাথমিক শিক্ষা থেকে। একই ধরনের পরিবর্তন হতে হবে উচ্চশিক্ষার স্তরে। প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য টিচিং অ্যান্ড লার্নিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন।

যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের গ্র্যাজুয়েট তৈরি করার জন্য স্কিল বিষয়ে নিজেরা প্রশিক্ষিত হবেন। শিক্ষার্থীদের প্রচলিত প্রশ্নোত্তর থেকে বের করে এনে তাদের কেস স্টাডি, অ্যাসাইনমেন্ট, প্রজেক্ট ইত্যাদির মাধ্যমে শিক্ষকদের মূল বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের প্রকাশযোগ্যতা, দলীয় কাজে দক্ষতা তৈরির জন্য ওইসব কেস স্টাডি, অ্যাসাইনমেন্ট কিংবা প্রজেক্টের উপস্থাপনাকে করতে হবে বাধ্যতামূলক এবং সেটি শুধু নিজ নিজ শ্রেণীকক্ষে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না, ছড়িয়ে দিতে হবে নানা অঙ্গনে। উচ্চশিক্ষার সর্বস্তরে শিল্পের সঙ্গে শিক্ষার্থীর সংযোগ বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে শিক্ষানবিশী কার্যক্রম বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা তাদের ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি বাস্তব জীবনের কার্যক্রম সম্পর্ক হাতে-কলমে শিখতে পারেন। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব মোকাবেলা করে এটিকে আশঙ্কার পরিবর্তে সম্ভাবনায় পরিণত করতে হলে আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।

দেশে প্রচলিত সব শিক্ষা ব্যবস্থাকে একীভূত করে বিশেষ করে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত এক ধারায় নিয়ে আসতে হবে এবং সেই ধারায় বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাকে প্রাধান্য দিতে হবে। শিক্ষকমÐলীর দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। চৌকস প্রতিভাবান লোকজনকে শিক্ষকতায় আগ্রহী করার জন্য নানা সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করতে হবে। উচ্চ শিক্ষাস্তরে গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে এবং যারা বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা ও গবেষণায় নিয়োজিত, তাদের মূল্যায়ন করতে হবে।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে গবেষণায় অর্থায়নে এগিয়ে আসতে হবে। প্রচুর বাংলাদেশী গবেষক বিদেশে বেশ ভালো ভালো গবেষণায় নিয়োজিত। প্রয়োজনরোধে তাদের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে এ দেশে এসে কাজ করার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও একাডেমিয়া একত্রে কোলাবরেশনের মাধ্যমে হাতে-কলমে শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের উচিত হবে সব বিভাগ/সেক্টর তাদের নিজস্ব কাজকে আরো বেগবান করার লক্ষ্যে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রযুক্তি/ভাবনা সামনে রেখে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা। অতঃপর সব সেক্টরের কর্মপরিকল্পনাকে সুসমন্বিত করে একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে সবাই মিলে কাজ করতে হবে।
যেভাবে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্য হলো মোবাইল-ল্যাপটপ
দেশে উৎপাদিত মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ট্যাব ইত্যাদি প্রযুক্তি পণ্যকে কী নামে ডাকা হবে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তর্ক-বিতর্ক চলে আসছে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি অঙ্গনে। ‘মেড ইন বাংলাদেশ’, ‘মেক ইন বাংলাদেশ’, নাকি ‘অ্যাসেমবিøং ইন বাংলাদেশ’ লেখা হবে এ নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। তবে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী এবং দেশের মোবাইল ফোন উৎপাদকরা বলেছেন, ‘মেড ইন বাংলাদেশ’-ই হবে। অন্য কোনও কিছু বলার সুযোগ নেই।
তবে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্য নামে ডাকার জন্য সরকারের মৌলিক শর্ত ছিল মোবাইল, ল্যাপটপ, ট্যাব ইত্যাদিতে স্থানীয়ভাবে ৩০ শতাংশ ভ্যালু অ্যাড করতে হবে। দেশের ১৪টি মোবাইল ফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বেশিরভাগই ৩০ শতাংশের কোটা পূরণ করতে পেরেছে। যারা এখনও পারেনি, তারা একটা প্রক্রিয়ার ভেতর রয়েছে। শিগগিরই বাকি অংশটাও পূরণ হয়ে যাবে বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
‘অবশ্যই মেড ইন বাংলাদেশ পণ্য বলতে হবে। মেক ইন বাংলাদেশ বা অ্যাসেমবিøং ইন বাংলাদেশ বলার কোনও সুযোগ নেই। দেশে মোবাইল কারখানা তৈরির জন্য আমরা অনেক ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছি। কারখানা-সংশ্লিষ্ট এলাকাকে হাইটেক পার্ক ঘোষণা করছি। সেখানে তারা কর অবকাশ সুবিধাসহ আরও অনেক সুবিধা পাচ্ছে। ৯৪টি পণ্যের শুল্ক কমিয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে। যারা স্মার্টফোন, ল্যাপটপ এবং অন্যান্য যন্ত্রাংশ রফতানি করছে, তারা ১০ শতাংশ হারে প্রণোদনা পাচ্ছে।’

