Togel Online

Situs Bandar

Situs Togel Terpercaya

Togel Online Hadiah 4D 10 Juta

Bandar Togel

স্মার্ট বাংলাদেশ গড়বে তরুণ প্রজন্ম


হীরেন পণ্ডিত: আজকের শিক্ষার্থীরাই একদিন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তুলবে। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের অঙ্গীকার সফলভাবে বাস্তবায়নের পর বাংলাদেশ এখন নতুন কর্মসূচি নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি বাস্তবায়ন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে নিরলস কাজ করছেন। স্মার্ট সিটিজেন, স্মার্ট ইকোনমি, স্মার্ট গভর্নমেন্ট এবং স্মার্ট সোসাইটি এই চারটি মূল ভিত্তির ওপর গড়ে উঠবে ২০৪১ সাল একটি সাশ্রয়ী, টেকসই, বুদ্ধিদীপ্ত, জ্ঞানভিত্তিক, উদ্ভাবনী স্মার্ট বাংলাদেশ।
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন বিষয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তিনি যুব সমাজের উন্নয়নে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার কথা বলেছেন, এর গুরুত্ব বর্তমানেও অধিক। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব উপযোগী দক্ষ যুবশক্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও বঙ্গবন্ধুর যুবভাবনা ও চিন্তাচেতনা প্রাসঙ্গিক। যুবসমাজ নিয়ে বঙ্গবন্ধুর অনেক ভাবনা ও স্বপ্ন ছিল। তিনি ভাবতেন যুব সমাজের প্রতিটি সদস্যকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তারাই হয়ে ওঠবে এক আদর্শবান শক্তি। এই আদর্শ মানুষ বলতে তিনি এমন ব্যক্তিকে বুঝিয়েছেন, যে উন্নত মানবিক গুণাবলি ধারণ করবে ও অন্যের জন্য অনুসরণযোগ্য হবে। অর্থাৎ সামাজিকভাবে যা কিছু ভালো শ্রেষ্ঠ, মহৎ ও কল্যাণকর সব কিছুই থাকবে যুবসমাজের প্রতিটি সদস্যের মধ্যে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ যুব ও তরুণসমাজ। বর্তমান লোকসংখ্যার হিসাবে দেশে সাড়ে ৪ কোটির বেশি তরুণ ও তরুণী রয়েছে।
আদর্শ মানুষ হতে হলে সবার ভেতর যেসব গুণ থাকা দরকার সেগুলো হলো-সততা, নিষ্ঠা, পরিশ্রমী ও পরোপকারী মনোভাব, মানবদরদি-সহমর্মিতা, নির্লোভ-নিরহংকার এবং সাহস। বঙ্গবন্ধু নিজে ছিলেন একজন আদর্শবাদী মানুষ। বাংলার শোষিত-নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের মুক্তিই ছিল তার জীবনের মূল লক্ষ্য ও আদর্শ। যে লক্ষ্য বাস্তবায়নে তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন।
বাংলার মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বার বার জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন। জেল-জুলুম ও নিপীড়ন তাঁর জীবনে এক নিয়মিত অধ্যায়ে পরিণত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর চিন্তাচেতনা, ধ্যান-স্বপ্ন ও কর্ম সবই ছিল এ দেশের মানুষের মঙ্গল ও কল্যাণের জন্য, দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য। ভোগ নয়, রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধু ছিলেন ত্যাগের আদর্শ উদাহরণ। তিনি রাজনীতিতে নীতি-আদর্শকে সর্বোচ্চ স্থান দিতেন। তাঁর রাজনীতির লক্ষ্য নিছক ক্ষমতায় যাওয়া ছিল না, ছিল বাঙালির অধিকার আদায় বা জাতীয় মুক্তি অর্জনে নির্দেশিত। তিনি বিশ্বাস করতেন যুবসমাজকে এই ক্ষমতায় বলীয়ান হতে হবে।
বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে বেছে নিয়েছিলেন। এই আদর্শকে তিনি রাষ্ট্রীয় আদর্শেও পরিণত করেছিলেন। তিনি মনে করতেন বাংলাদেশ একটি আদর্শ রাষ্ট্র হবে, যে রাষ্ট্রের ভিত্তি থাকবে গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। এর আলোকে ১৯৭২-এর সংবিধানে রাষ্ট্রের চার মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয় জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে।
বাংলাদেশের জাতীয় যুবনীতিতে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের ‘যুব’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। যুবসমাজকে একটি জাতির স্তম্ভ, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও উন্নয়নের কারিগর বলা যেতে পারে। যুবকরা শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্তিশালী, জাগ্রত জ্ঞানের অধিকারী এবং রাষ্ট্র-সমাজের পরিবর্তন-সংগ্রামের অগ্রনায়ক।
মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবন উৎসর্গকারীদের বিশাল একটি অংশ ছিল যুবক। যুবক শেখ মুজিবুর রহমানের পাঠশালা ছিল বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশ। বাঙালির হাজার বছরের আশা-আকাক্সক্ষা, বেদনা-বিক্ষোভ ও ঐতিহ্যকে তিনি নিজের চেতনায় আত্মস্থ করেছিলেন। বাংলার যুবকরা ছিল তার প্রাণ।
যুবকদের ওপর ভর করেই বঙ্গবন্ধু এঁকেছিলেন সাফল্যের নকশা। এ দেশের যুবসমাজ যেন নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারে, কর্মমুখী হতে পারে, দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হয়ে সোনার বাংলা গড়তে পারে, আজীবন তিনি তাই কামনা করেছেন।
যুবসমাজকে যথাযথভাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন শিক্ষার ওপর। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন গণমুখী, বিজ্ঞানভিত্তিক ও কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থা। তিনি যুবকদের পড়ালেখার পাশাপাশি বিভিন্ন দায়িত্ব-কর্তব্য পালনের তাগিদ দিতেন। ১৯৭৩-এ ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বক্তৃতায় তিনি বলেছেন-“বাংলার মানুষ, বিশেষ করে তরুণ সম্প্রদায়কে আমাদের ইতিহাস জানতে হবে। বাংলার যে ছেলে তার অতীত বংশধরদের ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারে না, সে ছেলে সত্যিকারের বাঙালি হতে পারে না।”
বর্তমান চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের জন্য প্রয়োজন প্রযুক্তি-রোবটিকস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আইওটি জানা দক্ষ যুবসমাজ গড়ে তোলা। তবে এক্ষেত্রে কৃত্রিম চেতনা ও মনোভাবের প্রজন্ম যেন গড়ে না ওঠে, সে ব্যাপারে অধিক সচেতনতা প্রয়োজন। বঙ্গবন্ধুর ভাবনায় খাঁটি-দক্ষ, সৎ ও বাঙালি চেতনায় উদ্বুদ্ধ দেশপ্রেমী যুবসমাজই হলো দেশের সম্পদ।
২০১৮ সালের আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে যেসব অঙ্গীকারের কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে ২০১৭ সালে প্রণীত জাতীয় যুবনীতির কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীন পৃথক যুব বিভাগ ও একটি গবেষণাকেন্দ্র গঠন এবং মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি। যুবকদের কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি শিক্ষা, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা ছাড়াও চলমান জাতীয় সেবা-কর্মসূচির ক্ষেত্রকে প্রসারিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এসব নির্বাচনী অঙ্গীকার নিঃসন্দেহে খুব আকর্ষণীয় ও উৎসাহব্যঞ্জক। এই অঙ্গীকার তরুণ ও যুবসমাজেন ক্ষমতায়নে আরো ব্যাপক ভ‚মিকা রাখবে। তবে এমন একটি জাতীয় পরিকল্পনা থাকা উচিত, যাতে একজন শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষে সহজেই কাজ খুঁজে পায়। কর্মধর্মী শিক্ষা-পরিকল্পনা তরুণদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও কর্মের ব্যবস্থা করতে সহায়ক হবে। তরুণসমাজকে অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ ও রক্ষা করতে হবে। সেই চেতনার সঙ্গে কোনো আপস নেই। অনেক কারণেই তরুণরা দেশের জন্য অসীম শক্তি হিসেবে বিবেচিত। সেই শক্তি দেশের উন্নয়ন ও সঠিক পথে দেশকে এগিয়ে নেয়ার জন্য কাজে লাগাতে হবে।
বাংলাদেশের সকল আন্দোলন-সংগ্রাম ও অগ্রগতির পথে এ দেশের যুব সমাজের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। মহান ভাষা আন্দোলন হতে স্বাধীনতা সংগ্রামসহ এদেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় যুবরা যেমন জীবন উৎসর্গ করতে কার্পণ্য করেনি, তেমনি অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামেও তারা নিরলসভাবে ব্যাপৃত। বিশ্বব্যাপী ‘কোভিড-১৯’ মহামারির সময়েও আমাদের যুবসমাজের কর্মস্পৃহা আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে সচল রেখেছে।
তারুণ্য হলো মানুষের জীবনে সাহস, সংগ্রাম ও সৃজনশীলতার সময়। পুরাতনকে ভেঙে সংস্কার করে নতুন কিছু করা যেন তারুণ্যের ধর্ম। সমাজের এই সংস্কারকাজে তরুণ সমাজকে সাহস ও সততার সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। তরুণেরা সমাজের সর্বস্তরে পরিবর্তনের বিপ্লব শুরু করবে এবং এক্ষেত্রে তরুণ সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই সবচেয়ে কার্যকর।
আমাদের দেশের তরুণদের অর্জন অনেক। খেলাধুলা, শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে তরুণেরা এগিয়ে যাচ্ছে। আজকের তরুণ সমাজই ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারক। তাই রাষ্ট্র ও সমাজের সব কল্যাণমূলক কাজে যুবসমাজের অংশগ্রহণ আবশ্যক। তরুণ সমাজ ঘুমিয়ে থাকলে অনিয়ম-দুর্নীতিতে নিমজ্জিত সমাজের আকাশ থেকে কখনো কালো মেঘের ছায়া সরবে না।
বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উনয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশে পরিণত হওয়ার জন্য প্রতিশ্রæতিবদ্ধ। তবে এজন্য আমাদের কর্মসংস্থানের দিকে অধিক নজর দিতে হবে। সরকারি দল, বিরোধী দল, নাগরিক সমাজসহ সমাজের প্রত্যেকেরই কর্মসংস্থান সৃষ্টির দায়িত্ব রয়েছে। চাকরি সৃষ্টি একটি বড় চ্যালেঞ্জ; দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে ত্রæটিমুক্ত ও দুর্নীতিমুক্ত রেখে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা শ্রমবাজারে দক্ষ ও শিক্ষাগতভাবে যোগ্য কর্মীর চাহিদা মেটাতে পারছে না।
সরকার ইতিমধ্যে অনেক সুচিন্তিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষাকে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যুগোপযোগী করতে কারিগরি শিক্ষা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে অধিকতর বিনিয়োগের প্রচেষ্টা চলছে। তরুণদের চাকরির পাশাপাশি উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবণতা ও আত্মকর্মসংস্থান বৃদ্ধিও ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সরকার আগামীর বাংলাদেশকে স্মার্ট বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চায়, যেখানে প্রতিটি জনশক্তি স্মার্ট হবে। সবাই প্রতিটি কাজ অনলাইনে করতে শিখবে, ইকোনমি হবে ই-ইকোনমি, যাতে সম্পূর্ণ অর্থ ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল ডিভাইসে করতে হবে। আমাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মযোগ্যতা সব কিছুই ই-গভর্ন্যান্সের মাধ্যমে হবে। ই-এডুকেশন, ই-হেলথসহ সব কিছুতেই ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করা হবে। ২০৪১ সাল নাগাদ আমরা তা করা সক্ষম হব এবং সেটা মাথায় রেখেই কাজ চলছে।
আমাদের তরুণ সম্প্রদায় যত বেশি এই ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করা শিখবে, তারা তত দ্রæত দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের নানা অনুষঙ্গ ধারণ করে তরুণদের প্রশিক্ষিত করে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষায়িত ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। এ ধরনের ৫৭টি ল্যাব প্রতিষ্ঠার কাজ চলছে। ৬৪টি জেলায় শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবিশন সেন্টার স্থাপন এবং ১০টি ডিজিটাল ভিলেজ স্থাপনের কার্যক্রম চলছে। ৯২টি হাই-টেক পার্ক, সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কের নির্মাণ করা হচ্ছে। সারা দেশে ৮৬৮৬টি ডিজিটাল সেন্টার এবং ১৩ হাজারের বেশি শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশে রূপান্তরিত করেছেন। সামনের স্মার্ট বাংলাদেশও শেখ হাসিনার সরকার করার লক্ষ্যে কাজ করছেন। ২০০৮ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের বলেছিলেন ডিজিটাল বাংলাদেশ দেবেন। আজ বাংলাদেশ ডিজিটাল বাংলাদেশ হয়েছে। তিনি যে স্মার্ট বাংলাদেশের কথা বলছেন, সেটির জন্যও তিনি নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
প্রযুক্তি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সংস্কৃতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে শুরু করে অনেক আগে থেকেই। বিজ্ঞান, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ফলে বিশ্বে উন্নয়ন দারুণ গতি পায়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর গুরুত্ব গভীরভাবে উপলব্ধি করেন। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সময় পান মাত্র সাড়ে তিন বছর। এই সময়ে প্রজ্ঞাবান ও বিচক্ষণ রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিসহ এমন কোনো খাত নেই যেখানে পরিকল্পিত উদ্যোগ ও কার্যক্রমের বাস্তবায়ন করেননি।
২০২১ সালে স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশ ‘ডিজিটাল বাংলাদেশে’ পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ, যার যাত্রা হয়েছিলো ২০০৮ সালে। আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির প্রসারে বাংলাদেশ আজ বিপ্লব সাধন করেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন আর স্বপ্ন নয়, বাস্তবতায় পরিপূর্ণতা পেয়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের জন্য সবার জন্য কানেক্টিভিটি, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, ই-গভর্নমেন্ট এবং আইসিটি ইন্ডাস্ট্রি প্রমোশন এই চারটি সুনির্দিষ্ট প্রধান স্তম্ভ নির্ধারণ করে ডিজিটাল বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে ২০৪১ সালের স্মার্ট বাংলাদেশের অভিযাত্রায়। দেশে বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩ কোটির বেশি এবং মোবাইল সংযোগের সংখ্যা ১৮ কোটি ৬০ লাখেরও উপরে।
জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে বর্তমানে সারা দেশে ৮৬৮৬টি ডিজিটাল সেন্টারে প্রায় ১৬ হাজারের বেশি উদ্যোক্তা কাজ করছেন, যেখানে ৫০ শতাংশ নারী উদ্যোক্তা রয়েছেন। এর ফলে একদিকে নারী-পুরুষের বৈষম্য, অন্যদিকে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য ও গ্রাম-শহরের বৈষম্য দূর হচ্ছে। দেশে স্টার্টআপ সংস্কৃতির বিকাশে ও স্টার্টআপদের উদ্ভাবনী সুযোগ কাজে লাগানোর পথ সুগম করতে সরকার আগামী পাঁচ বছরে ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে। মেধাবী তরুণ উদ্যোক্তাদের সুদ ও জামানতবিহীন ইকুইটি ইনভেস্টমেন্ট এবং ট্রেনিং, ইনকিউবেশন, মেন্টরিং এবং কোচিংসহ নানা সুবিধা দেওয়ার ফলে দশে স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে উঠেছে। বিকাশ, পাঠাও, চালডাল, শিওর ক্যাশ, সহজ, পেপারফ্লাইসহ দুই হাজার ৫০০ স্টার্টআপ সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। যারা প্রায় আরো ১৫ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। ১০ বছর আগেও এই কালচারের সঙ্গে আমাদের তরুণরা পরিচিত ছিল না। মাত্র সাত বছরে এই খাতে ৭০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এসেছে।
বিশ্বে অনলাইন শ্রমশক্তিতে ভালো অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। ২০০৯ সালের আগে বাংলাদেশে সরকারি কোনো সেবাই ডিজিটাল পদ্ধতিতে ছিল না। কিন্তু বর্তমানে সরকারি সব দপ্তরের প্রাথমিক সব তথ্য ও সেবা মিলছে ওয়েবসাইটে। সেই সঙ্গে সরকারি সব তথ্য যাচাই-বাছাই ও সংরক্ষণ এবং বিভিন্ন পরিষেবা ও আবেদনের যাবতীয় কার্যক্রম অনলাইনে পরিচালিত হচ্ছে। এরই মধ্যে আমরা ইন্টার-অপারেবল ডিজিটাল ট্রানজেকশন প্ল্যাটফরম ‘বিনিময়’ চালু করা হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে গেছে প্রত্যেক গ্রাহকের হাতের মুঠোয়। ডিজিটাইজেশনের মাধ্যমে অনেক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হচ্ছে। ফ্রিল্যান্সিং থেকে আসা অর্থ আমাদের জাতীয় প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করছে। তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দেশে আধুনিক ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এ সব কিছুই হচ্ছে ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফল।
নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ, ধনী-দরিদ্র-নির্বিশেষে সবার জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার সুনিশ্চিত করা, শহর ও গ্রামের সেবা প্রাপ্তিতে দূরত্ব হ্রাস করার সবই ছিল আমাদের ডিজিটাল বাংলাদেশের মূল উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য। ডিজিটাল বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ফলে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে, ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের মতো উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তাদের কর্মসংস্থানও নিশ্চিত করা গেছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও প্রযুক্তির কল্যাণে এখন গ্রামে বসেই যে কেউ চাইলেই ফ্রিল্যান্সিংয়ে কাজ করতে পারছে। এ সবই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রগতিশীল প্রযুক্তি, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নতির ফলে।
চলছে চতুর্থ বিপ্লবের সময়কাল। যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে মানুষের বুদ্ধি ও ইচ্ছা শক্তি, কারখানার উৎপাদন, কৃষিকাজসহ যাবতীয় দৈনন্দিন কাজকর্ম ও বিশ্ব পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই। প্রস্তুতি চলছে ২০৪১ সালের মধ্যে স্মার্ট বাংলাদেশে তৈরির। কিন্তু স্মার্ট যন্ত্র ও প্রযুক্তির সঙ্গে সঙ্গে নাগরিকদেরও চিন্তা-চেতনা, আচার-আচরণ ও সংস্কৃতিতে হতে হবে স্মার্ট। প্রতিনিয়তই আমরা আমাদের অজান্তে অনেক ভুল-ত্রæটি, অনিয়ম, অন্যায় ও অবিচার করে থাকি, যা একটু ইচ্ছা করলেই সংশোধন করা যায়। অবদান রাখতে পারি স্মার্ট বাংলাদেশ তৈরিতে।
সরকারের পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে ২১০০ সালের ডেল্টা প্ল্যান এবং ২০২১ থেকে ২০৪১ প্রেক্ষিতে পরিকল্পনাও প্রণয়ন করা হয়েছে। অর্থাৎ ২০২১ থেকে ২০৪১ কিভাবে বাংলাদেশের উন্নয়ন হবে তার একটা কাঠামো, পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। এই ব-দ্বীপ প্রজন্মের পর প্রজন্ম যেন জলবায়ুর অভিঘাত থেকে রক্ষা পায়, দেশ উন্নত হয় এবং উন্নত দেশে স্বাধীনভাবে সুন্দরভাবে যেন তারা স্মার্টলি বাঁচতে পারে। সেই ব্যবস্থা করছে সরকার। এখন সব নির্ভর করছে আমাদের নতুন প্রজন্ম বিশেষ করে যুব ও যুব নারীদের বলিষ্ঠ নেতৃত্বেই এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ তাই যুব সমাজের উপর অনেক দায়িত্ব। তারুণ্যের শক্তিই, বাংলাদেশের উন্নতি। এটাই ছিল ছিলো আওয়ামী লীগের ২০১৮ এর নির্বাচনী ইশতেহার। তরুণ যুব সমাজের এই বলিষ্ঠ নেতৃত্ব প্রদানে সক্ষম করে গড়ে তোলার দায়িত্ব সকলের।
বর্তমানে বিশ্ব চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগ, যেখানে প্রকৃতি, প্রযুক্তি এবং মানুষ এক সূত্রে গাঁথা। বঙ্গবন্ধুর জন্ম, বেড়ে ওঠা, শিক্ষা, তথ্য প্রযুক্তি ভাবনা সবই ছিল এক সূত্রে গাঁথা। দেশের শিক্ষা ও তথ্য প্রযুক্তি অবকাঠামো রচনা এবং এ বিষয়ে চিন্তা করতে ভুল করেননি তিনি। ১৯৭১ সালে যখন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের ভিত্তি রচিত হয় তখনই তথ্য ও প্রযুক্তিভিত্তিক বাংলাদেশ তৈরির পটভূমি রচিত হয় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে। দ্রæত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতের বিকাশে তিনি উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষালাভের জন্য পর্যায়ক্রমে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থাপন করা হচ্ছে একের পর এক দৃষ্টিনন্দন একাডেমিক ভবন, শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাবরেটরি, হাইটেক পার্ক ইত্যাদি। শিক্ষা উন্নয়নের এই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি প্রণীত হয়েছে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব উপযোগী, কর্মমুখী, উদ্ভাবনী ও জ্ঞানভিত্তিক বিশ্বমানের শিক্ষা কারিকুলাম, যা এ বছর থেকেই চালু হয়েছে। এছাড়াও শিক্ষা বিস্তারে বিপ্লবী যেসব অগ্রগতি বিশ্ব দরবারে প্রশংসিত হচ্ছে তা হলোÑ সাক্ষরতার হার ৭৫ দশমিক ৬-এ উন্নীত, নারী শিক্ষায় ও সক্ষমতায় অসামান্য অগ্রগতি ইত্যাদি।