এ বিষয়ে দেশে স্থাপিত প্রথম মোবাইল ফোন তৈরির কারখানার (স্যামসাং মোবাইল) উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান ফেয়ার ইলেকট্রনিকস জানায় ‘মেড ইন বাংলাদেশ পণ্যের মৌলিক শর্ত হলো স্থানীয়ভাবে ৩০ শতাংশ ভ্যালু অ্যাড করতে হবে। স্যামসাংয়ের মোবাইল কারখানা স্থাপনের শুরুর দিকে আমরা প্রায় সব যন্ত্রাংশ আমদানি করতাম। সে সময় আমরা বলতাম মেইড ইন চায়না অ্যাসেমবিøং ইন বাংলাদেশ। পরে আমরা পিসিবি নিজেরা তৈরি করতে শুরু করি। ব্যাটারি, চার্জার, মোবাইলের পর্দা এখানে তৈরি করতে শুরু করে। এখন আমাদের ভ্যালু অ্যাডিশন ৩০ শতাংশের বেশি। ফলে আমরা মেড ইন বাংলাদেশ মোবাইল বলাই যায়।
আমাদের দেশে মোবাইল ফোন তৈরির ১৪টি কারখানা রয়েছে। এসব কারখানা মানুফ্যাকচারিং (সিকেডি) এবং অ্যাসেমবিøং (এসকেডি) কাট্যাগরিতে কারখানার অনুমতি পেয়েছে। আমাদের জানা মতে, ১০টি প্রতিষ্ঠান মোবাইল তৈরি করছে। তারা দেশে পিসিবি, চার্জার, ব্যাটারি, হেডফোন তৈরি করছে। ফলে তারা বলতেই পারে মেড ইন বাংলাদেশ। ৪টির মতো প্রতিষ্ঠান (মোবাইল কারখানা) এখনও সব শর্ত পূরণ করতে পারেনি।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সব মোবাইল ফোন কারখানা প্রায় ২২ থেকে ২৬ শতাংশ স্থানীয়ভাবে ভ্যালু অ্যাড করছে। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানের এই শতাংশ ১৮। তবে ১৮-এর নিচে কারও নেই বলে সবার অভিমত। স্থানীয় শ্রমিক-কর্মী, বিদ্যুৎ, নিজেদের ভবন ইত্যাদিও এই ভ্যালু চেইনের অংশ। ফলে মেড ইন বাংলাদেশ বলাই যায়। মেইড ইন বাংলাদেশ পণ্য বলতে হলে স্থানীয়ভাবে ওই পণ্যে ৩০ শতাংশ ভ্যালু অ্যাড করতে হবে। ওয়ালটনের পণ্যে এই হার ৩০ শতাংশের বেশি।’ ওয়ালটন পিসিবি, মাদারবোর্ড, মাউস, কি-বোর্ড, পেন ড্রাইভসহ আরও অনেক কিছু তৈরি করে। উল্লেখ্য, ওয়ালটন, স্যামসাং, নকিয়া, ভিভো, সিম্ফনি, আইটেল, টেকনো, ইনফিনিক্স, লাভা, লিনেক্স, অপো, রিয়েলমি, মাইসেল, ডিটিসি, ফাইভস্টার, উইনস্টার, শাওমি, প্রোটন ইত্যাদি মোবাইল দেশে তৈরি হচ্ছে।

হীরেন পণ্ডিত, প্রাবন্ধিক ও গবেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

slot qris

slot bet 100 rupiah

slot spaceman

mahjong ways

spaceman slot

slot olympus slot deposit 10 ribu slot bet 100 rupiah scatter pink slot deposit pulsa slot gacor slot princess slot server thailand super gacor slot server thailand slot depo 10k slot777 online slot bet 100 rupiah deposit 25 bonus 25 slot joker123 situs slot gacor slot deposit qris slot joker123 mahjong scatter hitam

https://www.chicagokebabrestaurant.com/

sicbo

roulette

spaceman slot