বর্তমান বিশ্ব প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়েই অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করে চলেছে। এই বিষয়টি বঙ্গবন্ধু অনুধাবন করতে পেরেছিলেন অনেক আগেই। তিনি চেয়েছিলেন এমন শিক্ষাব্যবস্থা যার মাধ্যমে শুরু থেকেই দেশের ছোট্ট শিশু-কিশোররা সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারে এবং প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের বিষয়ে দক্ষ হয়ে ওঠে। তাই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই ১৯৭২ সালের ২৬ জুলাই বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. কুদরত-ই-খুদার নেতৃত্বে একটি যুগোপযোগী শিক্ষা কমিশন গঠন করেন।
বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের পর একটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশকে তিনি বিদ্যুৎগতিতে উন্নয়নের দুয়ারে পৌঁছে দিয়েছিলেন। বাংলাদেশকে একটি আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক ও উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে বিজ্ঞান চর্চার কোনো বিকল্প নেই তা তিনি শুরু থেকেই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রীয় কাজের শত ব্যস্ততার মাঝেও সারা দেশে শিক্ষাবিদ, গবেষক, বিজ্ঞানী ও শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নানাভাবে অনুপ্রেরণা ও উৎসাহ দেন। দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নতুন নতুন ধারণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে বিজ্ঞানীদের মনোনিবেশ করতে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
১৯৭৩ সালের ১৯ আগস্ট সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছাত্রলীগের জাতীয় সম্মেলনে তিনি বিএ, এমএ পাসের পরিবর্তে বুনিয়াদি শিক্ষা নিয়ে তথা কৃষি স্কুল ও কলেজ এবং ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল ও কলেজে শিক্ষা নিয়ে সত্যিকারের মানুষ হওয়ার উপদেশ দেন। তিনি জানতেন, সোনার মানুষ গড়তে হলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার বিকল্প নেই। বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করেছিলেন, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী ও বিজ্ঞানমুখী করতে হলে এমন একজন প্রথিতযশা বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদকে দায়িত্ব দিতে হবে, যেন তিনি একটি বিজ্ঞাননির্ভর আধুনিক, যুগোপযোগী শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে পারেন। তাই তিনি প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ ড. কুদরত-এ-খুদাকে চেয়ারম্যান করে ১৯৭২ সালে প্রথম শিক্ষা কমিশন ‘জাতীয় শিক্ষা কমিশন’ গঠন করেন।
বঙ্গবন্ধু প্রকৃতপক্ষে একজন বাস্তববাদী ও দূরদর্শী রাজনীতিবিদ ও নীতি-নির্ধারক ছিলেন। তিনি আধুনিক, বিজ্ঞান-প্রযুক্তিনির্ভর ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রত্যেকটি সেক্টরে উন্নয়নের গোড়াপত্তন করে গিয়েছিলেন। আজকের বাংলাদেশে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে যেটুকু অগ্রগতি হয়েছে, তার বেশিরভাগ যাত্রা শুরু হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর হাত ধরেই। একজন রাজনীতিবিদ যে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ভাবনায় বা দৃষ্টিভঙ্গিতে আধুনিক ও স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন, তার প্রমাণ আমরা তার কর্মে দেখতে পাই। এদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অগ্রগতি ও উন্নয়নে বঙ্গবন্ধুর বিজ্ঞান ভাবনা ও অবদান বাঙালি জাতির কাছে নিঃসন্দেহে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু দেশ গঠনে উচ্চশিক্ষাকে গুরুত্ব দেন। প্রাথমিক থেকে শুরু করে কারিগরি শিক্ষার প্রতিও সমভাবেই গুরুত্ব দেন তিনি। একটি ‘জ্ঞানভিত্তিক সমাজ’ বিনির্মাণে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ করেছি সে দর্শনটাও মানুবমক্তির দর্শন, বৈষম্যহীন অর্থনীতি-সমাজ বিনির্মাণের দর্শন’। প্রযুক্তিগত দিকে থেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা দেখতে পাই ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নে (আইটিইউ) বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভ। আইটিইউ স্যাটেলাইট অরবিট বা ফ্রিকোয়েন্সি বরাদ্দ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বিধিমালা তৈরি এবং এর বরাদ্দে সহযোগিতা দেওয়া ও সমন্বয়ের কাজ করে থাকে এবং অন্যটি হচ্ছে, বেতবুনিয়ায় ভূউপগ্রহ কেন্দ্র স্থাপন। ১৯৭৫ সালের ১৪ জুন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বেতবুনিয়া ভূউপগ্রহ উদ্বোধন করেন।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয় তখন বিশ্বে তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের যুগ চলছিল। বঙ্গবন্ধু দেখলেন তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের সম্ভাবনা ও সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইউরোপ এবং এশিয়ার অনেক দেশ উন্নতির শিখরে পৌঁছে যাচ্ছে। পাশাপাশি ১৯৬৯ সালে ইন্টারনেট আবিষ্কার এ বিপ্লবের গতি, প্রভাব ও ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করে দেয়। জাপান, চীন, কোরিয়াসহ এশিয়ার কয়েকটি দেশ তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের আবির্ভাব থেকে সৃষ্ট সুযোগকে কাজে লাগাতে শুরু করে।
অফিসের কাজ, ব্যবসা, লেনদেন, কৃষি, চিকিৎসা, শিক্ষাক্ষেত্রসহ প্রাত্যহিক জীবনের বহু কাজ কত দ্রæত আর সহজেই হয়ে যাচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে। আমরা এখন এতটাই তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর হয়ে গেছি যে, একটা দিনও আমরা তথ্যপ্রযুক্তি ছাড়া চলতে পারি না। আমরা এখন যা বুঝতে পারছি বঙ্গবন্ধু তা অনুধাবন করেছিলেন বহু বছর আগেই। শিক্ষাকে কোনো শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একে সর্বজনীন করে দেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুর প্রচেষ্টা ছিল লক্ষ্যনীয়। তিনি মনে করতেন শিক্ষা হবে অভিন্ন, গণমুখী ও সর্বজনীন অর্থাৎ সবার জন্য শিক্ষা। কেউ নিরক্ষর থাকবে না, সবাই হবে সাক্ষর।
বঙ্গবন্ধুর এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিরলসভাবে ভূমিকা পালন করে চলেছেন তাঁর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয়। নিদর্শনস্বরূপ আমরা দেখতে পাই যখন বাংলাদেশ বিশ্বের ৫৭তম যোগাযোগ উপগ্রহের মালিকানা লাভ করে। এই স্যাটেলাইটের নাম দেওয়া হয় ‘বঙ্গবন্ধু-১’। ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধু-২ স্যাটেলাইটের কার্যক্রম সফলভাবে চলছে, যা এ বছরেই উৎক্ষেপণ করার কথা রয়েছে।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ আবারো সরকার গঠন করলে প্রযুক্তিভিত্তিক উন্নয়নে গুরুত্ব দেয়া হয়। তখন কম্পিউটারের ওপর থেকে শুল্ক প্রত্যাহার, একচেটিয়া বাজার ভাঙতে নতুন মোবাইল ফোন কোম্পানির লাইসেন্স দেয়াসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়। এরপর ২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ‘দিন বদলের সনদে’ ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের রূপকল্প ঘোষণা করা হয় এবং ক্ষমতায় এসে শুরু হয় তা বাস্তবায়নের পালা।
ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রথম লক্ষ্য হলো একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ডিজিটাল সমাজ গড়ে তোলার মাধ্যমে এর সুফল বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেয়া। আগামী দিনের নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পাশাপাশি সহযোগী হতে হবে। সমস্যার সমাধান ও উদ্ভাবনের পথে একযোগে কাজ করতে হবে, তাহলেই বাংলাদেশের পক্ষে এগিয়ে যাওয়া অনেক সহজ হবে। ‘চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় সম্প্রতি উল্লেখ করেছেন ‘চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের’ নেতৃত্ব দেওয়ার মতো সক্ষমতা আমাদের আছে। আর তাই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, বøক চেইন, আইওটি, ন্যানো টেকনোলজি, বায়োটেকনোলজি, রোবটিকস, মাইক্রোপ্রসেসর ডিজাইনের মতো ক্ষেত্রগুলোতে বাংলাদেশ জোর দিয়েছে। নতুন উদ্ভাবনের পথে একযোগে কাজ করতে হবে, তাহলেই আমরা এগিয়ে যাবো।’
দেশে তথ্যপ্রযুক্তিখাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য বিশ্বমানের হাইটেক পার্ক নির্মাণ করা হয়েছে। এসব পার্কে বিনিয়োগে কর অব্যাহতি, বিদেশিদের জন্য শতভাগ মালিকানার নিশ্চয়তা, আয়কর অব্যাহতিসহ নানা সুযোগ আছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অনেক ধরনের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। যারা ফ্যাক্টরি বা তথ্য প্রযুক্তিখাতে বিনিয়োগে অবকাঠামো সুবিধা নিতে চান তারা এখানে বিনিয়োগ করতে পারেন। দেশে বর্তমানে স্যামসাংসহ কয়েকটি কোম্পানি পণ্য উৎপাদন শুরু করেছে। বাংলাদেশ বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম কনজুমার মার্কেট, এখানে বিশাল মধ্যবিত্ত শ্রেণি রয়েছে। এখানে স্টার্টআপদের জন্য বিশাল সুযোগ রয়েছে। তিনি বিশ^াস করেন, আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে মেড ইন চায়না বা ভিয়েতনামের মতো বাংলাদেশের তৈরি মোবাইল হ্যান্ডসেট, হার্ডড্রাইভে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ দেখা যাবে। বাংলাদেশের আইটি খাত একসময় পোশাক রফতানি খাতকে ছাড়িয়ে যাবে। ২০২৫ সালে মধ্যে ৫ বিলিয়ন ডলারের আইটি পণ্য রফতানির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে ডিজিটাল বাংলাদেশ।”

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার আধুনিক রূপই মূলত ডিজিটাল বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রীর রূপকল্পে তা বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। যখন ডিজিটাল বাংলাদেশ ঘোষণা করা হয়, তখন এ সম্পর্কে মানুষের ধারণা ছিল অস্পষ্ট। অনেকে এ নিয়ে হাসি-তামাশাও করেছেন। তবে এর বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ধারণা বদলাতে শুরু করে। বর্তমানে মানুষের আর্থ-সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনে ডিজিটাল বাংলাদেশ এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
২০০৮ সালে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৮ লাখ। তখন ব্যান্ডইউথের ব্যবহার ছিল প্রতি সেকেন্ডে ৮ গিগাবাইট (জিবিপিএস)। আর আগস্টে দেশে ২৬ হাজার ৪৯ জিবিপিএস ব্যান্ডইউথ ব্যবহারের রেকর্ড হয়েছে। বাংলাদেশ টেলিকমিউনিউকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন সাড়ে ১৩ কোটির বেশি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। এর মধ্যে মোবাইল ফোনে প্রায় সাড়ে ১২ কোটি ও ব্রডব্যান্ড ও পিএসটিএনে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন প্রায় ১ কোটি। ২০০৮ সালে দেশে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী ছিল প্রায় ৫৬ লাখ। এখন দেশে সক্রিয় মোবাইল সিমের সংখ্যা ১৮ কোটি ৬০ লাখেরও বেশি। তখন দেশে ২ জি মোবাইল নেটওয়ার্ক ছিল। আর এখন থ্রিজি, ফোরজির পর এই বছরই চালু হয়েছে ৫জি নেটওয়ার্ক। ২০০৮ সালে প্রতি এমবিপিএস ইন্টারনেট ব্যান্ডইউথের মূল্য ছিল ৭৮ হাজার টাকা। এখন তা মাত্র ৬০ টাকা। ইনফো সরকার প্রকল্পের ফাইবার অপটিক ক্যাবলের মাধ্যমে ইউনিয়ন পর্যায়ে ও বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর মাধ্যমে দুর্গম ৭৭২ এলাকাকে ইন্টারনেট সেবার আওতায় আনা হয়েছে। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও এখন ব্যক্তিগত যোগাযোগ থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সব কিছুতেই মোবাইল ও কম্পিউটারে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটে-১ এ ২৬টি কে-ইউ ব্যান্ড এবং ১৪টি সি ব্যান্ড ট্রান্সপন্ডার রয়েছে। দেশের সব অঞ্চল, বঙ্গোপসাগরের জলসীমা, ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া এর কভারেজের আওতায় রয়েছে। দেশের টেলিভিশন চ্যানেল ও ডিটিএইচ সেবায় বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ব্যবহার করায় বছরে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে। এছাড়া হন্ডুরাস, তুরস্ক, ফিলিপাইন, ক্যামেরুন ও দক্ষিণ আফ্রিকার কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলের ট্রান্সপন্ডার ব্যবহার করছে। দেশে পার্বত্য, হাওড় ও চরাঞ্চলে উচ্চগতিসম্পন্ন ইন্টারনেট সুবিধা দেয়া হচ্ছে এ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে। বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় মোবাইল নেটওয়ার্ক অচল হয়ে পড়লেও বিকল্প হিসেবে কাজ করবে এ স্যাটেলাইট।
ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশ। মূলত এটি একটি ধারণাপত্র ও কর্মকৌশল- যা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত হচ্ছে ও হবে বর্তমান সরকার কর্তৃক। ২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বর ‘ভিশন-২০২১’-এর মূলভিত্তি হিসেবে ডিজিটাল বাংলাদেশের ঘোষণা দেওয়া হয়। ব্যাপক ও বহুমুখী উন্নয়নে একের পর এক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়ন শুরু করা হয় একইসঙ্গে একাধিক মেগা প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে। নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী সরকার ইতোমধ্যে সারাদেশে ব্রডব্যান্ড কানেক্টিভিটি দিয়েছে এবং স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ উৎক্ষেপণ করেছে মহাকাশে। দ্বিতীয় স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-২ এর কাজ চলছে। বর্তমানে ১৭ কোটি মানুষের হাতে ১৮ কোটি ৬০ লাখ মোবাইল সিম ব্যবহৃত হচ্ছে ১৩ কোটি মানুষ ইন্টারনেটের সাথে সংযুক্ত ব্রডব্যান্ড ও মোবাইল ইন্টারনেটের মাধ্যমে।
আজ-কালকার যুগ হচ্ছে ডিজিটাল যুগ। ডিডজিটাল বাংলাদেশ আমরা সরকার বাস্তবায়ন করেছে। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ফাইবার অপটিক দেওয়া হয়েছে। অনলাইনে যোগাযোগ করা যায়। আমাদের করোনা মোকাবিলায় সবচেয়ে কাজে লেগেছে ডিজিটাল সিস্টেম। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ আমরা উৎক্ষেপণ করার মাধ্যমে বাংলাদেশের ডিজিটাল কার্যক্রম আরো বেগবান হয়েছে। কাজেই আমাদের সব কাজেই এখন ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করতে হবে।
আজকে মানুষ যে প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, বলতে গেলে প্রযুক্তির মাধ্যমে পুরো বিশ্বটা সবার হাতের নাগালে চলে এসেছে। মানুষ বিশ্বকে জানার সুযোগ পাচ্ছে। বাংলাদেশ এখন আর অন্ধকারে পড়ে থাকছে না। আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা বিশ্বে এখন অবদান রাখছে। এটা প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় অবদান। প্রযুক্তির সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে বলা যায় যথেষ্ট সফল হয়েছি। সেই সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর যে গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছিলো সেখানে বাংলাদেশ যথেষ্ট সফলতা পেয়েছে। স্মার্ট বাংলাদেশ ও স্মার্ট জাতি গঠনই সরকারের পরবর্তী লক্ষ্য জানিয়েছেন নীতি নির্ধারকবৃন্দ। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য পূরণে অত্যধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। দেশকে ‘স্মার্ট বাংলাদেশে’ পরিণত করতে ডিজিটাল সংযোগই প্রধান হাতিয়ার হবে আমাদের সামনে।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ ১৯৭৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ১৫টি সংস্থার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন-আইটিইউ এর সদস্য পদ লাভ করে। আর্থ-সামাজিক জরিপ, আবহাওয়ার তথ্য আদান-প্রদানে আর্থ-রিসোর্স টেকনোলজি স্যাটেলাইট প্রোগ্রাম বাস্তবায়িত হয় তাঁরই নির্দেশে। ১৯৭৫ সালের ১৪ জুন বঙ্গবন্ধু বেতবুনিয়ায় স্যাটেলাইটের আর্থ-স্টেশনের উদ্বোধন করেন। বিজ্ঞান, প্রযুক্তিবিদ্যা ও কারিগরি শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে ড. মুহম্মদ কুদরাত-এ-খুদার মতো একজন বিজ্ঞানীর নেতৃত্বে শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট প্রণয়ন এবং শিক্ষায় প্রযুক্তি ব্যবহার করার লক্ষ্য বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা ছিল তাঁর অত্যন্ত সুচিন্তিত ও দূরদর্শী উদ্যোগ। শুধু তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সম্প্রসারণ ও বিকাশে গৃহীত নানা উদ্যোগ ও কার্যক্রমের দিকে তাকালে দেখা যাবে বঙ্গবন্ধুর হাত ধরেই রচিত হয় একটি আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশের ভিত্তি, যা বাংলাদেশকে ডিজিটাল বিপ্লবে অংশগ্রহণের পথ দেখায়।
ডিজিটাল পণ্য বিনিয়োগ ও রপ্তানিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও আশা প্রকাশ করেন আমাদের প্রযুক্তির অগ্রগতি। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার মূল চাবিকাটি হলো ডিজিটাল সংযোগ। স্মার্ট নাগরিক, স্মার্ট অর্থনীতি, স্মার্ট সরকার এবং স্মার্ট সমাজের জন্যে ডিজিটাল সংযোগ মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। সরকার বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট, ভার্চুয়াল বাস্তবতা, উদ্দীপিত বাস্তবতা, রোবোটিকস অ‌্যান্ড বিগ-ডাটা সমন্বিত ডিজিটাল প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতের মাধ্যমে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করতে চায়। তরুণ প্রজন্ম এখন ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন দেখছে। ২০১৮ সালে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ কক্ষপথে উৎক্ষেপণ করার পর, সম্প্রচার ও টেলিযোগাযোগ খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে।
স্যাটেলাইটের অব্যবহৃত ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করে বাংলাদেশ প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে এবং বাংলাদেশ এখন বিশ্বের স্যাটেলাইট পরিবারের ৫৭তম গর্বিত সদস্য। ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্যে বহুমুখী কার্যক্ষমতা সম্পন্ন বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ স্থাপনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ২০২৪ সালের মধ্যে তৃতীয় সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপন করতে যাচ্ছে। কারণ, ইতিমধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপন করা হয়েছে। বাংলাদেশ এ পর্যন্ত ৩৪০০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ ক্ষমতা অর্জন করেছে। ২০২৩ এর শেষ দিকে ব্যান্ডউইথের সক্ষমতা ৭২০০ জিবিপিএসে উন্নীত করা হবে। তৃতীয় সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের পর এটি ১৩,২০০ জিবিপিএসে উন্নীত হবে। সৌদি আরব, ফ্রান্স, মালয়েশিয়া ও ভারতকে ব্যান্ডউইথ লিজ দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রতি বছর ৪.৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করছে। সারা দেশে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল স্থাপন করা হয়েছে। এদিকে, প্রতিটি ইউনিয়নে ১০ গিগাবাইট ক্ষমতা নিশ্চিত করা হয়েছে যা জনগণ ও সরকারি অফিসগুলোতে উচ্চ গতির ইন্টারনেট সরবরাহ করতে সহায়তা করছে। সারা দেশে মোট ৮৬০০টি পোস্ট অফিসকে ডিজিটাল করা হয়েছে।
গ্রামীণ ও শহরাঞ্চলের মধ্যে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের ডিজিটাল বৈষম্য এবং দামের পার্থক্য দূর করার কাজ শুরু হয়েছে। প্রত্যন্ত এবং দুর্গম এলাকায় টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার সারা দেশে এক দেশ এক রেটের একটি সাধারণ শুল্ক চালু করা হয়েছে। সারাদেশে বৈষম্যহীন এক দেশ এক রেট শুল্ক ব্যবস্থা চালু করার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ অ্যাসোসিও (এএসওসিআইও)-২০২২ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে।
সরকার স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য ৪টি ভিত্তি সফলভাবে বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে। এগুলো হলো- স্মার্ট সিটিজেন, স্মার্ট ইকোনমি, স্মার্ট গভর্নমেন্ট ও স্মার্ট সোসাইটি। এর পাশাপাশি হাতে নেওয়া হয়েছে ২১০০ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা কেমন হবে- সেই পরিকল্পনা। স্মার্ট বাংলাদেশে সব কাজ, সম্পাদন করা হবে প্রযুক্তির মাধ্যমে। যেখানে প্রত্যেক নাগরিক প্রযুক্তি ব্যবহারে হবে দক্ষ।
এর মাধ্যমে পরিচালিত হবে সার্বিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম- যার চূড়ান্ত লক্ষ্য ক্যাশলেস সোসাইটি। সরকার ইতোমধ্যে দেশে দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, আইসিটি অবকাঠামো ও কানেক্টিভিটি, ই-গভর্নমেন্ট এবং ইন্ডাস্ট্রি প্রমোশনের ক্ষেত্রে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-২ উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি নিয়েছে। ২০২৫ সালের মধ্যে শতভাগ সরকারি সেবা অনলাইনে প্রদানের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। দেশে স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা হয়েছে। এর জন্য জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ করা হয়েছে আলাদা তহবিল।
এর পাশাপাশি আইডিয়া প্রকল্প, বঙ্গবন্ধু ইনোভেশন গ্রান্ট (বিগ), শতবর্ষের শত আশা এবং স্টার্টআপ সার্কেল সৃষ্টি করে অনুদান দেওয়া হচ্ছে। বিনিয়োগের জন্য স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড নামে সরকার ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কোম্পানি পরিচালনার নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। সাইবার নিরাপত্তা সূচকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া ও সার্ক দেশগুলোর মধ্যে প্রথম অবস্থানে রয়েছে। সরকার ইতোমধ্যে দেশের গ্রামগুলোকে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত শহর হিসেবে গড়ে তোলার নীতি নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। যেখানে গ্রামের প্রকৃতি ও পরিবেশ সর্বোপরি চাষাবাদ-ফলমূল-সবজির বাগান-খামারের পাশাপাশি পাওয়া যাবে গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানিসহ তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা। তবে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলা এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রত্যেক নাগরিকেরও সবিশেষ দায়িত্ব ও করণীয় রয়েছে।
প্রত্যেক নাগরিককে দক্ষ মানব সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে নিজেকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবিলার উপযোগী করে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি যার যার অবস্থান থেকে দায়বদ্ধ থাকতে হবে। তা না হলে স্মার্ট বাংলাদেশের সুফল পাওয়া যাবে না সর্বাংশে ও সর্বতোভাবে।
স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে স্মার্ট নাগরিক প্রয়োজন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজকের তরুণ-তরুণী ও শিশুদের মানবিক গুণাবলীসম্পন্ন হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। স্মার্ট বাংলাদেশের লক্ষ্য স্মার্ট জনগোষ্ঠী তৈরি। নতুন প্রজন্ম যেন মানবিক ও অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল অনুভব নিয়ে গড়ে উঠে সেজন্য নজর দিতে হবে। সবাইকেই মানবিক গুণাবলীসম্পন্ন হতে হবে। যারা প্রতিবন্ধী বা অক্ষম তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা কম্পিউটার শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছি। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার জন্য দরকার স্মার্ট জনগোষ্ঠী। শিশুকাল থেকেই যেন তারা তা শিখতে পারে, তার ব্যবস্থা আমরা নিয়েছি। প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের কম্পিউটারের কোডিং পদ্ধতি শিখানোর কার্যক্রম ‘লারলিং অ্যাপ্রোচ’ প্রয়োগের মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের দক্ষতা বিকাশের উদ্যোগও আমরা গ্রহণ করেছি। এভাবেই একদিকে আমরা যেমন শিশুদের শিক্ষা ও দক্ষ হওয়ার ব্যবস্থা নিয়েছি, আজকের নতুন প্রজন্ম হবে আগামী দিনের স্মার্ট জনগোষ্ঠী। যারা এদেশটাকে গড়ে তুলবে। ২০৪১ সালের মধ্যে স্মার্ট নাগরিক, স্মার্ট জাতি, স্মার্ট অর্থনীতি এবং স্মার্ট সমাজ গঠনে চলমান সংগ্রাম এগিয়ে নেওয়ার বিকল্প নেই। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকারের পাশাপাশি প্রযুক্তির দক্ষতা অর্জনে নতুন প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের অনপ্রাণিত করতে যুবসমাজসহ সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে ডিজিটাল দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে তরুণ জনগোষ্ঠীর আত্ম কর্মসংস্থানের যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তা কাজে লাগাতে হবে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিক্ষা ব্যয়কে খরচ নয়, বিনিয়োগ বলেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণে শেখ হাসিনা প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দেন। ফলশ্রæতিতে বদলে গেছে বাংলাদেশ। বিগত সাড়ে ১৪ বছরে তথ্য প্রযুক্তি খাতে ২০ লাখ তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান হয়েছে। ধারাবাহিক পথ পরিক্রমায় এখন আমরা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছি।
সরকার আগামীর বাংলাদেশকে স্মার্ট বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চায়, যেখানে প্রতিটি জনশক্তি স্মার্ট হবে। সবাই প্রতিটি কাজ অনলাইনে করতে শিখবে, ইকোনমি হবে ই-ইকোনমি, যাতে সম্পূর্ণ অর্থ ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল ডিভাইসে করতে হবে। ‘আমাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মযোগ্যতা’ সব কিছুই ই-গভর্ন্যান্সের মাধ্যমে হবে। ই-এডুকেশন, ই-হেলথসহ সব কিছুতেই ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করা হবে। ২০৪১ সাল নাগাদ আমরা তা করা সক্ষম হব এবং সেটা মাথায় রেখেই কাজ চলছে।

স্মার্ট বাংলাদেশ গড়বে তরুণ প্রজন্ম
হীরেন পÐিত
আজকের শিক্ষার্থীরাই একদিন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তুলবে। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের অঙ্গীকার সফলভাবে বাস্তবায়নের পর বাংলাদেশ এখন নতুন কর্মসূচি নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি বাস্তবায়ন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে নিরলস কাজ করছেন। স্মার্ট সিটিজেন, স্মার্ট ইকোনমি, স্মার্ট গভর্নমেন্ট এবং স্মার্ট সোসাইটি এই চারটি মূল ভিত্তির ওপর গড়ে উঠবে ২০৪১ সাল একটি সাশ্রয়ী, টেকসই, বুদ্ধিদীপ্ত, জ্ঞানভিত্তিক, উদ্ভাবনী স্মার্ট বাংলাদেশ।
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন বিষয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তিনি যুব সমাজের উন্নয়নে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার কথা বলেছেন, এর গুরুত্ব বর্তমানেও অধিক। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব উপযোগী দক্ষ যুবশক্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও বঙ্গবন্ধুর যুবভাবনা ও চিন্তাচেতনা প্রাসঙ্গিক। যুবসমাজ নিয়ে বঙ্গবন্ধুর অনেক ভাবনা ও স্বপ্ন ছিল। তিনি ভাবতেন যুব সমাজের প্রতিটি সদস্যকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তারাই হয়ে ওঠবে এক আদর্শবান শক্তি। এই আদর্শ মানুষ বলতে তিনি এমন ব্যক্তিকে বুঝিয়েছেন, যে উন্নত মানবিক গুণাবলি ধারণ করবে ও অন্যের জন্য অনুসরণযোগ্য হবে। অর্থাৎ সামাজিকভাবে যা কিছু ভালো শ্রেষ্ঠ, মহৎ ও কল্যাণকর সব কিছুই থাকবে যুবসমাজের প্রতিটি সদস্যের মধ্যে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ যুব ও তরুণসমাজ। বর্তমান লোকসংখ্যার হিসাবে দেশে সাড়ে ৪ কোটির বেশি তরুণ ও তরুণী রয়েছে।
আদর্শ মানুষ হতে হলে সবার ভেতর যেসব গুণ থাকা দরকার সেগুলো হলো-সততা, নিষ্ঠা, পরিশ্রমী ও পরোপকারী মনোভাব, মানবদরদি-সহমর্মিতা, নির্লোভ-নিরহংকার এবং সাহস। বঙ্গবন্ধু নিজে ছিলেন একজন আদর্শবাদী মানুষ। বাংলার শোষিত-নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের মুক্তিই ছিল তার জীবনের মূল লক্ষ্য ও আদর্শ। যে লক্ষ্য বাস্তবায়নে তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন।
বাংলার মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বার বার জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন। জেল-জুলুম ও নিপীড়ন তাঁর জীবনে এক নিয়মিত অধ্যায়ে পরিণত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর চিন্তাচেতনা, ধ্যান-স্বপ্ন ও কর্ম সবই ছিল এ দেশের মানুষের মঙ্গল ও কল্যাণের জন্য, দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য। ভোগ নয়, রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধু ছিলেন ত্যাগের আদর্শ উদাহরণ। তিনি রাজনীতিতে নীতি-আদর্শকে সর্বোচ্চ স্থান দিতেন। তাঁর রাজনীতির লক্ষ্য নিছক ক্ষমতায় যাওয়া ছিল না, ছিল বাঙালির অধিকার আদায় বা জাতীয় মুক্তি অর্জনে নির্দেশিত। তিনি বিশ্বাস করতেন যুবসমাজকে এই ক্ষমতায় বলীয়ান হতে হবে।
বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে বেছে নিয়েছিলেন। এই আদর্শকে তিনি রাষ্ট্রীয় আদর্শেও পরিণত করেছিলেন। তিনি মনে করতেন বাংলাদেশ একটি আদর্শ রাষ্ট্র হবে, যে রাষ্ট্রের ভিত্তি থাকবে গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। এর আলোকে ১৯৭২-এর সংবিধানে রাষ্ট্রের চার মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয় জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে।
বাংলাদেশের জাতীয় যুবনীতিতে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের ‘যুব’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। যুবসমাজকে একটি জাতির স্তম্ভ, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও উন্নয়নের কারিগর বলা যেতে পারে। যুবকরা শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্তিশালী, জাগ্রত জ্ঞানের অধিকারী এবং রাষ্ট্র-সমাজের পরিবর্তন-সংগ্রামের অগ্রনায়ক।
মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবন উৎসর্গকারীদের বিশাল একটি অংশ ছিল যুবক। যুবক শেখ মুজিবুর রহমানের পাঠশালা ছিল বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশ। বাঙালির হাজার বছরের আশা-আকাক্সক্ষা, বেদনা-বিক্ষোভ ও ঐতিহ্যকে তিনি নিজের চেতনায় আত্মস্থ করেছিলেন। বাংলার যুবকরা ছিল তার প্রাণ।
যুবকদের ওপর ভর করেই বঙ্গবন্ধু এঁকেছিলেন সাফল্যের নকশা। এ দেশের যুবসমাজ যেন নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারে, কর্মমুখী হতে পারে, দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হয়ে সোনার বাংলা গড়তে পারে, আজীবন তিনি তাই কামনা করেছেন।
যুবসমাজকে যথাযথভাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন শিক্ষার ওপর। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন গণমুখী, বিজ্ঞানভিত্তিক ও কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থা। তিনি যুবকদের পড়ালেখার পাশাপাশি বিভিন্ন দায়িত্ব-কর্তব্য পালনের তাগিদ দিতেন। ১৯৭৩-এ ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বক্তৃতায় তিনি বলেছেন-“বাংলার মানুষ, বিশেষ করে তরুণ সম্প্রদায়কে আমাদের ইতিহাস জানতে হবে। বাংলার যে ছেলে তার অতীত বংশধরদের ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারে না, সে ছেলে সত্যিকারের বাঙালি হতে পারে না।”
বর্তমান চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের জন্য প্রয়োজন প্রযুক্তি-রোবটিকস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আইওটি জানা দক্ষ যুবসমাজ গড়ে তোলা। তবে এক্ষেত্রে কৃত্রিম চেতনা ও মনোভাবের প্রজন্ম যেন গড়ে না ওঠে, সে ব্যাপারে অধিক সচেতনতা প্রয়োজন। বঙ্গবন্ধুর ভাবনায় খাঁটি-দক্ষ, সৎ ও বাঙালি চেতনায় উদ্বুদ্ধ দেশপ্রেমী যুবসমাজই হলো দেশের সম্পদ।
২০১৮ সালের আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে যেসব অঙ্গীকারের কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে ২০১৭ সালে প্রণীত জাতীয় যুবনীতির কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীন পৃথক যুব বিভাগ ও একটি গবেষণাকেন্দ্র গঠন এবং মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি। যুবকদের কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি শিক্ষা, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা ছাড়াও চলমান জাতীয় সেবা-কর্মসূচির ক্ষেত্রকে প্রসারিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এসব নির্বাচনী অঙ্গীকার নিঃসন্দেহে খুব আকর্ষণীয় ও উৎসাহব্যঞ্জক। এই অঙ্গীকার তরুণ ও যুবসমাজেন ক্ষমতায়নে আরো ব্যাপক ভ‚মিকা রাখবে। তবে এমন একটি জাতীয় পরিকল্পনা থাকা উচিত, যাতে একজন শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষে সহজেই কাজ খুঁজে পায়। কর্মধর্মী শিক্ষা-পরিকল্পনা তরুণদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও কর্মের ব্যবস্থা করতে সহায়ক হবে। তরুণসমাজকে অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ ও রক্ষা করতে হবে। সেই চেতনার সঙ্গে কোনো আপস নেই। অনেক কারণেই তরুণরা দেশের জন্য অসীম শক্তি হিসেবে বিবেচিত। সেই শক্তি দেশের উন্নয়ন ও সঠিক পথে দেশকে এগিয়ে নেয়ার জন্য কাজে লাগাতে হবে।
বাংলাদেশের সকল আন্দোলন-সংগ্রাম ও অগ্রগতির পথে এ দেশের যুব সমাজের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। মহান ভাষা আন্দোলন হতে স্বাধীনতা সংগ্রামসহ এদেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় যুবরা যেমন জীবন উৎসর্গ করতে কার্পণ্য করেনি, তেমনি অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামেও তারা নিরলসভাবে ব্যাপৃত। বিশ্বব্যাপী ‘কোভিড-১৯’ মহামারির সময়েও আমাদের যুবসমাজের কর্মস্পৃহা আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে সচল রেখেছে।
তারুণ্য হলো মানুষের জীবনে সাহস, সংগ্রাম ও সৃজনশীলতার সময়। পুরাতনকে ভেঙে সংস্কার করে নতুন কিছু করা যেন তারুণ্যের ধর্ম। সমাজের এই সংস্কারকাজে তরুণ সমাজকে সাহস ও সততার সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। তরুণেরা সমাজের সর্বস্তরে পরিবর্তনের বিপ্লব শুরু করবে এবং এক্ষেত্রে তরুণ সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই সবচেয়ে কার্যকর।
আমাদের দেশের তরুণদের অর্জন অনেক। খেলাধুলা, শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে তরুণেরা এগিয়ে যাচ্ছে। আজকের তরুণ সমাজই ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারক। তাই রাষ্ট্র ও সমাজের সব কল্যাণমূলক কাজে যুবসমাজের অংশগ্রহণ আবশ্যক। তরুণ সমাজ ঘুমিয়ে থাকলে অনিয়ম-দুর্নীতিতে নিমজ্জিত সমাজের আকাশ থেকে কখনো কালো মেঘের ছায়া সরবে না।
বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উনয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশে পরিণত হওয়ার জন্য প্রতিশ্রæতিবদ্ধ। তবে এজন্য আমাদের কর্মসংস্থানের দিকে অধিক নজর দিতে হবে। সরকারি দল, বিরোধী দল, নাগরিক সমাজসহ সমাজের প্রত্যেকেরই কর্মসংস্থান সৃষ্টির দায়িত্ব রয়েছে। চাকরি সৃষ্টি একটি বড় চ্যালেঞ্জ; দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে ত্রæটিমুক্ত ও দুর্নীতিমুক্ত রেখে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা শ্রমবাজারে দক্ষ ও শিক্ষাগতভাবে যোগ্য কর্মীর চাহিদা মেটাতে পারছে না।
সরকার ইতিমধ্যে অনেক সুচিন্তিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষাকে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যুগোপযোগী করতে কারিগরি শিক্ষা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে অধিকতর বিনিয়োগের প্রচেষ্টা চলছে। তরুণদের চাকরির পাশাপাশি উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবণতা ও আত্মকর্মসংস্থান বৃদ্ধিও ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সরকার আগামীর বাংলাদেশকে স্মার্ট বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চায়, যেখানে প্রতিটি জনশক্তি স্মার্ট হবে। সবাই প্রতিটি কাজ অনলাইনে করতে শিখবে, ইকোনমি হবে ই-ইকোনমি, যাতে সম্পূর্ণ অর্থ ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল ডিভাইসে করতে হবে। আমাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মযোগ্যতা সব কিছুই ই-গভর্ন্যান্সের মাধ্যমে হবে। ই-এডুকেশন, ই-হেলথসহ সব কিছুতেই ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করা হবে। ২০৪১ সাল নাগাদ আমরা তা করা সক্ষম হব এবং সেটা মাথায় রেখেই কাজ চলছে।
আমাদের তরুণ সম্প্রদায় যত বেশি এই ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করা শিখবে, তারা তত দ্রæত দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের নানা অনুষঙ্গ ধারণ করে তরুণদের প্রশিক্ষিত করে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষায়িত ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। এ ধরনের ৫৭টি ল্যাব প্রতিষ্ঠার কাজ চলছে। ৬৪টি জেলায় শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবিশন সেন্টার স্থাপন এবং ১০টি ডিজিটাল ভিলেজ স্থাপনের কার্যক্রম চলছে। ৯২টি হাই-টেক পার্ক, সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কের নির্মাণ করা হচ্ছে। সারা দেশে ৮৬৮৬টি ডিজিটাল সেন্টার এবং ১৩ হাজারের বেশি শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশে রূপান্তরিত করেছেন। সামনের স্মার্ট বাংলাদেশও শেখ হাসিনার সরকার করার লক্ষ্যে কাজ করছেন। ২০০৮ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের বলেছিলেন ডিজিটাল বাংলাদেশ দেবেন। আজ বাংলাদেশ ডিজিটাল বাংলাদেশ হয়েছে। তিনি যে স্মার্ট বাংলাদেশের কথা বলছেন, সেটির জন্যও তিনি নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
প্রযুক্তি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সংস্কৃতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে শুরু করে অনেক আগে থেকেই। বিজ্ঞান, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ফলে বিশ্বে উন্নয়ন দারুণ গতি পায়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর গুরুত্ব গভীরভাবে উপলব্ধি করেন। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সময় পান মাত্র সাড়ে তিন বছর। এই সময়ে প্রজ্ঞাবান ও বিচক্ষণ রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিসহ এমন কোনো খাত নেই যেখানে পরিকল্পিত উদ্যোগ ও কার্যক্রমের বাস্তবায়ন করেননি।
২০২১ সালে স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশ ‘ডিজিটাল বাংলাদেশে’ পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ, যার যাত্রা হয়েছিলো ২০০৮ সালে। আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির প্রসারে বাংলাদেশ আজ বিপ্লব সাধন করেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন আর স্বপ্ন নয়, বাস্তবতায় পরিপূর্ণতা পেয়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের জন্য সবার জন্য কানেক্টিভিটি, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, ই-গভর্নমেন্ট এবং আইসিটি ইন্ডাস্ট্রি প্রমোশন এই চারটি সুনির্দিষ্ট প্রধান স্তম্ভ নির্ধারণ করে ডিজিটাল বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে ২০৪১ সালের স্মার্ট বাংলাদেশের অভিযাত্রায়। দেশে বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩ কোটির বেশি এবং মোবাইল সংযোগের সংখ্যা ১৮ কোটি ৬০ লাখেরও উপরে।
জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে বর্তমানে সারা দেশে ৮৬৮৬টি ডিজিটাল সেন্টারে প্রায় ১৬ হাজারের বেশি উদ্যোক্তা কাজ করছেন, যেখানে ৫০ শতাংশ নারী উদ্যোক্তা রয়েছেন। এর ফলে একদিকে নারী-পুরুষের বৈষম্য, অন্যদিকে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য ও গ্রাম-শহরের বৈষম্য দূর হচ্ছে। দেশে স্টার্টআপ সংস্কৃতির বিকাশে ও স্টার্টআপদের উদ্ভাবনী সুযোগ কাজে লাগানোর পথ সুগম করতে সরকার আগামী পাঁচ বছরে ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে। মেধাবী তরুণ উদ্যোক্তাদের সুদ ও জামানতবিহীন ইকুইটি ইনভেস্টমেন্ট এবং ট্রেনিং, ইনকিউবেশন, মেন্টরিং এবং কোচিংসহ নানা সুবিধা দেওয়ার ফলে দশে স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে উঠেছে। বিকাশ, পাঠাও, চালডাল, শিওর ক্যাশ, সহজ, পেপারফ্লাইসহ দুই হাজার ৫০০ স্টার্টআপ সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। যারা প্রায় আরো ১৫ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। ১০ বছর আগেও এই কালচারের সঙ্গে আমাদের তরুণরা পরিচিত ছিল না। মাত্র সাত বছরে এই খাতে ৭০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এসেছে।
বিশ্বে অনলাইন শ্রমশক্তিতে ভালো অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। ২০০৯ সালের আগে বাংলাদেশে সরকারি কোনো সেবাই ডিজিটাল পদ্ধতিতে ছিল না। কিন্তু বর্তমানে সরকারি সব দপ্তরের প্রাথমিক সব তথ্য ও সেবা মিলছে ওয়েবসাইটে। সেই সঙ্গে সরকারি সব তথ্য যাচাই-বাছাই ও সংরক্ষণ এবং বিভিন্ন পরিষেবা ও আবেদনের যাবতীয় কার্যক্রম অনলাইনে পরিচালিত হচ্ছে। এরই মধ্যে আমরা ইন্টার-অপারেবল ডিজিটাল ট্রানজেকশন প্ল্যাটফরম ‘বিনিময়’ চালু করা হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে গেছে প্রত্যেক গ্রাহকের হাতের মুঠোয়। ডিজিটাইজেশনের মাধ্যমে অনেক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হচ্ছে। ফ্রিল্যান্সিং থেকে আসা অর্থ আমাদের জাতীয় প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করছে। তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দেশে আধুনিক ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এ সব কিছুই হচ্ছে ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফল।
নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ, ধনী-দরিদ্র-নির্বিশেষে সবার জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার সুনিশ্চিত করা, শহর ও গ্রামের সেবা প্রাপ্তিতে দূরত্ব হ্রাস করার সবই ছিল আমাদের ডিজিটাল বাংলাদেশের মূল উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য। ডিজিটাল বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ফলে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে, ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের মতো উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তাদের কর্মসংস্থানও নিশ্চিত করা গেছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও প্রযুক্তির কল্যাণে এখন গ্রামে বসেই যে কেউ চাইলেই ফ্রিল্যান্সিংয়ে কাজ করতে পারছে। এ সবই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রগতিশীল প্রযুক্তি, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নতির ফলে।
চলছে চতুর্থ বিপ্লবের সময়কাল। যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে মানুষের বুদ্ধি ও ইচ্ছা শক্তি, কারখানার উৎপাদন, কৃষিকাজসহ যাবতীয় দৈনন্দিন কাজকর্ম ও বিশ্ব পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই। প্রস্তুতি চলছে ২০৪১ সালের মধ্যে স্মার্ট বাংলাদেশে তৈরির। কিন্তু স্মার্ট যন্ত্র ও প্রযুক্তির সঙ্গে সঙ্গে নাগরিকদেরও চিন্তা-চেতনা, আচার-আচরণ ও সংস্কৃতিতে হতে হবে স্মার্ট। প্রতিনিয়তই আমরা আমাদের অজান্তে অনেক ভুল-ত্রæটি, অনিয়ম, অন্যায় ও অবিচার করে থাকি, যা একটু ইচ্ছা করলেই সংশোধন করা যায়। অবদান রাখতে পারি স্মার্ট বাংলাদেশ তৈরিতে।
সরকারের পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে ২১০০ সালের ডেল্টা প্ল্যান এবং ২০২১ থেকে ২০৪১ প্রেক্ষিতে পরিকল্পনাও প্রণয়ন করা হয়েছে। অর্থাৎ ২০২১ থেকে ২০৪১ কিভাবে বাংলাদেশের উন্নয়ন হবে তার একটা কাঠামো, পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। এই ব-দ্বীপ প্রজন্মের পর প্রজন্ম যেন জলবায়ুর অভিঘাত থেকে রক্ষা পায়, দেশ উন্নত হয় এবং উন্নত দেশে স্বাধীনভাবে সুন্দরভাবে যেন তারা স্মার্টলি বাঁচতে পারে। সেই ব্যবস্থা করছে সরকার। এখন সব নির্ভর করছে আমাদের নতুন প্রজন্ম বিশেষ করে যুব ও যুব নারীদের বলিষ্ঠ নেতৃত্বেই এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ তাই যুব সমাজের উপর অনেক দায়িত্ব। তারুণ্যের শক্তিই, বাংলাদেশের উন্নতি। এটাই ছিল ছিলো আওয়ামী লীগের ২০১৮ এর নির্বাচনী ইশতেহার। তরুণ যুব সমাজের এই বলিষ্ঠ নেতৃত্ব প্রদানে সক্ষম করে গড়ে তোলার দায়িত্ব সকলের।
বর্তমানে বিশ্ব চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগ, যেখানে প্রকৃতি, প্রযুক্তি এবং মানুষ এক সূত্রে গাঁথা। বঙ্গবন্ধুর জন্ম, বেড়ে ওঠা, শিক্ষা, তথ্য প্রযুক্তি ভাবনা সবই ছিল এক সূত্রে গাঁথা। দেশের শিক্ষা ও তথ্য প্রযুক্তি অবকাঠামো রচনা এবং এ বিষয়ে চিন্তা করতে ভুল করেননি তিনি। ১৯৭১ সালে যখন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের ভিত্তি রচিত হয় তখনই তথ্য ও প্রযুক্তিভিত্তিক বাংলাদেশ তৈরির পটভূমি রচিত হয় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে। দ্রæত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতের বিকাশে তিনি উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষালাভের জন্য পর্যায়ক্রমে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থাপন করা হচ্ছে একের পর এক দৃষ্টিনন্দন একাডেমিক ভবন, শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাবরেটরি, হাইটেক পার্ক ইত্যাদি। শিক্ষা উন্নয়নের এই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি প্রণীত হয়েছে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব উপযোগী, কর্মমুখী, উদ্ভাবনী ও জ্ঞানভিত্তিক বিশ্বমানের শিক্ষা কারিকুলাম, যা এ বছর থেকেই চালু হয়েছে। এছাড়াও শিক্ষা বিস্তারে বিপ্লবী যেসব অগ্রগতি বিশ্ব দরবারে প্রশংসিত হচ্ছে তা হলোÑ সাক্ষরতার হার ৭৫ দশমিক ৬-এ উন্নীত, নারী শিক্ষায় ও সক্ষমতায় অসামান্য অগ্রগতি ইত্যাদি।
বর্তমান বিশ্ব প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়েই অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করে চলেছে। এই বিষয়টি বঙ্গবন্ধু অনুধাবন করতে পেরেছিলেন অনেক আগেই। তিনি চেয়েছিলেন এমন শিক্ষাব্যবস্থা যার মাধ্যমে শুরু থেকেই দেশের ছোট্ট শিশু-কিশোররা সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারে এবং প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের বিষয়ে দক্ষ হয়ে ওঠে। তাই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই ১৯৭২ সালের ২৬ জুলাই বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. কুদরত-ই-খুদার নেতৃত্বে একটি যুগোপযোগী শিক্ষা কমিশন গঠন করেন।
বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের পর একটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশকে তিনি বিদ্যুৎগতিতে উন্নয়নের দুয়ারে পৌঁছে দিয়েছিলেন। বাংলাদেশকে একটি আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক ও উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে বিজ্ঞান চর্চার কোনো বিকল্প নেই তা তিনি শুরু থেকেই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রীয় কাজের শত ব্যস্ততার মাঝেও সারা দেশে শিক্ষাবিদ, গবেষক, বিজ্ঞানী ও শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নানাভাবে অনুপ্রেরণা ও উৎসাহ দেন। দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নতুন নতুন ধারণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে বিজ্ঞানীদের মনোনিবেশ করতে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
১৯৭৩ সালের ১৯ আগস্ট সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছাত্রলীগের জাতীয় সম্মেলনে তিনি বিএ, এমএ পাসের পরিবর্তে বুনিয়াদি শিক্ষা নিয়ে তথা কৃষি স্কুল ও কলেজ এবং ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল ও কলেজে শিক্ষা নিয়ে সত্যিকারের মানুষ হওয়ার উপদেশ দেন। তিনি জানতেন, সোনার মানুষ গড়তে হলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার বিকল্প নেই। বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করেছিলেন, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী ও বিজ্ঞানমুখী করতে হলে এমন একজন প্রথিতযশা বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদকে দায়িত্ব দিতে হবে, যেন তিনি একটি বিজ্ঞাননির্ভর আধুনিক, যুগোপযোগী শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে পারেন। তাই তিনি প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ ড. কুদরত-এ-খুদাকে চেয়ারম্যান করে ১৯৭২ সালে প্রথম শিক্ষা কমিশন ‘জাতীয় শিক্ষা কমিশন’ গঠন করেন।
বঙ্গবন্ধু প্রকৃতপক্ষে একজন বাস্তববাদী ও দূরদর্শী রাজনীতিবিদ ও নীতি-নির্ধারক ছিলেন। তিনি আধুনিক, বিজ্ঞান-প্রযুক্তিনির্ভর ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রত্যেকটি সেক্টরে উন্নয়নের গোড়াপত্তন করে গিয়েছিলেন। আজকের বাংলাদেশে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে যেটুকু অগ্রগতি হয়েছে, তার বেশিরভাগ যাত্রা শুরু হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর হাত ধরেই। একজন রাজনীতিবিদ যে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ভাবনায় বা দৃষ্টিভঙ্গিতে আধুনিক ও স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন, তার প্রমাণ আমরা তার কর্মে দেখতে পাই। এদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অগ্রগতি ও উন্নয়নে বঙ্গবন্ধুর বিজ্ঞান ভাবনা ও অবদান বাঙালি জাতির কাছে নিঃসন্দেহে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু দেশ গঠনে উচ্চশিক্ষাকে গুরুত্ব দেন। প্রাথমিক থেকে শুরু করে কারিগরি শিক্ষার প্রতিও সমভাবেই গুরুত্ব দেন তিনি। একটি ‘জ্ঞানভিত্তিক সমাজ’ বিনির্মাণে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ করেছি সে দর্শনটাও মানুবমক্তির দর্শন, বৈষম্যহীন অর্থনীতি-সমাজ বিনির্মাণের দর্শন’। প্রযুক্তিগত দিকে থেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা দেখতে পাই ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নে (আইটিইউ) বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভ। আইটিইউ স্যাটেলাইট অরবিট বা ফ্রিকোয়েন্সি বরাদ্দ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বিধিমালা তৈরি এবং এর বরাদ্দে সহযোগিতা দেওয়া ও সমন্বয়ের কাজ করে থাকে এবং অন্যটি হচ্ছে, বেতবুনিয়ায় ভূউপগ্রহ কেন্দ্র স্থাপন। ১৯৭৫ সালের ১৪ জুন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বেতবুনিয়া ভূউপগ্রহ উদ্বোধন করেন।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয় তখন বিশ্বে তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের যুগ চলছিল। বঙ্গবন্ধু দেখলেন তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের সম্ভাবনা ও সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইউরোপ এবং এশিয়ার অনেক দেশ উন্নতির শিখরে পৌঁছে যাচ্ছে। পাশাপাশি ১৯৬৯ সালে ইন্টারনেট আবিষ্কার এ বিপ্লবের গতি, প্রভাব ও ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করে দেয়। জাপান, চীন, কোরিয়াসহ এশিয়ার কয়েকটি দেশ তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের আবির্ভাব থেকে সৃষ্ট সুযোগকে কাজে লাগাতে শুরু করে।
অফিসের কাজ, ব্যবসা, লেনদেন, কৃষি, চিকিৎসা, শিক্ষাক্ষেত্রসহ প্রাত্যহিক জীবনের বহু কাজ কত দ্রæত আর সহজেই হয়ে যাচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে। আমরা এখন এতটাই তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর হয়ে গেছি যে, একটা দিনও আমরা তথ্যপ্রযুক্তি ছাড়া চলতে পারি না। আমরা এখন যা বুঝতে পারছি বঙ্গবন্ধু তা অনুধাবন করেছিলেন বহু বছর আগেই। শিক্ষাকে কোনো শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একে সর্বজনীন করে দেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুর প্রচেষ্টা ছিল লক্ষ্যনীয়। তিনি মনে করতেন শিক্ষা হবে অভিন্ন, গণমুখী ও সর্বজনীন অর্থাৎ সবার জন্য শিক্ষা। কেউ নিরক্ষর থাকবে না, সবাই হবে সাক্ষর।
বঙ্গবন্ধুর এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিরলসভাবে ভূমিকা পালন করে চলেছেন তাঁর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয়। নিদর্শনস্বরূপ আমরা দেখতে পাই যখন বাংলাদেশ বিশ্বের ৫৭তম যোগাযোগ উপগ্রহের মালিকানা লাভ করে। এই স্যাটেলাইটের নাম দেওয়া হয় ‘বঙ্গবন্ধু-১’। ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধু-২ স্যাটেলাইটের কার্যক্রম সফলভাবে চলছে, যা এ বছরেই উৎক্ষেপণ করার কথা রয়েছে।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ আবারো সরকার গঠন করলে প্রযুক্তিভিত্তিক উন্নয়নে গুরুত্ব দেয়া হয়। তখন কম্পিউটারের ওপর থেকে শুল্ক প্রত্যাহার, একচেটিয়া বাজার ভাঙতে নতুন মোবাইল ফোন কোম্পানির লাইসেন্স দেয়াসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়। এরপর ২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ‘দিন বদলের সনদে’ ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের রূপকল্প ঘোষণা করা হয় এবং ক্ষমতায় এসে শুরু হয় তা বাস্তবায়নের পালা।
ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রথম লক্ষ্য হলো একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ডিজিটাল সমাজ গড়ে তোলার মাধ্যমে এর সুফল বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেয়া। আগামী দিনের নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পাশাপাশি সহযোগী হতে হবে। সমস্যার সমাধান ও উদ্ভাবনের পথে একযোগে কাজ করতে হবে, তাহলেই বাংলাদেশের পক্ষে এগিয়ে যাওয়া অনেক সহজ হবে। ‘চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় সম্প্রতি উল্লেখ করেছেন ‘চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের’ নেতৃত্ব দেওয়ার মতো সক্ষমতা আমাদের আছে। আর তাই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, বøক চেইন, আইওটি, ন্যানো টেকনোলজি, বায়োটেকনোলজি, রোবটিকস, মাইক্রোপ্রসেসর ডিজাইনের মতো ক্ষেত্রগুলোতে বাংলাদেশ জোর দিয়েছে। নতুন উদ্ভাবনের পথে একযোগে কাজ করতে হবে, তাহলেই আমরা এগিয়ে যাবো।’
দেশে তথ্যপ্রযুক্তিখাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য বিশ্বমানের হাইটেক পার্ক নির্মাণ করা হয়েছে। এসব পার্কে বিনিয়োগে কর অব্যাহতি, বিদেশিদের জন্য শতভাগ মালিকানার নিশ্চয়তা, আয়কর অব্যাহতিসহ নানা সুযোগ আছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অনেক ধরনের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। যারা ফ্যাক্টরি বা তথ্য প্রযুক্তিখাতে বিনিয়োগে অবকাঠামো সুবিধা নিতে চান তারা এখানে বিনিয়োগ করতে পারেন। দেশে বর্তমানে স্যামসাংসহ কয়েকটি কোম্পানি পণ্য উৎপাদন শুরু করেছে। বাংলাদেশ বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম কনজুমার মার্কেট, এখানে বিশাল মধ্যবিত্ত শ্রেণি রয়েছে। এখানে স্টার্টআপদের জন্য বিশাল সুযোগ রয়েছে। তিনি বিশ^াস করেন, আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে মেড ইন চায়না বা ভিয়েতনামের মতো বাংলাদেশের তৈরি মোবাইল হ্যান্ডসেট, হার্ডড্রাইভে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ দেখা যাবে। বাংলাদেশের আইটি খাত একসময় পোশাক রফতানি খাতকে ছাড়িয়ে যাবে। ২০২৫ সালে মধ্যে ৫ বিলিয়ন ডলারের আইটি পণ্য রফতানির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে ডিজিটাল বাংলাদেশ।”

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার আধুনিক রূপই মূলত ডিজিটাল বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রীর রূপকল্পে তা বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। যখন ডিজিটাল বাংলাদেশ ঘোষণা করা হয়, তখন এ সম্পর্কে মানুষের ধারণা ছিল অস্পষ্ট। অনেকে এ নিয়ে হাসি-তামাশাও করেছেন। তবে এর বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ধারণা বদলাতে শুরু করে। বর্তমানে মানুষের আর্থ-সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনে ডিজিটাল বাংলাদেশ এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
২০০৮ সালে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৮ লাখ। তখন ব্যান্ডইউথের ব্যবহার ছিল প্রতি সেকেন্ডে ৮ গিগাবাইট (জিবিপিএস)। আর আগস্টে দেশে ২৬ হাজার ৪৯ জিবিপিএস ব্যান্ডইউথ ব্যবহারের রেকর্ড হয়েছে। বাংলাদেশ টেলিকমিউনিউকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন সাড়ে ১৩ কোটির বেশি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। এর মধ্যে মোবাইল ফোনে প্রায় সাড়ে ১২ কোটি ও ব্রডব্যান্ড ও পিএসটিএনে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন প্রায় ১ কোটি। ২০০৮ সালে দেশে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী ছিল প্রায় ৫৬ লাখ। এখন দেশে সক্রিয় মোবাইল সিমের সংখ্যা ১৮ কোটি ৬০ লাখেরও বেশি। তখন দেশে ২ জি মোবাইল নেটওয়ার্ক ছিল। আর এখন থ্রিজি, ফোরজির পর এই বছরই চালু হয়েছে ৫জি নেটওয়ার্ক। ২০০৮ সালে প্রতি এমবিপিএস ইন্টারনেট ব্যান্ডইউথের মূল্য ছিল ৭৮ হাজার টাকা। এখন তা মাত্র ৬০ টাকা। ইনফো সরকার প্রকল্পের ফাইবার অপটিক ক্যাবলের মাধ্যমে ইউনিয়ন পর্যায়ে ও বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর মাধ্যমে দুর্গম ৭৭২ এলাকাকে ইন্টারনেট সেবার আওতায় আনা হয়েছে। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও এখন ব্যক্তিগত যোগাযোগ থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সব কিছুতেই মোবাইল ও কম্পিউটারে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটে-১ এ ২৬টি কে-ইউ ব্যান্ড এবং ১৪টি সি ব্যান্ড ট্রান্সপন্ডার রয়েছে। দেশের সব অঞ্চল, বঙ্গোপসাগরের জলসীমা, ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া এর কভারেজের আওতায় রয়েছে। দেশের টেলিভিশন চ্যানেল ও ডিটিএইচ সেবায় বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ব্যবহার করায় বছরে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে। এছাড়া হন্ডুরাস, তুরস্ক, ফিলিপাইন, ক্যামেরুন ও দক্ষিণ আফ্রিকার কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলের ট্রান্সপন্ডার ব্যবহার করছে। দেশে পার্বত্য, হাওড় ও চরাঞ্চলে উচ্চগতিসম্পন্ন ইন্টারনেট সুবিধা দেয়া হচ্ছে এ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে। বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় মোবাইল নেটওয়ার্ক অচল হয়ে পড়লেও বিকল্প হিসেবে কাজ করবে এ স্যাটেলাইট।
ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশ। মূলত এটি একটি ধারণাপত্র ও কর্মকৌশল- যা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত হচ্ছে ও হবে বর্তমান সরকার কর্তৃক। ২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বর ‘ভিশন-২০২১’-এর মূলভিত্তি হিসেবে ডিজিটাল বাংলাদেশের ঘোষণা দেওয়া হয়। ব্যাপক ও বহুমুখী উন্নয়নে একের পর এক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়ন শুরু করা হয় একইসঙ্গে একাধিক মেগা প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে। নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী সরকার ইতোমধ্যে সারাদেশে ব্রডব্যান্ড কানেক্টিভিটি দিয়েছে এবং স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ উৎক্ষেপণ করেছে মহাকাশে। দ্বিতীয় স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-২ এর কাজ চলছে। বর্তমানে ১৭ কোটি মানুষের হাতে ১৮ কোটি ৬০ লাখ মোবাইল সিম ব্যবহৃত হচ্ছে ১৩ কোটি মানুষ ইন্টারনেটের সাথে সংযুক্ত ব্রডব্যান্ড ও মোবাইল ইন্টারনেটের মাধ্যমে।
আজ-কালকার যুগ হচ্ছে ডিজিটাল যুগ। ডিডজিটাল বাংলাদেশ আমরা সরকার বাস্তবায়ন করেছে। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ফাইবার অপটিক দেওয়া হয়েছে। অনলাইনে যোগাযোগ করা যায়। আমাদের করোনা মোকাবিলায় সবচেয়ে কাজে লেগেছে ডিজিটাল সিস্টেম। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ আমরা উৎক্ষেপণ করার মাধ্যমে বাংলাদেশের ডিজিটাল কার্যক্রম আরো বেগবান হয়েছে। কাজেই আমাদের সব কাজেই এখন ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করতে হবে।
আজকে মানুষ যে প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, বলতে গেলে প্রযুক্তির মাধ্যমে পুরো বিশ্বটা সবার হাতের নাগালে চলে এসেছে। মানুষ বিশ্বকে জানার সুযোগ পাচ্ছে। বাংলাদেশ এখন আর অন্ধকারে পড়ে থাকছে না। আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা বিশ্বে এখন অবদান রাখছে। এটা প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় অবদান। প্রযুক্তির সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে বলা যায় যথেষ্ট সফল হয়েছি। সেই সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর যে গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছিলো সেখানে বাংলাদেশ যথেষ্ট সফলতা পেয়েছে। স্মার্ট বাংলাদেশ ও স্মার্ট জাতি গঠনই সরকারের পরবর্তী লক্ষ্য জানিয়েছেন নীতি নির্ধারকবৃন্দ। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য পূরণে অত্যধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। দেশকে ‘স্মার্ট বাংলাদেশে’ পরিণত করতে ডিজিটাল সংযোগই প্রধান হাতিয়ার হবে আমাদের সামনে।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ ১৯৭৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ১৫টি সংস্থার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন-আইটিইউ এর সদস্য পদ লাভ করে। আর্থ-সামাজিক জরিপ, আবহাওয়ার তথ্য আদান-প্রদানে আর্থ-রিসোর্স টেকনোলজি স্যাটেলাইট প্রোগ্রাম বাস্তবায়িত হয় তাঁরই নির্দেশে। ১৯৭৫ সালের ১৪ জুন বঙ্গবন্ধু বেতবুনিয়ায় স্যাটেলাইটের আর্থ-স্টেশনের উদ্বোধন করেন। বিজ্ঞান, প্রযুক্তিবিদ্যা ও কারিগরি শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে ড. মুহম্মদ কুদরাত-এ-খুদার মতো একজন বিজ্ঞানীর নেতৃত্বে শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট প্রণয়ন এবং শিক্ষায় প্রযুক্তি ব্যবহার করার লক্ষ্য বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা ছিল তাঁর অত্যন্ত সুচিন্তিত ও দূরদর্শী উদ্যোগ। শুধু তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সম্প্রসারণ ও বিকাশে গৃহীত নানা উদ্যোগ ও কার্যক্রমের দিকে তাকালে দেখা যাবে বঙ্গবন্ধুর হাত ধরেই রচিত হয় একটি আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশের ভিত্তি, যা বাংলাদেশকে ডিজিটাল বিপ্লবে অংশগ্রহণের পথ দেখায়।
ডিজিটাল পণ্য বিনিয়োগ ও রপ্তানিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও আশা প্রকাশ করেন আমাদের প্রযুক্তির অগ্রগতি। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার মূল চাবিকাটি হলো ডিজিটাল সংযোগ। স্মার্ট নাগরিক, স্মার্ট অর্থনীতি, স্মার্ট সরকার এবং স্মার্ট সমাজের জন্যে ডিজিটাল সংযোগ মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। সরকার বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট, ভার্চুয়াল বাস্তবতা, উদ্দীপিত বাস্তবতা, রোবোটিকস অ‌্যান্ড বিগ-ডাটা সমন্বিত ডিজিটাল প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতের মাধ্যমে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করতে চায়। তরুণ প্রজন্ম এখন ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন দেখছে। ২০১৮ সালে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ কক্ষপথে উৎক্ষেপণ করার পর, সম্প্রচার ও টেলিযোগাযোগ খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে।
স্যাটেলাইটের অব্যবহৃত ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করে বাংলাদেশ প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে এবং বাংলাদেশ এখন বিশ্বের স্যাটেলাইট পরিবারের ৫৭তম গর্বিত সদস্য। ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্যে বহুমুখী কার্যক্ষমতা সম্পন্ন বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ স্থাপনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ২০২৪ সালের মধ্যে তৃতীয় সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপন করতে যাচ্ছে। কারণ, ইতিমধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপন করা হয়েছে। বাংলাদেশ এ পর্যন্ত ৩৪০০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ ক্ষমতা অর্জন করেছে। ২০২৩ এর শেষ দিকে ব্যান্ডউইথের সক্ষমতা ৭২০০ জিবিপিএসে উন্নীত করা হবে। তৃতীয় সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের পর এটি ১৩,২০০ জিবিপিএসে উন্নীত হবে। সৌদি আরব, ফ্রান্স, মালয়েশিয়া ও ভারতকে ব্যান্ডউইথ লিজ দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রতি বছর ৪.৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করছে। সারা দেশে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল স্থাপন করা হয়েছে। এদিকে, প্রতিটি ইউনিয়নে ১০ গিগাবাইট ক্ষমতা নিশ্চিত করা হয়েছে যা জনগণ ও সরকারি অফিসগুলোতে উচ্চ গতির ইন্টারনেট সরবরাহ করতে সহায়তা করছে। সারা দেশে মোট ৮৬০০টি পোস্ট অফিসকে ডিজিটাল করা হয়েছে।
গ্রামীণ ও শহরাঞ্চলের মধ্যে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের ডিজিটাল বৈষম্য এবং দামের পার্থক্য দূর করার কাজ শুরু হয়েছে। প্রত্যন্ত এবং দুর্গম এলাকায় টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার সারা দেশে এক দেশ এক রেটের একটি সাধারণ শুল্ক চালু করা হয়েছে। সারাদেশে বৈষম্যহীন এক দেশ এক রেট শুল্ক ব্যবস্থা চালু করার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ অ্যাসোসিও (এএসওসিআইও)-২০২২ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে।
সরকার স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য ৪টি ভিত্তি সফলভাবে বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে। এগুলো হলো- স্মার্ট সিটিজেন, স্মার্ট ইকোনমি, স্মার্ট গভর্নমেন্ট ও স্মার্ট সোসাইটি। এর পাশাপাশি হাতে নেওয়া হয়েছে ২১০০ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা কেমন হবে- সেই পরিকল্পনা। স্মার্ট বাংলাদেশে সব কাজ, সম্পাদন করা হবে প্রযুক্তির মাধ্যমে। যেখানে প্রত্যেক নাগরিক প্রযুক্তি ব্যবহারে হবে দক্ষ।
এর মাধ্যমে পরিচালিত হবে সার্বিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম- যার চূড়ান্ত লক্ষ্য ক্যাশলেস সোসাইটি। সরকার ইতোমধ্যে দেশে দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, আইসিটি অবকাঠামো ও কানেক্টিভিটি, ই-গভর্নমেন্ট এবং ইন্ডাস্ট্রি প্রমোশনের ক্ষেত্রে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-২ উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি নিয়েছে। ২০২৫ সালের মধ্যে শতভাগ সরকারি সেবা অনলাইনে প্রদানের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। দেশে স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা হয়েছে। এর জন্য জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ করা হয়েছে আলাদা তহবিল।
এর পাশাপাশি আইডিয়া প্রকল্প, বঙ্গবন্ধু ইনোভেশন গ্রান্ট (বিগ), শতবর্ষের শত আশা এবং স্টার্টআপ সার্কেল সৃষ্টি করে অনুদান দেওয়া হচ্ছে। বিনিয়োগের জন্য স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড নামে সরকার ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কোম্পানি পরিচালনার নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। সাইবার নিরাপত্তা সূচকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া ও সার্ক দেশগুলোর মধ্যে প্রথম অবস্থানে রয়েছে। সরকার ইতোমধ্যে দেশের গ্রামগুলোকে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত শহর হিসেবে গড়ে তোলার নীতি নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। যেখানে গ্রামের প্রকৃতি ও পরিবেশ সর্বোপরি চাষাবাদ-ফলমূল-সবজির বাগান-খামারের পাশাপাশি পাওয়া যাবে গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানিসহ তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা। তবে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলা এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রত্যেক নাগরিকেরও সবিশেষ দায়িত্ব ও করণীয় রয়েছে।
প্রত্যেক নাগরিককে দক্ষ মানব সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে নিজেকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবিলার উপযোগী করে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি যার যার অবস্থান থেকে দায়বদ্ধ থাকতে হবে। তা না হলে স্মার্ট বাংলাদেশের সুফল পাওয়া যাবে না সর্বাংশে ও সর্বতোভাবে।
স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে স্মার্ট নাগরিক প্রয়োজন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজকের তরুণ-তরুণী ও শিশুদের মানবিক গুণাবলীসম্পন্ন হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। স্মার্ট বাংলাদেশের লক্ষ্য স্মার্ট জনগোষ্ঠী তৈরি। নতুন প্রজন্ম যেন মানবিক ও অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল অনুভব নিয়ে গড়ে উঠে সেজন্য নজর দিতে হবে। সবাইকেই মানবিক গুণাবলীসম্পন্ন হতে হবে। যারা প্রতিবন্ধী বা অক্ষম তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা কম্পিউটার শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছি। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার জন্য দরকার স্মার্ট জনগোষ্ঠী। শিশুকাল থেকেই যেন তারা তা শিখতে পারে, তার ব্যবস্থা আমরা নিয়েছি। প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের কম্পিউটারের কোডিং পদ্ধতি শিখানোর কার্যক্রম ‘লারলিং অ্যাপ্রোচ’ প্রয়োগের মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের দক্ষতা বিকাশের উদ্যোগও আমরা গ্রহণ করেছি। এভাবেই একদিকে আমরা যেমন শিশুদের শিক্ষা ও দক্ষ হওয়ার ব্যবস্থা নিয়েছি, আজকের নতুন প্রজন্ম হবে আগামী দিনের স্মার্ট জনগোষ্ঠী। যারা এদেশটাকে গড়ে তুলবে। ২০৪১ সালের মধ্যে স্মার্ট নাগরিক, স্মার্ট জাতি, স্মার্ট অর্থনীতি এবং স্মার্ট সমাজ গঠনে চলমান সংগ্রাম এগিয়ে নেওয়ার বিকল্প নেই। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকারের পাশাপাশি প্রযুক্তির দক্ষতা অর্জনে নতুন প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের অনপ্রাণিত করতে যুবসমাজসহ সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে ডিজিটাল দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে তরুণ জনগোষ্ঠীর আত্ম কর্মসংস্থানের যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তা কাজে লাগাতে হবে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিক্ষা ব্যয়কে খরচ নয়, বিনিয়োগ বলেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণে শেখ হাসিনা প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দেন। ফলশ্রæতিতে বদলে গেছে বাংলাদেশ। বিগত সাড়ে ১৪ বছরে তথ্য প্রযুক্তি খাতে ২০ লাখ তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান হয়েছে। ধারাবাহিক পথ পরিক্রমায় এখন আমরা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছি।
সরকার আগামীর বাংলাদেশকে স্মার্ট বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চায়, যেখানে প্রতিটি জনশক্তি স্মার্ট হবে। সবাই প্রতিটি কাজ অনলাইনে করতে শিখবে, ইকোনমি হবে ই-ইকোনমি, যাতে সম্পূর্ণ অর্থ ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল ডিভাইসে করতে হবে। ‘আমাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মযোগ্যতা’ সব কিছুই ই-গভর্ন্যান্সের মাধ্যমে হবে। ই-এডুকেশন, ই-হেলথসহ সব কিছুতেই ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করা হবে। ২০৪১ সাল নাগাদ আমরা তা করা সক্ষম হব এবং সেটা মাথায় রেখেই কাজ চলছে।

হীরেন পণ্ডিত: প্রাবন্ধিক ও রিসার্চ ফেলো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

slot qris

slot bet 100 rupiah

slot spaceman

mahjong ways

spaceman slot

slot olympus slot deposit 10 ribu slot bet 100 rupiah scatter pink slot deposit pulsa slot gacor slot princess slot server thailand super gacor slot server thailand slot depo 10k slot777 online slot bet 100 rupiah deposit 25 bonus 25 slot joker123 situs slot gacor slot deposit qris slot joker123 mahjong scatter hitam

https://www.chicagokebabrestaurant.com/

sicbo

roulette

spaceman slot